দিবস

সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনী

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

জাতীয় জীবনে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আমাদের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুগপৎ আক্রমণের সূচনা করে। এবং মিত্রবাহিনীর সহায়তায় অতিসত্বর ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রমনার রেসকোর্সে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদ্‌যাপিত হয়। দেশের সব সেনানিবাস, নৌ ও বিমানবাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদ্‌যাপন করা হয়। দিবসটিতে প্রতি বছর সেনানিবাসগুলোতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী ও বরেণ্যজন অংশ নেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্র্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী প্রদান করে থাকেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মত্যাগকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ বছর অবশ্য বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাদের সামরিক সচিবরা ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। করোনার কারণে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সীমিত পরিসরে করা হবে।
আমরা জানি, ২৫ মার্চ রাতে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের পরপরই তার নির্দেশনায় ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু হয়। আর সেই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। কিন্তু তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে যান। শুরু হয় মুক্তিসংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয় বিপ্লবী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসারসহ অন্য সদস্যরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সর্বস্তরের মুক্তিপাগল হাজার হাজার যুবক। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ধারণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল ওই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুক্তিবাহিনী সংগঠন ও সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়ের সমর্থন আদায় ও মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষায় এই অস্থায়ী সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
মুজিবনগরে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার কর্নেল এমএজি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সারাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। তারা কোথাও গেরিলাযুদ্ধ আবার কোথাও সংঘবদ্ধ আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার আমাদের কোটি কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান করাসহ গেরিলা ও নিয়মিত বাহিনীগুলোকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সহায়তা করে। একাত্তর সালের ২১ নভেম্বর চূড়ান্তভাবে সম্মিলিত আক্রমণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ওইদিন বিভিন্ন সেক্টরে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সর্বাত্মক আক্রমণ চালানো হয়। এই আক্রমণ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সফলতা লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শত্রুমুক্ত হয়েছিল যশোর। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সম্মিলিত আক্রমণে টিকতে না পেরে যশোর সেনানিবাস থেকে খুলনায় পালিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। ইতোমধ্যে দেশব্যাপী মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রতিরক্ষামূলক বূ্যহ গঠন করে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করতে থাকে। এদিকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ছিল। এমনকি দেশের অভ্যন্তরেও তারা একে অন্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে তাদের মাঝে বিরাট হতাশা নেমে আসে। ইতোমধ্যে মিত্রবাহিনী রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছতে সক্ষম হয়। ওই সময় ঢাকাকে রক্ষা করার মতো তৎকালীন পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজির কেনো সক্ষমতা ছিল না। যার ফলে মিত্রবাহিনীর কাছে ১৬ ডিসেম্বর তিনি আত্মসমর্পণে বাধ্য হন; বাঙালি ছিনিয়ে আনে চূড়ান্ত বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

স্বাধীনতার পরই বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠনে নজর দেন বঙ্গবন্ধু। সম্পদের প্রচণ্ড সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করেন। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আধুনিক সমরাস্ত্র- যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ প্রয়োজন অনুসারে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। তখন সেনাবাহিনীর জন্য পাঁচটি ব্রিগেড (ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর ও যশোর); বিমানবাহিনীর জন্য তিনটি ঘাঁটি (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর) এবং ঢাকায় নৌ সদর, চট্টগ্রাম ও খুলনায় নৌ-ঘাঁটি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে কুমিল্লায় প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতি অল্প সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর এ ধরনের পুনর্গঠন বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের আন্তরিকতার নজির বলা যায়।
মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ গঠনে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। তবে স্বীকার করতে হবে, ১৯৭৫ সালে স্বল্প সংখ্যক বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যার ফলে দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে একশ্রেণির স্বার্থলোভী রাজনীতিবিদের মদদে সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়ে দেশজুড়ে সেনাশাসন প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর থেকে কখনও সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কিংবা বেসামরিক শাসনের আড়ালে সামরিক বাহিনী দ্বারা বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত আমরা তা দেখেছি। বস্তুতপক্ষে এ সময়টি ছিল দেশ ও জাতির তথা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটি কালো অধ্যায়। সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে যুক্ত করার ফলে একদিকে যেমন সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়, একইসঙ্গে যে গণতান্ত্রিক চেতনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে অভ্যুদয় ঘটেছিল তাও বিপুলভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের সামরিক বাহিনীর সুনাম বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশ ও জনগণের স্বার্থে গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত একটি গর্বিত প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে গত দুই যুগে সেনা নৌ ও বিমান- তিনটি বাহিনীরই আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সেনবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ট্যাঙ্ক, কামান ও বিভিন্ন সমরাস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। বিমানবাহিনীর বহরে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, পরিবহন বিমান ও হেলিকপ্টার সংযুক্ত হয়েছে। নৌবাহিনীকে এখন বাংলাদেশের নব অর্জিত বিশাল সমুদ্রসীমা রক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এ বহরে যুক্ত হয়েছে মিসাইল সজ্জিত ফ্রিগেট, সাবমেরিন ও গভীর সমুদ্রে টহলের জন্য পর্যবেক্ষণ বিমান। একই সঙ্গে সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের জন্য অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয় করা হয়েছে। একদিকে যেমন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে এই সম্পদের প্রতিরক্ষার জন্য মানসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে তোলা হচ্ছে।
ফলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ৬৮টি মিশনের মধ্যে অন্তত ৫৪টিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ শীর্ষ পর্যায়ের অবস্থানে রয়েছে। কঙ্গো, নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা, লাইবেরিয়া, হাইতি, তাজিকিস্তান, কসোভো, জর্জিয়া, পূর্ব তিমুর প্রভৃতি স্থানে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল নাম। বস্তুত বিশ্বজুড়ে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের 'গুডউইল অ্যাম্বাসাডর' হিসেবে কাজ করে আসছে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের নানা প্রান্তে দুর্গত, নিপীড়িত ও নিরীহ মানুষের সেবায় কাজ করছেন। সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও তারা আর্তমানবতার সেবা করে চলেছে। দেশেও যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনী এক বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। পদ্মা সেতুসহ বড় বড় প্রকল্পে সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। এমনকি চলমান করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সশস্ত্র বাহিনী যে ভূমিকা পালন করছে তা প্রশংসার দাবিদার।
শিক্ষার প্রসার ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানেও সশস্ত্র বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের মান এতটাই উন্নত যে, বন্ধুপ্রতিম ২০-২৫টি দেশ আমাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারাও উন্নত বিশ্বে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আর্মি মেডিকেল কলেজ ও অন্য বাহিনীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সন্তানরা নয়, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এখানে শিক্ষা গ্রহণ পারছে।
আগামী দিনগুলোতে সশস্ত্র বাহিনী একদিকে যেমন তাদের প্রশিক্ষণ ও মান বাড়াবে, তেমনি দেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশসেবায় সশ্রস্ত্র বাহিনী অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর; নিরাপত্তা বিশ্নেষক ও ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক