ঘুষের উচ্চ ঝুঁকি

সুশাসন নিশ্চিত করুন

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ঘুষবিরোধী সংস্থা ট্রেস ইন্টারন্যাশনালের তালিকায় বিশ্বের ১৯৪টি দেশের মধ্যে ঘুষের ঝুঁকি বিবেচনায় ১৬৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ- এই তথ্য আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। শুক্রবার সমকালসহ অন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ঝুঁকির স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৬৬। সরকারি দপ্তরের ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টি সচেতন মানুষ মাত্রই কমবেশি জানা। আমাদের সমাজে দুর্নীতি বলতে সরকারি অফিসে ঘুষ গ্রহণকেই আমরা মৌলিকভাবে বুঝে থাকি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারে 'শূন্য সহিষ্ণুতা'র অঙ্গীকার সত্ত্বেও অসাধু-দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা যায়। ঘুষ-দুর্নীতি আমাদের দেশে সর্বমহলে পরিচিত এক অনুষঙ্গ। বহুমাত্রিক ব্যাধি ঘুষ-দুর্নীতি আমাদের সামগ্রিক ক্ষতির অন্যতম কারণ। দুদকের তথ্য মতে, প্রতিবছর জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষতি হয় দুর্নীতির কারণে। টিআইবি ও অন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে, ক্ষতির চিত্র আরও স্ম্ফীত। 'ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না'- এমন কথা সমাজে বহুল প্রচলিত। আমরা দেখছি, সরকারের নিচু পর্যায়ের কর্মচারী থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তা- অনেকেই ঘুষ-দুর্নীতি করে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। বিদ্যমান বাস্তবতার নিরিখে ট্রেস ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা প্রতিবেদনের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না। এটা ঠিক যে, সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে সক্রিয়। সরকার সমর্থকদেরও কেউ কেউ তাদের জালে আটকা। আমাদের দেশে ঘুষ-দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করতে আইনি কাঠামোর অভাব নেই। কিন্তু জবাবদিহির ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

আমরা দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ হিসেবে থাকতে চাই না- মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি বাড়ছে এটি একটি ইতিবাচক দিক। ঘুষখোরদের উপলব্ধিতেও আসুক এমন কাজ যে অত্যন্ত গর্হিত। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি ভেদ করে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে নিজেদের অবস্থান করে নিতে পেরেছি, তা সরকারের নানামুখী কার্যক্রমেরই সুফল বলা যায়। কিন্তু এখানেই থেমে থাকলে কিংবা এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। উন্নত বিশ্বের কাতারে নিজেদের মর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখতে চাইলে ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতেই হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা ঘুষ নিয়ে কেউ রেহাই পাবে না- এ সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ঘুষ দেওয়া-নেওয়া এ দুই-ই যে অনৈতিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুষ নিয়ে দু'রকম বিপরীত অবস্থা তৈরিরও নজির আছে। যেখানে অনেকেই মনে করছেন- সবাই ঘুষ খায় তবে আমি খাব না কেন? আবার অধিকাংশ মনে করছেন- কেউ ঘুষ খায় না, আমি খাই কী করে? আমরা মনে করি, দুর্নীতি কমাতে হলে দ্বিতীয় অবস্থায় দেশকে নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য শুধু ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিলেই চলবে না, প্রয়োজন আমূল সংস্কার ও একই সঙ্গে দরকার কঠোর নজরদারিও। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পরও ঘুষখোরদের দৌরাত্ম্য কেন কমেনি- এ জন্য আরও গভীরে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা চাই। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ে কাজের জন্য সরকারি দপ্তরে উৎকোচ দেওয়ার পাশাপাশি নানামুখী বিড়াম্বনার তিক্ত অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। সব খবরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না। তবে যেগুলো আসে সেসব খতিয়ে দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পথও সুগম করা চাই। সচেতন নাগরিক সমাজের সহায়তাও এ ব্যাপারে সরকার নিতে পারে। টেকসই উন্নয়নের সুফল জনগণ তখনই পাবে, যখন ঘুষের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। ঘুষখোররা শুধু সরকারি দপ্তরেই নয়, এমনকি আধা সরকারি কিংবা স্বায়ত্তশাসিত দপ্তরগুলোতেও এদের অস্তিত্ব রয়েছে। ঘুষ খাওয়ার কাজটি কঠিন করে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে সরকার অভিনন্দিত হবে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জানানোর পথ মসৃণ করার পাশাপাশি ঘুষবিরোধী কার্যক্রমও অধিকতর গতিশীল করতে হবে। বাড়াতে হবে সামাজিক সচেতনতাও। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার-সদিচ্ছারও বিকল্প নেই। মনে রাখা জরুরি, এ ছাড়া সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন।