অন্যদৃষ্টি

উপকূল দিবস চাই

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

এম. আমীরুল হক পারভেজ চৌধুরী

উপকূলের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন প্রজন্মের দাবি ১২ নভেম্বর 'উপকূল দিবস চাই'- এ দাবি উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের। টেকনাফ থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত ৭১০ কিলোমিটার তটরেখাজুড়ে 'উপকূল দিবস চাই' গত ১২ নভেম্বর উপকূলজুড়ে আবারও এ দাবি উচ্চারিত হয়েছে। উপকূল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ঢাকাসহ ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে 'উপকূল দিবস'-এর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২০১৫ সালে উপকূল ফাউন্ডেশন 'উপকূল দিবস'-এর দাবি তোলে। পরবর্তী ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে উপকূল ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র পরিসরে 'উপকূল দিবস' পালন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে। ২০১৯ সালে ১২ নভেম্বর বৃহৎ পরিসরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন শেষে গোলটেবিল আলোচনায় উপকূল ফাউন্ডেশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান ১২ নভেম্বর 'উপকূল দিবস' ও 'উপকূল উন্নয়ন বোর্ড' কেবিনেটে উপস্থাপন করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এবার দেশের শতাধিক স্থানে উপকূল ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংগঠন 'উপকূল দিবস'-এর কর্মসূচি পালন করেছে। উপকূল ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি অন্যান্য সংগঠনও দাবির পক্ষে সোচ্চার হয়। ইয়ুথ পাওয়ার ইন বাংলাদেশ, কোস্টাল জার্নালিজম ফোরাম, গণমাধ্যম কর্মীদের সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, কিশোর-তরুণদের ফোরাম ইত্যাদি। মহান স্বাধীনতার পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও ভয়াল ১২ নভেম্বর দুর্যোগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজও মেলেনি। উপকূলের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত বহুমুখী দুর্যোগের সঙ্গে বাস করেন। ঝড়-ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জনপদের নামই উপকূল। বৈরী পরিস্থিতি যেমন- জলোচ্ছ্বাস, নদী-ভাঙন, লবণাক্ততা প্রতিনিয়ত তাড়িত করে উপকূলবাসীকে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, '৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধশত বছরে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। ১২ নভেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'উপকূল দিবস' হিসেবে পালন করার দাবি বাস্তবায়ন করবে। কেন ১২ নভেম্বর উপকূল দিবস হবে? ভয়াল ১২ নভেম্বর উপকূল জীবন ইতিহাসে এক ভয়াবহ কালরাত। ১৯৭০ সালের এই দিনে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাগর, নদী, খাল-বিলে ভেসে ছিল অসংখ্য লাশ আর প্রায় এক কোটি মৃত গবাদি পশু। ঘরবাড়ি, স্বজন হারিয়ে পথে বসেন উপকূলের লাখ লাখ মানুষ। উপকূলীয় দ্বীপচরসহ বহু এলাকার ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়। ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী গণকবর ও শাসকহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল প্রিয় (পূর্ব পাকিস্তান) স্বদেশ। তখন বঙ্গবন্ধু তার নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ রেখে ত্রাণ নিয়ে ছুটে আসেন উপকূলীয় অঞ্চলে। দাঁড়ান বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে। অভিভাবক পেল উপকূলের মানুষ। ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হলো; শুরু হলো নতুন করে, নতুন স্বপ্নে বাঁচার লড়াই। সেদিন বঙ্গবন্ধুর আহ্বানেই বিশ্ব নেতারা ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে আসেন। তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপকূলবান্ধব একজন প্রধানমন্ত্রী। আমরা দেখেছি, তিনি সরকারি প্রটোকল ভেঙে সমুদ্রের নোনাজলে হেঁটেছেন কক্সবাজারের উপকূলে। উপকূলের সংকট, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং উপকূলের মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার দাবি আদায়ে উপকূলের জন্য একটি বিশেষ দিন অপরিহার্য।

'৭০-এর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে 'উপকূল দিবস' ও পৃথিবীর মানুষ হিসেবে 'বিশ্ব উপকূল দিবস' প্রতিষ্ঠিত হোক। ভৌগোলিক অবস্থান ও পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ হিসেবেও বাংলাদেশ এর দাবিদার। এ ছাড়া জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) বিশ্বের পাঁচ ধরনের ভয়াবহ প্রাণঘাতি আবহাওয়া ঘটনার শীর্ষ তালিকায় বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াল '৭০-এর ঘূর্ণিঝড়টিকে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ থেকেও উপকূলের জন্য ১২ নভেম্বর দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিক বিবেচনায় ১২ নভেম্বর ঘোষিত 'উপকূল দিবস'। 'উপকূল দিবস' হলে সব বিষয় যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আমরা আশা করি, সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সরকার উপকূলবাসীর দাবি পূরণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করবে।

পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন
ahcparvezdu@gmail.com