রাজধানীর সার্কুলার রুট

গাড়ি প্রস্তুত, ঘোড়া আস্তাবলে!

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও কূটনৈতিক বিজয়ের প্রতীক পদ্মা সেতু যখন ক্রমেই প্রমত্ত নদীর বুকে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, তখন এর সঙ্গে সম্পর্কিত বৃত্তাকার মহাসড়ক প্রকল্পটি কেন পিছিয়ে? শনিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আমাদের এই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে- পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে পৌঁছতে হলে রাজধানী ঘিরে যে প্রায় ৮৯ কিলোমিটার চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ করতে হবে, তার প্রস্তুতি এখনও প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করেনি। এই প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশ আব্দুল্লাহপুর থেকে কেরানীগঞ্জের কদমতলী পর্যন্ত ৬৩ কিলোমিটার সড়ক ও উড়াল সেতু নির্মাণ নিয়ে প্রাক্কলিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা পিডিপিপি প্রস্তুত ও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলেও প্রথম অংশ আব্দুল্লাপুর থেকে ডেমরা পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি এখনও 'সময় সাপেক্ষ'। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, পিডিপিপি পর্যায় থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্তই অন্তত আরও চার বছর সময় প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ডিপিপি প্রণয়ন ও অর্থ সংস্থানের বিষয়টি তো রয়েছেই; দ্বিতীয় অংশে সোয়ারীঘাট থেকে কদমতলী পর্যন্ত যে উড়াল সেতু নির্মাণ করতে হবে, তার বিস্তারিত নকশাও রয়েছে বাকি। ওদিকে খোদ পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ যে প্রায় সমাপ্তির পথে, আমরা জানি। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ যেদিন লেখা হচ্ছে, সেই শনিবারেও বসানো হয়েছে ৩৮তম স্প্যান। এর অর্থ, আর মাত্র তিনটি স্প্যান বসলেই সম্পূর্ণ পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হবে। আশা করা যায়, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। আমাদের প্রশ্ন, তখন সেতুটির মাওয়া প্রান্তে যাতায়াতের পরিস্থিতি কী হবে? এটা ঠিক, দোলাইরপাড় থেকে মাওয়া এবং নদীর অপর পাড়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত অত্যাধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং ইতোমধ্যে পথটিতে যানবাহন চলাচল করছে।

এর পরিসর ও উৎকর্ষ মুগ্ধ করছে যাতায়াতকারীদের। কিন্তু মূল সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া মাত্রই এই মুগ্ধতা বিড়ম্বনায় পরিণত হতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করি। বৃত্তাকার সড়কটির দ্বিতীয় অংশ নির্মাণ না হওয়ার কারণে যেমন ঢাকা-উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ব্যবহারকারীদের, তেমনই ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহারকারীদের দক্ষিণবঙ্গ যাওয়া-আসা করতে হবে ঢাকা নগরীর ভেতর দিয়ে। এমনিতেই যানজটে জেরবার রাজধানীর সড়ক পরিস্থিতির অবনতি তো ঘটবেই, খোদ পদ্মা সেতুর মাওয়া পর্যন্ত সৃষ্টি হতে পারে ব্যাপক যানজট ও জনদুর্ভোগ। পদ্মা সেতু ব্যবহারকারী যানবাহনের চাপ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তাকার সড়কটির নির্মাণকাজ পিছিয়ে রাখার এই চিত্র দেখে বহুল প্রচলিত বাংলা প্রবাদটি মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়- ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া হচ্ছে। বস্তুত গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক ওই প্রবাদ স্মরণ করে সমকালকে যথার্থই বলেছেন যে, পদ্মা সেতুর আগেই সেতুতে যানবাহন যাওয়ার ব্যবস্থা সম্পন্ন করা উচিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি আরও অনাকাঙ্ক্ষিত।

গাড়ি যেখানে প্রস্তুত, সেখানে ঘোড়া এখনও আস্তাবলে বিচুলি খাচ্ছে। জাতীয় মর্যাদার প্রতীক একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে এমন 'ত্রুটি' কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার দূরদর্শিতার অভাবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, তা খতিয়ে দেখার কথা আমরা বলতেই পারি। কিন্তু বিষয়টি নিছক ব্যবস্থার নয়, বরং ব্যবস্থাপনার। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে, অপেক্ষার অযুত প্রহর পেরিয়ে যখন জাতি পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার জন্য দিন গুনছে, তখন যত দ্রুত সম্ভব বৃত্তাকার সড়কপথ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রয়োজনে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যোগ করতে হবে বাড়তি গতি। সন্দেহ নেই, প্রকল্পটির অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন সামান্য কথা নয়। কিন্তু আমরা যদি প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করতে পারি, বৃত্তাকার সড়কপথটির অর্থায়নও আটকে থাকার কথা নয়। মূল বিষয় হচ্ছে- আর বিলম্ব না করা, যত দ্রুত সম্ভব সড়কপথটি বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া। বিলম্বে হলেও আমরা সেটিই দেখতে চাই।