সবজির মধ্যে আলু এখন অন্যতম। বিশেষ করে আলুর দাম প্রতি বছরই কম থাকে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রধান সবজি এখন আলু। আর দেশে আলুর চাষাবাদও ব্যাপকভাবে হচ্ছে। বছরের মোট চাহিদার আলু দেশে উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার এখনও কম। দেশে ৩৭১টি চালু হিমাগারে প্রায় ৫০ লাখ টন আলু মজুদ রাখা যায়। অথচ চাহিদার ৭৫ লাখ টন আলুর বিপরীতে কমবেশি প্রতি বছরই প্রায় এক কোটি টন আলু উৎপাদন হয়। কিন্তু সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগারের অভাবে উৎপাদিত সব আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। তবে, কৃষক পর্যায়ে স্থানীয় পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষণ হওয়ায় কিছু আলু মজুদ করা সম্ভব হয়। আর আমাদের দেশে কৃষিভিত্তিক বড় শিল্পের মধ্যে হিমাগারই অন্যতম। হিমাগারে প্রচুর বিদ্যুতের ব্যবহার হয়ে থাকে। বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় এক বস্তা আলু সংরক্ষণে খরচও হয় অনেক বেশি। যদি সরকার হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সাবসিডি দিয়ে কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করত, তাহলে তুলনামূলক কম টাকায় চাষিরা আলু সংরক্ষণ করতে পারতেন। ফলে আলু উৎপাদনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত; যা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করে মানসম্মত আলু বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব হতো। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন কম হয়েছে। পাশাপাশি টানা বর্ষণ, উপর্যুপরি বন্যার কারণে এ বছর রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে আলুর ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় আলুর বাজারদরও অনেক বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আলুর মূল্য নিয়ন্ত্রণে দাম বেঁধে দেওয়াসহ নানাভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু সে অর্থে সফলতার মুখ দেখেনি। কারণ বাজার অর্থনীতির সূত্রই হচ্ছে, যে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়বে, আর দাম বাড়লে সরবরাহও কমে আসবে। অবশ্য সরকার ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে প্রতিটি হিমাগারে প্রকৃত আলু মজুদের পরিমাণ জানতে চেয়েছে। এমনকি নিয়মবহির্ভূতভাবে কেউ আলু অবৈধভাবে মজুদ করে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে মূল্য বেশি ও বাড়তি চাহিদার কারণে হিমাগার থেকে আলু সরবরাহের পরিমাণ যে বেড়ে গেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। শঙ্কার বিষয় হচ্ছে, দাম বেশি পাওয়ায় চাষিরা বীজআলুও হিমাগার থেকে বের করে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি করছেন। ফলে আসন্ন আলু চাষ মৌসুমে মানসম্মত আলু বীজের সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর আলুবীজের সংকট হলে আলুর চাষাবাদ কম হওয়ার আশঙ্কাও আছে। যে কারণে এখনই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মানসম্মত আলুবীজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ বীজ সংকটে আলুর চাষাবাদ বিঘ্নিত হলে চাষ উপযোগী অনেক জমি পতিত থেকে যাবে। ফলে একদিকে যেমন সবজির ঘাটতি হবে, অন্যদিকে আলু চাষিরা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অনেকেরই জানা থাকার কথা, উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান বলতে আলু সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার ও চালকলই মুখ্য শিল্প।

কৃষি আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কৃষির সমৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে। সেই কৃষির সমৃদ্ধিতে ক্ষমতাসীনদের যেভাবে নজর দেওয়া জরুরি বা প্রত্যক্ষ প্রণোদনা, সহায়তা, ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া উচিত, সে পরিকল্পনামাফিক কোনো সরকারই সঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে এ দেশের চাষিদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় স্বাধীনতা-উত্তর গত ৪৯ বছরে কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এলেও চাষিরা ভালো নেই। প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা কারণে চাষিরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ফলে ঋণের বেড়াজাল থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারেন না। এ অবস্থা থেকে দেশের চাষিদের বাঁচাতে হলে কৃষির সমৃদ্ধিতে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে, ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।

সাবেক ছাত্রনেতা

বিষয় : অন্যদৃষ্টি আব্দুল হাই রঞ্জু

মন্তব্য করুন