সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণুবিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ। পশ্চিমা কূটনীতিকদের অনেকেই তাকে 'ইরানে বোমার জনক' বলে অভিহিত করে থাকেন। মোহসেন ফাখরিজাদেহ ইরানে যে পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন, তার এই হত্যাকাণ্ড সেই কর্মসূচিতে তেমন কোনো প্রভাব না ফেললেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে যে চুক্তি করা হয়েছে, তার ওপর অবশ্যই প্রভাব ফেলবে।

নানা দিক থেকে এ হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত ইসরায়েলকে নির্দেশ করছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এর আগেও ইরানের কয়েকজন বিজ্ঞানীর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এসব হত্যাকাণ্ডে মোসাদের জড়িত থাকার অভিযোগের সত্যতাও স্বীকার করেছেন বিভিন্ন সময়। ইসরায়েলের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ২০১৩ সালে ওবামা প্রশাসন এ ধরনের গুপ্তহত্যা বন্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করে এবং ইসরায়েল গুপ্তহত্যা বন্ধে সম্মত হয়। এর ভিত্তিতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছিল, যা দুই বছর পর জয়েন কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনে (জেসিপিওএ) রূপ নেয়। এতে ইরান অবরোধ থেকে মুক্তির বিনিময়ে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে হওয়া পরমাণু চুক্তি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিলে এ চুক্তি অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

মোসাদ যদি সত্যিই এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে থেকে থাকে, তাহলে বলতে হবে- ইসরায়েল একটি সম্ভাবনার দ্বার বন্ধ করে দিল। আর ইসরায়েল অবশ্যই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সবুজ সংকেত পেয়েছে। এতে সন্দেহ নেই, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যমেয়াদের শেষ সপ্তাহগুলোতে বিধ্বংসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চলেছিলেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি ইরানে সামরিক হামলা চালানোর কথা বলেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি তা করতে পারেননি। ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতেই ইসরায়েল এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ওয়াশিংটনের সম্মতি ছাড়া এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে আমি মনে করি না। এ হত্যাকাণ্ডের কারণ ও লক্ষ্য একেবারেই স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ফিরতে আলোচনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন এ পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে ইরানকে অপ্রত্যাশিত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সামরিক দিকের চূড়ান্ত মূল্যায়ন লিখেছিল, তখন মোহসেন ফাখরিজাদেহকে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে উল্লেখ করেছিল এবং তাকে ইরানি পারমাণবিক কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও বোমা তৈরির মূল ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পরমাণুবিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহর হত্যাকাণ্ড আর এ বছরের শুরুর দিকে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড একই লক্ষ্যে সংঘটিত হয়েছে। ফাখরিজাদেহ ছিলেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূলে আর কাসেম সোলাইমানি ছিলেন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। ফাখরিজাদেহ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবকাঠামোগত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড যেমন ইরানের সামরিক ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব ফেলেনি, তেমনি ফাখরিজাদেহর হত্যাকাণ্ডও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। এটা ঠিক যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মোহসেন ফাখরিজাদেহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন; তবে এর কৃতিত্ব তিনি একাই নিতে পারেন না, বিষয়টি অনেকটা কাসেম সোলাইমানি ও আইআরজিসি বা বিপ্লবী গার্ডসের মতো।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করতে মোহসেন ফাখরিজাদেহকে হত্যা করা হয়নি; বরং ইরানকে কূটনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেই ঘটানো হয়েছে এ হত্যাকাণ্ড। আর যদি হত্যার উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও হয়ে থাকে, তাহলে কি তা সফল হয়েছে? এখন অবধি কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড এবং জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার ও ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক অবরোধের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করছে ইরান।

তবে তেহরান কি তার দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেসিপিওএতে পুনরায় যোগদানের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে বাইডেন প্রশাসন। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়েও উন্মুক্ত আলোচনা হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কিছুদিন ক্ষমতায় থাকছেন। সুতরাং মোহসেন ফাখরিজাদেহর হত্যাকাণ্ড ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ইরানের প্রতি শেষ ধাক্কা নাও হতে পারে।

সমস্যা হলো যদি ইরানকে বারবার খোঁচা দেওয়া হয়, তাহলে কিন্তু তারাও প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আমি জানি না, এটি কোনো উপলক্ষ হবে কিনা। তবে রাজনৈতিক পরিসরে কিন্তু তেহরানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জোরালো হচ্ছে। কট্টরপন্থিরা এরই মধ্যে শুরু করেছে। সুতরাং ইরানিদের পক্ষে সংযমী হয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

গার্ডিয়ানের ওয়ার্ল্ড'স অ্যাফেয়ার্স এডিটর

গার্ডিয়ান থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে ভাষান্তর সুদীপ্ত সাইফুল