মানুষ যৌবনে খুব করিৎকর্মা ও দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, অনেক কিছুতেই সাপের পাঁচ পা দেখে। নদীরও একই অবস্থা, যৌবনে ভয়ংকর খরস্রোতা, প্লাবনভূমিতে পড়ামাত্রই ধীরলয়ে হারিয়ে যায় যৌবন। মানুষেরও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিস্তেজতা আসে। কিন্তু রাষ্ট্র একটা বিমূর্ত বিষয়, এর আবার যৌবন বা বার্ধক্য কী?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ২০২১ সালে। বিগত ৫০ বছরে অনেক অর্জন, সামাজিক সূচকসমূহে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অগ্রগামী। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধ আর খাতওয়ারি বিশৃঙ্খলা দেখলে মনে হয় বয়সের দিক থেকে বাংলাদেশ 'বুড়িয়ে' যাচ্ছে?

প্রথমত, গত ১৭ নভেম্বর একটি দৈনিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উপাচার্য কৈফিয়ত লিখেছেন এবং সুন্দর করে তার বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার কৈফিয়ত আর এ সম্পর্কিত সংবাদগুলো পড়লে মনে হবে কোথাও গণ্ডগোল হয়েছে। আরেক উপাচার্য নিয়মনীতি পরিবর্তন করে স্বজনদের নিয়োগ উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন!

দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাস না এলে কেউ জানতাম না যে দেশের স্বাস্থ্য খাত কত 'ফলপ্রসূ'। এই খাতের সবকিছুই যেন এলোমেলো। যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর করোনার ফলাফল সরকারি দুই প্রতিষ্ঠানে দুই রকম। একজন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে যদি এমন হয়, তাহলে আমজনতার অবস্থা সহজেই অনুমেয়। উচ্চবিত্তদের একটি হাসপাতাল নায়ক ফারুকের রোগ ধরতেই পারল না ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর, কিন্তু সিঙ্গাপুরে একবার পরীক্ষায়ই জানা গেল। এক পুলিশ কর্মকর্তাকে 'মাইন্ড এইড' পিটিয়েই মেরে ফেলল। অথচ হাসপাতালটি দীর্ঘদিন চলছিল অনুমোদন ছাড়া। আঁতকে ওঠার মতো আরেকটা খবর হচ্ছে চিকিৎসকদের পদোন্নতির অভিনব জালিয়াতি, যা বিশ্ব রেকর্ডের দাবি রাখে! ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ঘটেছে জালিয়াতিগুলো, ধরা পড়েছে ২০২০ সালে- কোথায় আছি? এমন উদাহরণ শিক্ষা খাতেও অনেক, বিশেষত নিয়োগে (সমকাল, ১৮ নভেম্বর)।

তৃতীয়ত, ইতিহাস বলে বিদেশিরা অতীতে আমাদের সম্পদ লুটেছে, নেপথ্যে ছিল এখানকার লোকজন। আর ২০২০ সালে বিদেশিদের আসতে হয় না, দেশে বসেই পাচ্ছে আমাদের সম্পদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১৮ নভেম্ব্বর এক মতবিনিময় সভায় আংশিক উপাত্তের ভিত্তিতে বলেছেন, বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা অন্যান্য পেশার তুলনায় বেশি। অন্যদিকে, গত পাঁচ বছরে দুদক গ্রেপ্তারকৃত ৭৯৯ জনের মধ্যে ৩৯০ জন সরকারি চাকুরে, জনপ্রতিনিধি ৩৫, ব্যবসায়ী ১৯৭ আর ১৭৭ জন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। পাঁচ বছরে মাত্র ৭৯৯ জন- এ কেমন কথা? তাহলে প্রতিনিয়ত দুর্নীতির খবর যে গণমাধ্যমে চাউর হয় তা কি বানোয়াট?

চতুর্থত, সদ্য বিদায়ী উচ্চপদস্থ সরকারি এক কর্মকর্তা বিদ্যমান নিয়ম ভেঙে পূর্বাচলে ১০ কাঠার প্লট নিয়েছেন। এটা ব্যক্তিস্বার্থে 'নতুন স্বাভাবিক'। এ রকম চিত্র অন্যান্য খাতেও ভূরি ভূরি বললে অন্যায় হবে না।

পঞ্চমত, ৩২-৩৯তম বিসিএসে পুলিশের নেতিবাচক প্রতিবেদনে প্রায় ৪০০ প্রার্থীর চাকরি হয়নি (প্রথম আলো, ৪ অক্টোবর)। বিসিএসে পাস করা আর দক্ষিণ মহাসাগর পাড়ি দেওয়া প্রায় একই। কেননা দুই-তিন বছর ধরে চলে পুরো প্রক্রিয়া। কারও কারও ক্ষেত্রে বহু সাধনার ফল ঘরে তুলতে গিয়ে বিপত্তি বাধায় 'তথাকথিত' প্রতিবেদন। কত স্বপ্নের যে অপমৃত্যু তা কখনোই কেউ জানে না। অনেকে এমন চর্চাকে অনৈতিক বলেন। তবে কারও ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা থাকলে ভিন্ন কথা। আর আমাদের সংস্কৃতিতে কাউকে ফাঁসানোর প্রয়োজনে ব্যাপারটা দাঁড়ায় 'থানার পাশ দিয়ে যাচ্ছি চাচার নামে একটা মামলা করি'।

ষষ্ঠত, নাট্যব্যক্তিত্ব চঞ্চল চৌধুরী ১৪ নভেম্বর বলেছেন, এখন নাটক পদ্ধতি 'ধর তক্তা মার পেরেক'। বাঙালি এক মা তার সন্তানের টেলিভিশন দেখা নিয়ে ভীষণ চিন্তিত পত্রিকায় দেখলাম। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের নাটকগুলো ছিল পরিবারের সবাই মিলে উপভোগের। এখনকার বেশির ভাগ নাটকে কোনো বার্তা তো থাকেই না, শুধুই কুরুচিকর সংলাপ আর অশ্নীল অঙ্গভঙ্গি।

সপ্তমত, অনেকের মতো আমারও একটা ফেসবুক আইডি আছে। ফলে বিভিন্নজনের কাছ থেকে বন্ধুযোগের অনুরোধ পাই। যেহেতু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক খবর দ্রুত চাউর হয় সেহেতু বন্ধু গ্রহণের আগে দেখি অনুরোধকারীর পরিচয়। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের বিশাল অংশের পরিচয় থাকে রাজনৈতিক দলের কর্মী। এটা কেমন যেন বেমানান, নিদেনপক্ষে থাকা উচিত অধ্যয়নরত বিভাগের পরিচয়। অর্থাৎ তার কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ই গুরুত্বপূর্ণ। অল্প শ্রমে সফলতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে কথা!

ওপরের উদাহরণসমূহ মানুষের জীবনচক্রের সঙ্গে কিছুটা হলেও সাদৃশ্যপূর্ণ। উত্তরাধিকারীদের নিরাপদ দেখতে চায়। প্রথম পয়েন্টের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। বার্ধক্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরে বিভিন্ন রোগ বাসা বাঁধে, সবকিছু সুরক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে। তাই অর্জিত সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। তৃতীয় ও চতুর্থ পয়েন্টগুলোর মিল কি আছে? আবার যদি বিভিন্ন রোগ একসঙ্গে হয় তবে একটার (যেমন ডায়াবেটিস) কারণে অন্যটার সমস্যাও বাড়ে, দ্বিতীয়টি এখানে মিলে। বয়স এবং রোগের কারণে খাবারে অরুচি আসে, তখন বাঁচার স্বার্থে খেতে হয়- ষষ্ঠটি মিলে যায়। পরিবারে বা সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিকে কেউ যখন সময় দেয় না তখন মনোযোগ প্রাপ্তির আশায় সে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে, এটা সপ্তম পয়েন্টের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ডাক্তারের কাছে দৌড়াতে দৌড়াতে অতিষ্ঠ হয়ে একসময় নিজেই ডাক্তার বনে যায়, অনেক কিছুই তার নিয়ন্ত্রণে না থাকায় সৃষ্টিকর্তার হাতে সবকিছু সঁপে দেয়, পঞ্চমটির মিল আছে এখানে। তবে একেক মানুষের ক্ষেত্রে বয়সের প্রভাব একেক রকম। সবই নির্ভর করে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষা ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর। উপরোক্ত উদহারণগুলো দেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করলে কি মনে হবে না যে বাংলাদেশ 'বুড়িয়ে' যাচ্ছে? বিদ্যমান নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কতিপয় মানুষ ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলে সর্বদা নিয়োজিত- দেশ আর দশের কথা গোল্লায় যাক।

পরিশেষে, বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি। জাপানে পোস্টডক্টরেট সময়ে সিটি কাউন্সিলের বাসার আবেদন করি। তৎকালীন সময়ে আমার বেতন ছিল মোটা অঙ্কের। যেহেতু বাসা পাওয়ার যোগ্যতা ছিল প্রার্থীকে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী বা পেনশনার হতে হবে (পোস্টডক্টরেট ফেলো না), আবেদনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট কর্তাব্যক্তি আমাকে ফোনে ডেকে পাঠালেন। বেতনের পরিমাণ আর সাক্ষাৎকার শুনে তার মাথা হেঁট! বেশ কিছু সরকারি নথি ঘণ্টা দুই পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিশ্নেষণ করে জানালেন 'আমি বাসা পাওয়ার যোগ্য'! অবাক হলাম তাদের প্রাতিষ্ঠানিক (লিখিত) নিয়মকানুন দেখে- যা কখনোই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠাননির্ভর নয়। এখানেই আমাদের ব্যাপক দুর্বলতা। এই সুযোগে যে যেভাবে পারছে নিজের বা গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিয়োজিত।

আমাদের দেশে শিক্ষিত অনেক, কিন্তু 'সুশিক্ষিত' কম। মানুষ পাপী হিসেবে জন্মায় না, চারপাশের বৈষম্য বা ক্ষমতা বা সম্পদের লিপ্সা তাকে পাপে উৎসাহিত করে। কথায় আছে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। ছেলের কুকীর্তির কারণে বর্তমান এক জনপ্রতিনিধির সরকারি সম্পদ দখলের কথা এখন শুনছি। এগুলো অর্জনের সময় তিনি কখনও কি ভেবেছেন বয়সকালে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, মোটেই না। জানলে কি তিনি করতেন? বলা দুস্কর।

যদিও সামাজিক মূল্যবোধ আর পদ্ধতিগত বিশৃঙ্খলতা নিয়ন্ত্রণের গুরুদায়িত্ব সরকারের একার নয়, তবে সুশাসন এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। আর দরকার 'মানবিক মানুষ'। লাখ বা কোটি গোল্ডেন এ প্লাস বা সম্পদশালী দিয়ে কী হবে, যদি যৌবনে থাকা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ধরে রাখতে না পারি? নীতিনির্ধারকরা কি ভেবে দেখবেন?

স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড পল্গ্যানেটারি সায়েন্সেস কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া

বিষয় : ড. আশরাফ দেওয়ান সমাজ

মন্তব্য করুন