উগ্রবাদীদের আস্ম্ফালনের শেষ কোথায়- আমি তো এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না যেহেতু আমি সর্বজ্ঞ বা সর্বজান্তা বা দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন কোনো মানুষ নই। দেশকে ভালোবাসি ব্যস এটুকুই আমার পরিচয়। এ পরিচয়ে আমি গর্বিতও বটে। তবু কিছু অনুমান তো করতেই হবে। আমার দৃঢ় এবং আশাবাদী অনুমান হলো, অতঃপর '৬৯-এর চেয়েও বড় ধরনের এক মহাগণঅভ্যুত্থান। কারা ডাক দেবেন ওই গণঅভ্যুত্থানের? কার আহ্বানের অপেক্ষায় ওই অভ্যুত্থান? কারও আহ্বানের অপেক্ষায় ওই অভ্যুত্থানের নায়ক-নায়িকারা বসে থাকবেন না। কখন হবে গণঅভ্যুত্থান? না এই প্রশ্নেরও পূর্ণাঙ্গ উত্তর এই মুহূর্তে আমার কাছে নেই। তবে যা বলতে পারি এবং যা অবশ্যম্ভাবী তা হলো, বাংলাদেশের ঘুমন্ত যুবসমাজ। তারা জেগে ওঠামাত্রই দেশে ঘটবে বিস্ম্ফোরণ। যুবসমাজই ভাষা আন্দোলন করেছে, তার আগে তারাই ইংরেজ তাড়িয়েছে, তারাই বিভ্রান্তির কবলে পড়ে পাকিস্তান এনেছিল, তারাই আবার ততোধিক শক্তি নিয়ে জেল-জুলুম, হাজারো নির্যাতন সহ্য করে ওই পাকিস্তানকে 'গুড বাই' জানিয়েছে। তারাই অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করে, তার আগে ২৩ বছর ধরে পাকিস্তান স্রষ্টা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ও পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের বাঙালিবিরোধী, মৌলিক অধিকারবিরোধী, নারী নির্যাতনবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা ও অর্থনৈতিকসহ তাবত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছে। ত্রিশ লাখ বাঙালির প্রাণের ও কয়েক লাখ বাঙালি নারীর সল্ফ্ভ্রমের বিনিময়ে নয় মাসব্যাপী ইতিহাস সৃষ্টিকারী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে পরিচালিত করেছে। তাই গণবিস্ম্ফোরণ, গণঅভ্যুত্থান অপরিহার্য।

নেতৃত্ব কে দেবে, দেশ নেতৃত্বহীন এসব কথা তোলাটা অর্থহীন। কারণ কেউ মাতৃগর্ভ থেকে নেতা হয়ে বের হন না, কাজের ভিত্তিতেই কোনো এক বা একাধিক সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। জনগণের স্বার্থে নিরন্তর, নিঃস্বার্থ ও সাহসিকতার সঙ্গে জনগণকে সংগঠিত করে লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলনের মাধ্যমেই নেতা হয়ে গড়ে ওঠেন। সেভাবেই গড়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ এবং ছোটখাটো হলেও আমরা আরও হাজারে হাজারে নিজ নিজ অঞ্চল ও এলাকায় নেতা হিসেবে, স্থানীয় নেতা হিসেবে জনগণের শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলাম। তাই নেতার সৃষ্টিও অবশ্যই হবে।

আজ যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তার আদর্শ, তার ইতিহাস ও তার মর্যাদা রক্ষা করবেন বা যাদের ওপর সেই মহান দায়িত্ব বর্তেছে, তাদের একটি অংশ ইতোমধ্যেই গর্জে উঠতে শুরু করেছে। ঢাকার শাহবাগ হয়ে উঠেছে আমাদের যুগের পল্টন ময়দান। তারা সেখানে সমবেত হয়ে তাদের দাবি যা আজ নতুন করে সামনে এসেছে তা হলো, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে ইসলামী ঐক্যজোট বা ইসলামী মৌলবাদীদের হুঁশিয়ারি। এদের আস্ম্ফালন বিনা চ্যালেঞ্জে যাচ্ছে না, যেতে দেওয়া হবেও না। তবে ওরা সাহস পেয়েছে সরকারের কতিপয় কাজের ফলে। যেমন, ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ রাতে দেশের সর্বোচ্চ বিচার প্রাঙ্গণ সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে মৌলবাদীদের দাবি মেনে নিয়ে 'লেডি জাস্টিস' ভাস্কর্যটি লোকচক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর রাতে রাজধানীর বলাকা ভবনের সামনের রাস্তায় 'বলাকা' ভাস্কর্যে হামলা চালায় একটি উগ্রবাদী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। একই বছর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের গোল চত্বরে 'বাউল' ভাস্কর্যে হামলা চালায় মৌলবাদী গোষ্ঠী।

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ করে হেফাজতে ইসলাম দেশ থেকে সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার আলটিমেটাম দিয়েছিল সরকারকে। তারা ওই সমাবেশে সরকারের প্রগতিমুখীন নারীনীতি, শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিও তুলেছিল। তাদের ঘোষিত ১৩ দফা কর্মসূচিতে নারীকে পঞ্চম শ্রেণির বেশি স্কুলে না পড়িয়ে বাড়িতে ২৪ ঘণ্টা আটকে রেখে নারী প্রগতির বিরোধিতাই শুধু নয়, নারীর প্রতি চরম অমর্যাদাও প্রদর্শন করেছিল। সর্বোপরি তাদের দাবিকৃত ১৩ দফা না মানলে সরকার ফেলে দেওয়ার হুমকিও দিয়ে চলেছিল। প্রচলিত শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে অমুসলিম খ্যাতনামা সাহিত্যিক, কবিদের লেখা প্রত্যাহার করে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লেখকদের রচনা নিয়ে পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণের দাবি তুলে তা কার্যকর করিয়ে নিতেও সক্ষম হয়েছিল। তার পরও তারা থামেনি। প্রশ্রয় পেতে পেতে তারা মাথায় উঠেছে। আজ ধরাকে সরা জ্ঞান করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না তারা। সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের জনপ্রিয় ক্রিকেট তারকা, বাংলাদেশের গর্ব, বাঙালির অহংকার। মৌলবাদীরা হুঙ্কার দিয়ে ভিডিওকলের মাধ্যমে তরবারি উঁচিয়ে সাকিবকে হত্যা করার হুমকি দেয়। স্পর্ধাও বটে। সরকার ওই হুমকিদাতাকে গ্রেপ্তার করেছে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে। জানামতে, ওই অভিযুক্ত হুমকিদাতা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপরাধ করলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি। এ ছাড়া ওই ভিডিওতে হুমকি দানকালে সে তার নির্দেশদাতা দু'জনের নামও নাকি বলেছে। কিন্তু তাদের কাউকে গ্রেপ্তারের খবর আজও পাওয়া যায়নি।

জামায়াতে ইসলামীসহ এ দেশের উগ্রপন্থি মোল্লারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেনি, করেছে পাকিস্তানের দালালি। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতেই তাদের ঠাঁই হয়েছে। কিন্তু তারা কি আদৌ বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণকামী? তারা কল্যাণের শক্তি, নাকি অকল্যাণের শক্তি? এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের মোকাবিলা করতে হবে। তাদের ছাড় দিতে থাকলে ভবিষ্যতে বহু লোককে অনুরূপ হুমকি দিতে বা এমনকি প্রাণ সংহার করতেও উৎসাহিত বোধ করবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবোধে সমৃদ্ধ হয়ে আসুন ওই অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দেশজোড়া শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলি, দেশের গণআন্দোলনের মূলস্রোতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ওই ধর্মীয় অপশক্তিগুলোর কাছে সরকারের নতিস্বীকারের বিরোধিতা করি।

উগ্রপন্থি মোল্লারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করতে চাইবে- এটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা? সবাই কি চোখ বুজে থাকব? সরকার আজও হুমকিদাতাদের গ্রেপ্তার না করে বেআইনি ঘোষণা করে পরোক্ষে পুনরায় তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। একে রুখতেই হবে আন্দোলন সংগ্রাম-সমাবেশের মাধ্যমে। দাবি করি, যারা হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে জাস্টিসিয়া বা লেডি জাস্টিস নামক ভাস্কর্য সরানোর দাবি তুলেছিল, যারা 'বলাকা' ভাস্কর্যে হামলা চালিয়েছিল, যারা ঢাকা বিমানবন্দরের সম্মুখের গোলচত্বরে দৃষ্টিনন্দন 'বাউল ভাস্কর্যে' হামলা চালিয়েছিল, যারা এখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালাচ্ছে বা চরম ধৃষ্টতা দেখিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করছে, তাদের অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। ওই অপশক্তির বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে।

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ

raneshmaitra@gmail.com

বিষয় : সমকালীন প্রসঙ্গ রণেশ মৈত্র

মন্তব্য করুন