ঢাকা শহর খুবই আশীর্বাদপুষ্ট একটি শহর, যার ভেতর দিয়ে একটি এবং চারদিকে ছয়টি নদী প্রবাহিত। ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছে এ সাতটি নদীর প্রবাহ। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা দেখি, সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে বড় বড় নদীর পাশে। ঢাকা শহরও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। ঢাকা শহরের ভেতরেই বুড়িগঙ্গা, যাতায়াত ব্যবস্থার কথা চিন্তা করে মোগল আমলে এই শহরকে রাজধানী করা হয়। বুড়িগঙ্গার ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বও রয়েছে।

অনাদিকাল থেকেই বুড়িগঙ্গা নৌ-যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম। বুড়িগঙ্গার পানি-জলজসম্পদ পরিবহন করে মানুষের যে অর্থনৈতিক আয় হয় তাকে কোনোভাবে অস্বীকার করা যায় না। বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসবাসরতদের জীবন-জীবিকা কিন্তু এই নদীর ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। এখনও তাদের চাহিদা মেটাচ্ছে বুড়িগঙ্গার দূষিত পানি। কারণ তাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

ঢাকা শহরের আশপাশে সাতটি নদী থাকার পরও পানি আনতে হয় মেঘনা থেকে। যদি বুড়িগঙ্গার প্রবাহ চলমান থাকত তাহলে মেঘনা থেকে পানি আনার ক্ষেত্রে কিংবা ভূগর্ভস্থ পানি তোলার ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে তা থেকে বেঁচে যাওয়া যেত। বুড়িগঙ্গার পানি আমাদের দৈনদিন কাজ কিংবা শিল্পকাজে ব্যবহূত হতে পারত। আমরা সেদিকে দৃষ্টি না রেখে বরং বুড়িগঙ্গাকে দূষণ ও দখল করেছি। ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গার অবদান অস্বীকার করা যায় না। এমনকি যারা দূষণ করছেন তাদের বর্জ্যগুলোও বুড়িগঙ্গা ধারণ করছে কোনো অভিযোগ ছাড়াই।

ঢাকা মহানগরী পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ৪৭ হাজার মানুষের বসবাস। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াত এবং পানির চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে নদীগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। ঢাকা শহরে খাদ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গার ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল, সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার মৎস্যসম্পদও ধ্বংস করা হয়েছে।

প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বুড়িগঙ্গার এমন অবস্থা হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা নদীটিকে দূষণমুক্ত করতে পারিনি। বুড়িগঙ্গা যে কেবল শিল্প প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পর্যায় থেকে দখল ও দূষণ হচ্ছে তা কিন্তু নয়; রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও বুড়িগঙ্গার জায়গা লিজ দেওয়া হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় না করায় আমরা দেখেছি বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে বুড়িগঙ্গার জমি তাদের জায়গা, জেলা প্রশাসক আবার সেই জায়গা লিজ দিয়ে দিয়েছেন। সমন্বয়হীনতার কারণে এ রকম একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় মূলত দখল ও দূষণ বেড়েছে। ২০০০ সাল থেকে কোর্ট দখলদার উচ্ছেদের কথা বলে আসছে। আমরা দেখেছি, মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ হলেও আবার দখল হয়ে যায়। সরকারি-বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানই বুড়িগঙ্গার জায়গা দখল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান দখলের পথ সুগম করেছে। অর্থাৎ জনগণের সম্পদ জনগণের কাছ থেকে দখল করে নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা অথবা ক্ষমতাসীনদের উদাসীনতা, অবহেলা, দুর্নীতি ও দুর্বলতার কারণে অন্যরা দখল করে নিয়েছে। এখন আবার জনগণের হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কিন্তু নদী দখলমুক্ত করার পর তা টিকিয়ে রাখার জন্য আদালত ও নাগরিক সমাজ যে ধরনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা বলেছে, সেগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বাস্তবায়ন হলেও সামগ্রিকভাবে হচ্ছে না।

বুড়িগঙ্গা দূষণের জন্য মোটা দাগে দায়ী হাজারীবাগের ট্যানারি। এই ট্যানারিকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বুড়িগঙ্গাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হাজারীবাগের ট্যানারি ও বুড়িগঙ্গা এই দুইয়ের আর্থ-সামাজিক প্রভাব আমরা চিন্তা করিনি। আমরা কখনও হিসাব করিনি যে, ৮৭টি ট্যানারি প্রতিষ্ঠান যদি বন্ধ হয়ে যায় এবং সত্যিকার অর্থেই যদি দেশে ট্যানারি শিল্পের চাহিদা থাকে, তাহলে অন্য কোনো স্থানে এ শিল্প স্থানান্তর করা যাবে। কিন্তু আমাদের উন্নয়নের সংজ্ঞাটাই হলো দূষণ! দূষণ করা মানেই আমরা উন্নয়ন করছি। অনেকেই উন্নয়ন ও দূষণকে সমার্থক হিসেবে দেখেন। পরিবেশ অধিদপ্তর খুবই লজ্জাবোধ করে দূষণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। কারণ তারাও মনে করে উন্নয়নই আগে হওয়া উচিত, পরিবেশের চিন্তা পরে।

যদি ১০০টি ট্যানারি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে পুনরায় ট্যানারি ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। কিন্তু বুড়িগঙ্গাকে ধ্বংস করে আরেকটি বুড়িগঙ্গা কি সৃষ্টি করা সম্ভব? যে সম্পদ সৃষ্টি করা যায় না তা ধ্বংস করার কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আইনি কিংবা নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না। নদীকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন হয় তা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। অথচ আমরা টেকসই উন্নয়নের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ! হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্প নিয়ন্ত্রণে সরকার যে পরিমাণ নমনীয়তা দেখিয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঠিক একই কাণ্ড এখন ঘটছে ধলেশ্বরীতে। সরকার সেখানে ট্যানারিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এর ফলে বুড়িগঙ্গার জেলেদের মতো ধলেশ্বরীর জেলেরাও জীবিকা হারিয়েছেন, ধলেশ্বরীর পানি দূষিত হচ্ছে, সেখানকার কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা লাভ-লোকসানের হিসাব করি কিন্তু 'কস্ট বেনিফিট অ্যানালাইসিস' করি না। যদি এটা করা হতো তাহলে আমরা দেখতাম, নদীদূষণ করে সুষম বা ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন করা যায় না।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বুড়িগঙ্গা তীরের বাসিন্দাদের অবস্থা উঠে এসেছে। স্থানীয়দের মতে, লকডাউনে শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকায় বুড়িগঙ্গায় দূষণ কমেছিল। তারা নদী থেকে মাছ আহরণ করেছিলেন। কিন্তু আবারও নদীদূষণ হচ্ছে, বুড়িগঙ্গায় মরা মাছ ভাসছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের যেমন অধিকার রয়েছে; তেমনি মাছ, পানি ও নদীরও অধিকার রয়েছে। নদী একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে আমাদের সর্বোচ্চ আদালতেও স্বীকৃত হয়েছে।

বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা করা দরকার নানা কারণে। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানেই বসবাস করুক না কেন অন্যসব নদীর নাম না জানলেও সবাই বুড়িগঙ্গার নাম ঠিকই জানেন। বুড়িগঙ্গা নিয়ে রচিত গান-কবিতার সংখ্যাও কম নয়। বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমেই দেশে নদী রক্ষার আন্দোলন শুরু হয়েছে। কাজেই বুড়িগঙ্গাকে যদি দখল ও দূষণমুক্ত করা যায় তাহলে কেবল একটা নদী ব্যবস্থাকেই রক্ষা করা হবে না, বরং অন্যান্য নদীর দখলদার ও দূষণকারীদের সামনে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে। এর মাধ্যমে নদী রক্ষা আন্দোলনকারীদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার হবে। দূষণ ও দখলদাররা এই বার্তা পাবে যে, তারাও আর বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না।

২০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনও বুড়িগঙ্গাকে দখল ও দূষণ করছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে প্রচুর পরিমাণ শক্ত বর্জ্য জমেছে। গত সোমবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক সভায় বলা হয়েছে, নদী দখল ও দূষণ রোধে গৃহীত প্রকল্পগুলো কোনো কাজে আসছে না। এর বাস্তবতা আমরা বুড়িগঙ্গাকে দেখলেই বুঝি। সরকার সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে আমরা যেমন হতাশ হতাম না, তেমনি সরকারের স্বচ্ছতার বিষয়েও কোনো প্রশ্ন থাকত না।

বুড়িগঙ্গাকে দখল ও দূষণমুক্ত করে একটি নদীতে ফিরিয়ে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে এমন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা করা যাবে না, যাতে নদীর কোনো অংশ ঝিলে বা খালে পরিণত হয়। নদীকে আমরা নদী হিসেবেই দেখতে চাই। বুড়িগঙ্গা যেহেতু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আর এর উন্নয়ন কাজও যেহেতু জনগণের টাকায় হবে, সুতরাং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা অনুয়ায়ী জনগণের অংশগ্রহণে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকার বুড়িগঙ্গা উদ্ধারে নামলে তা কেবল বাংলাদেশেই দৃষ্টান্ত হবে না বরং পুরো বিশ্বেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। দক্ষিণ কোরিয়া বা লন্ডন যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তার থেকে আমাদের দৃষ্টান্ত ভিন্ন হতে পারে। কারণ আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করব। এর থেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের সব নদীরক্ষা কর্মীরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন।

প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ পরিবেশ, আইনবিদ সমিতি, বেলা 

বিষয় : পরিবেশ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

মন্তব্য করুন