রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত কিন্ডারগার্টেনের 'দুর্দিন' নিয়ে শনিবারের সমকালে যে শীর্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বর্ষাযাপন' কবিতাটি। সেখানকার 'ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা' অংশটি প্রায়শই উদ্ৃব্দত হয়ে থাকে ছোটগল্প ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। কিন্ডারগার্টেনগুলো 'ছোট প্রাণ' সন্দেহ নেই। আমরা দেখি- পাড়া বা মহল্লার ছোট্ট পরিসর ভাড়া নিয়ে, আপাত শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে, বেঞ্চ-টেবিলসহ সীমিত শিক্ষা উপকরণ বিনিয়োগ করে, আশপাশেরই বিভিন্ন পরিবারের প্রাক-প্রাথমিক বা প্রাথমিক স্তরের শিশুদের নিয়ে গড়ে ওঠে এক একটি বাংলা বা ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেন। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই রয়েছে- শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে টিউশন ফি আদায় হয়, মোটাদাগে তার ৪০ ভাগ যায় শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনে, ৪০ ভাগ যায় বাড়ি ভাড়ায়, বাকি ২০ ভাগ যায় বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের বিল দিতে।

কিছু কিছু কিন্ডারগার্টেনের সেই 'আদর্শ' সংগতিও নেই। বাড়ি ভাড়া ও বিদ্যুৎ-পানির বিল দিয়ে যে সামান্য অর্থ বেঁচে যায়, তা-ই ভাগাভাগি করে নেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। স্কুলগুলোর নাম যত বাহারি হোক না কেন, বেশিরভাগের এমনই নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা। বড় পরিসরে, এমনকি স্থায়ী ভবনে বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন নেই- এমন নয়। কিন্তু সেগুলো সংখ্যায় অতি সামান্য। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে নামিদামি বেসরকারি স্কুলগুলোরও নাজুক পরিস্থিতি সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। বস্তুত বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সরকারি শিক্ষা খাতেই বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল, সেখানে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেসরকারি শিক্ষা খাতের জন্য সহজ নয়। বিশেষত ছোট প্রাণ কিন্ডারগার্টেনগুলোর জন্য করোনা পরিস্থিতি যেভাবে বড় ব্যথা হয়ে এসেছে, তা সামাল দেওয়া কঠিন। আলোচ্য প্রতিবেদনে কিন্ডারগার্টেনগুলোর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা এক কথায় মর্মান্তিক। স্কুল ভবন ও বসতবাড়ির ভাড়া একযোগে মেটাতে না পেরে উদ্যোক্তারা খোদ স্কুলে বসবাস করছেন; এক সময় শিক্ষকতা করা ব্যক্তিরা পেশা পরিবর্তন করে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি করছেন- এমন 'মানবিক সংবাদ' করোনা পরিস্থিতির প্রথম দিকে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসতে দেখা গিয়েছিল। বিদ্যালয় বিক্রি করে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তিও দেখা গিয়েছিল, স্বাভাবিক কারণেই কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি।

এখন দেখা যাচ্ছে, নীরবে বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড নামিয়ে মহল্লা এমনকি শহর ছেড়েছেন অনেক উদ্যোক্তা। কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে বলা হচ্ছে, ইতোমধ্যে দেশে অন্তত দেড় হাজার স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা আশঙ্কা করি, এই সংখ্যা আরও বেশি। কারণ অনেক এলাকায় নেহাত ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনগুলো হয়তো এই সমিতির সদস্য নয়। ডিসেম্বরের মধ্যে স্কুল খোলা না গেলে আরও ২০ হাজার কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে যে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে, তাও অসংগত হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, স্কুল খুললেও করোনা ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীরা আসবে তো? মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত অনেক পরিবার তাদের সন্তানকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ানোর সংগতিও যে হারিয়ে ফেলেছে, ভুলে যাওয়া চলবে না।

তাহলে দেশের কমবেশি ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেনের কী হবে? এগুলোর কার্যক্রম না থাকলে আসলে জানুয়ারিতে স্কুল বদলের ছাড়পত্র নেওয়া যে কঠিন হবে, সেই শঙ্কা সমকালের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে। যদিও নতুন বছরে স্কুল বদলের ক্ষেত্রে ছাড়পত্রের বিষয়টিতে ছাড় দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। কিন্তু আমরা মনে করি, নিছক শিক্ষাবর্ষ বা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার বিষয়; এসব স্কুলের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ পরিবারের জীবন-জীবিকারও প্রশ্ন। কমবেশি ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ায় আর্থ-সামাজিক সংকটও কম নয়। আমরা চাই, সরকার বন্ধ কিন্ডারগার্টেনগুলোর পাশে দাঁড়াক। সহায়তা হয়তো দীর্ঘমেয়াদের জন্য বাস্তবসম্মত নয়; তার বদলে সীমিত সুদে বা বিনা সুদে প্রণোদনা বা ঋণ দেওয়া হোক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্কুলগুলো নিশ্চয়ই ধীরে ধীরে শোধ করে দিতে পারবে। রবীন্দ্রনাথের ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা হয়তো সইতে পারে; কিন্তু কিন্ডারগার্টেনগুলোর বড় ব্যথা সইবে কীভাবে? ছোট প্রাণের ছোট গল্প শেষ হলেও রেশ রয়ে যায়; কিন্তু ছোট প্রাণের কিন্ডারগার্টেন একবার শেষ হলে আর ফিরতে পারবে কিনা সন্দেহ।

বিষয় : কিন্ডারগার্টেন রাজধানী

মন্তব্য করুন