ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনো প্রকারেই হোক পাঞ্জাবভিত্তিক কৃষক আন্দোলন এবারের মতো দমাতে পারবে বটে; কিন্তু এটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার জন্ম দেবে। এই আন্দোলন কৃষক ও সরকার উভয়ের জন্যই অস্তিত্বের বিষয় হলেও এই সমস্যার সমাধানে আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট। যা একটি ঝড়ের পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

কৃষকরা দেখছে, অর্থনৈতিক জটিলতার কারণে তাদের রাজনৈতিক সত্তা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে; সেটিই আন্দোলনের জীয়নকাঠি। ভারতের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ক্ষমতা কমছে। সেপ্টেম্বরে ভারতে নতুন কৃষি আইন পাস হওয়ার পর থেকেই কৃষকরা বিক্ষুব্ধ। গত তিন দিন ধরে পাঞ্জাব ছাড়াও হরিয়ানা, রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের হাজার হাজার কৃষক রাজধানী দিল্লির দিকে অগ্রসর হয়ে সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কৃষিনির্ভর দুই রাজ্য হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে এই কৃষক আন্দোলন বেশি জোরালো।

সরকার যদি কৃষকের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করে এরকম আইনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে সেটি কৃষকের জন্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মৃত্যুর ঘণ্টাধ্বনির মতো। আলোচনার ক্ষেত্রে পাঞ্জাবের কৃষকদের অংশগ্রহণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সরকার সে ঔদ্ধত্যের প্রমাণও দিয়েছে। নিকট-ভবিষ্যতে কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। এই পরিবর্তন কিন্তু কৃষকদের শক্তিশালী করছে না। প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলন কতটা কৃষক নেতৃত্বে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে? পাঞ্জাব সব সময়ই রাজনীতির ক্ষেত্রে সংবেদনশীল। কিন্তু একই সঙ্গে এটি অর্থনীতিরও কানাগলি। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক জরিপ অনুযায়ী, এখানে তরুণ বেকারের হার ২১ শতাংশ। তারা এমন এক জায়গায় রয়েছে, যেখান থেকে তারা না পারছে পুরোপুরি কৃষক হতে, আর না পারছে কোনো সম্মানের চাকরি। এদের ক্ষোভও আন্দোলনের সঙ্গে মিলে গেছে। ফলে কৃষকদের আন্দোলন যেমন টেকসই হতে পারে, তেমনি একটি শক্তির জায়গা হিসেবেও পরিচালিত হতে পারে।

কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য এটি হুমকির কারণ। পাঞ্জাবের রাজনীতির দিকে তাকালে মনে হয়, সরকার কিছু ঝুঁকি নিতে পারে। পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দল, যারা কৃষকের মুখোমুখি হয়েছে, সেখানে তারা এখন নিন্দিত। আম আদমি পার্টির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এমনকি এ আন্দোলনে কিছু পদক্ষেপও কংগ্রেসকে ভোগাবে। ফলে পাঞ্জাবে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিটা এখানেই যে, কোনো রাজনৈতিক দলই হয়তো এই ক্ষোভ প্রশমন করতে সক্ষম হবে না।

দৃশ্যত রাজ্য সরকারও সেখানে প্রান্তিকে রয়েছে। সেটিও একটা সমস্যা তৈরি করতে পারে। সরকারের পাস হওয়া বিতর্কিত তিন বিলের ফলে কৃষকদের 'নূ্যনতম সহায়ক মূল্য' বা এমএসপি নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এমএসপির ব্যাপারে আশ্বাস দিলেও সেটি কেবল আশ্বাসই হবে। সেটি সত্যি হলে উভয় পক্ষেরই মুখ রক্ষা হবে। কিন্তু তাও নির্ভর করবে আপনি কতটা সরকারকে বিশ্বাস করেন। সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে না পারার কারণে পাঞ্জাবে পণ্যের বৈচিত্রায়ণে যে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পাঞ্জাবে কৃষকদের ভয়ের কারণ রয়েছে। ভারতের কৃষি সংক্রান্ত তিনটি বিলের বিস্তারিত আলোচনার জায়গা এটি নয়। তবে সংকটের ব্যাপ্তি যখন বড় তখন এগুলো কীভাবে কাজ করবে এবং কে ঝুঁকি নেবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কৃষকের ভয়ের জায়গা হলো কৃষিবাজার ও সংগ্রহ মূল্য কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষকের দরকষাকষির যে ক্ষমতা তাও কমে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার মীমাংসার জায়গা থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বাজারমূল্যের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে পারত।

প্রতিষ্ঠানিক অবস্থা থেকে গণবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনা একটি চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক বছর ধরে উন্মুক্ত জায়গায় আন্দোলন করা কঠিন, কারণ পরিকল্পিতভাবেই গণবিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সরকারও এ ভয় করছে যে, গণবিক্ষোভ একটি শক্তি তৈরি করবে। যার ফলে আমরা দেখছি জোরপূর্বক বিক্ষোভ বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও দিল্লি সীমান্তে আমরা তা-ই লক্ষ্য করেছি। সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। এমনকি জলকামানও ব্যবহার করা হয়েছে। নাগরিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের বিষয়ে আমাদের আরও এগিয়ে আসতে হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অনুমতি না দিলে বরং তা সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করবে।

সরকার তার সব শক্তি ব্যয় করে কৃষকদের আন্দোলন এ পর্যায়ে থামাতে পারবে বটে; কিন্তু এর জেরে একটা ক্ষোভ থেকেই যাবে। এখানে সহযোগিতামূলক সরকারের অনুপস্থিতি একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকের দুর্বলতায় আন্দোলন ভিন্ন আকার ধারণ করবে। এ অবস্থায় সরকার ও কৃষকদের মধ্যে আস্থা প্রয়োজন। উভয়ের মধ্যে আস্থা এবং কৃষককে প্রয়োজনীয় আশ্বাস দিয়ে অবস্থার উত্তরণ জরুরি। সরকারের পক্ষে জেতা সহজ; কিন্তু ভারতের রাজনীতিতে এই আপৎকালীন জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা আর কত?

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর

বিষয় : প্রতিবেশী প্রতাপ ভানু মেহতা

মন্তব্য করুন