শিশুদের স্কুলে লটারির মাধ্যমে ভর্তির বিষয়টি ২০১০-১১ সালের পর আবার আলোচনায় এসেছে। ২০১১ সালে সমকালেই লিখেছিলাম 'ভাগ্যই বিজয়ী হোক'। এবার করোনার সময় যখন লটারির পরিধি বাড়ছে, অর্থাৎ এতদিন কেবল প্রথম শ্রেণিতেই ছিল, এখন নবম পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে লটারি হলেও বিজয়টা করোনার নয় বরং ভাগ্যেরই। এ সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে খুশি হয়েছেন, আবার অনেক অভিভাবকই মন খারাপ করেছেন। লটারি যেখানে ভাগ্যের বিষয়, সেখানে 'প্রত্যাশিত' প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পারার বেদনা কাউকে না কাউকে তো সইতে হবেই। প্রশ্ন হলো, প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান কোনগুলো? তার আগে বলা দরকার, শিক্ষামন্ত্রী এ-বিষয়ক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন : 'ক্যাচমেন্ট এরিয়া' বা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকা। আমি মনে করি, প্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান আর ক্যাচমেন্ট এরিয়া- এই দুটি জটিলতা নিরসনের ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে স্কুলে ভর্তি সমস্যার সমাধান।\হপ্রত্যাশিত প্রতিষ্ঠান মানে সবাই ভালো ফল অর্জনকারী নামিদামি প্রতিষ্ঠানই বুঝে থাকেন। ওই সব প্রতিষ্ঠানে সন্তানের ভর্তি অনেকের কাছে সামাজিকভাবে সম্মানেরও বিষয়। সেগুলোতে অভিভাবকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ১০ বছর আগেও যখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হতো, আমরা তখন কী এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখেছিলাম। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিশুর স্বাভাবিক খেলাধুলা বাদ দিয়ে বই-খাতা-কলম নিয়ে বসে থাকা আর টিউটর-কোচিং সেন্টারে দৌড়ঝাঁপ করতে হতো। এমনকি কোনো কোনো অভিভাবক অন্য প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে উঠলেও সন্তান নামিদামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সেখানে প্রথম শ্রেণিতেই ভর্তি করিয়ে দিতেন!\হপ্রথম শ্রেণির ভর্তিতে লটারির প্রচলন করায় অন্তত শিশুরা কিছুটা হলে স্বস্তি পেলেও তা থেকে একেবারে মুক্তি মেলেনি। কারণ দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই আবার সেই ভর্তি পরীক্ষা। প্রথম শ্রেণিতে যে কোনো রকম একটা স্কুলে ভর্তি হয়েছে, আবার দ্বিতীয় শ্রেণিতেই তাকে 'প্রত্যাশিত' প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য অভিভাবকরা সেই প্রস্তুতিতে নেমে পড়তেন। ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই অনেকে এ বছর স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিও নিয়েছে। করোনার কারণে হলেও এবার তা থেকে মুক্তি মিলছে বলেই আমার মনে হয়। বলা বাহুল্য, এবার বার্ষিক পরীক্ষা হচ্ছে না বলে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরের শ্রেণিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উঠে যাবে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কেউ ভর্তি হতে গেলে তখনই লটারির মাধ্যমে ভর্তির বিষয় আসবে। আরও বলা প্রয়োজন, অনেক প্রতিষ্ঠানই আছে, যেখানে ভর্তির জন্য পরীক্ষা কিংবা লটারি কোনোটারই প্রয়োজন হয় না। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তারা নির্দিষ্ট আসন পূরণের জন্য কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থীই পায় না। সবাই নামিদামি প্রতিষ্ঠানে দৌড়ায় বলেই তারা একাধিক শাখা এমনকি এক শাখায় একাধিক ব্যাচও পরিচালনা করে। তাতে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় শিক্ষার্থী 'খরায়' ভোগে। কিংবা নামিদামি স্কুলে পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো শিক্ষার্থী ভর্তির পর পেছনের দিকের শিক্ষার্থীরা ওই সব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। তাতে দেখা যায়, পাবলিক পরীক্ষার ফলে অনেক সময় এরা পিছিয়ে যায়। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও হয়তো শিক্ষকের দক্ষতা ও অন্যান্য অবকাঠামোর দিক থেকে পিছিয়ে নেই। লটারির মাধ্যমে ভর্তির ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার এ বৈষম্য কমে আসার কথা।\হআমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানেই পরীক্ষা, সেখানেই বাণিজ্য। পাবলিক পরীক্ষাকেন্দ্রিক কোচিং-নোট-গাইড বাণিজ্য যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষাকেন্দ্রিক বাণিজ্যও বাদ যায়নি। লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু হলে সে বাণিজ্যও কমে আসবে। সেটি অনেক অভিভাবকের জন্যই স্বস্তির কারণ হবে। তাছাড়া লটারির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, নেদারল্যান্ডসসহ বিশ্বের অনেক দেশেই লটারির মাধ্যমে স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।\হশিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, এবার ঢাকা মহানগরীতে ক্যাচমেন্ট এরিয়া তথা স্কুলের আশপাশ এলাকার ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। আগে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো, এবার সেখানে ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আমি মনে করি, এটি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক দেশেই এটি ভালোভাবে অনুসরণ করা হয়; এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীকে ভর্তি হতে হবে। ভালো প্রতিষ্ঠান বলে অন্য এলাকায় গিয়ে সন্তানকে ভর্তি করানোর সুযোগ নেই। ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণে সরকারেরও নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। 'ক্যাচমেন্ট এরিয়া ম্যাপ তৈরি' সহায়িকা নামে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেছে। ক্যাচমেন্ট এরিয়া যথাযথভাবে নির্ধারণ করে, নির্দিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে অগ্রাধিকার আরও বাড়িয়ে (৭৫-৮০ শতাংশ পর্যন্ত) ভর্তির ক্ষেত্রে সঠিকভাবে তা বাস্তবায়ন করলে এলাকাভিত্তিক প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই মানসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে।


দুঃখজনক হলেও সত্য, ভর্তিতে লটারি কিংবা ক্যাচমেন্ট এরিয়া অনুযায়ী ভর্তি উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে 'ভর্তির লটারিতে স্বচ্ছতা দাবি' করেছেন  ভিভাবকরা। এর আগে ক্যাচমেন্ট এরিয়া অনুযায়ী ভর্তির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। সরকার যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেটি যথাযথ নিয়মে বাস্তবায়ন না করলে তা থেকে কোনোভাবেই আমরা সুফল পাব না। আমরা জানি, সরকারি স্কুলসহ নামিদামি প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই ভর্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোটা থাকে। কোটা পূরণের পর অন্য সবার ভর্তি একই নিয়মে হওয়া জরুরি। এখানেও যদি অর্থ কিংবা ক্ষমতার প্রভাব দেখা যায় সেটি দুর্ভাগ্যজনক। আবার ভর্তির চাহিদা থাকায় প্রতিষ্ঠান যে ইচ্ছামতো ফি আদায় করবে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়। ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি অনুসরণ করলে যেহেতু সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটবে, সব শ্রেণি-পেশার অভিভাবকের সন্তানরা ভর্তি হতে পারবে, সেহেতু ভর্তি ও টিউশন ফি নির্ধারণে বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে সেভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও অনেকেই মানেন না বলে প্রতি বছরই অভিযোগ ওঠে।
এ বছর করোনার কারণে স্কুল পর্যায়ে সব পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, তাই স্কুলে ভর্তি পরীক্ষাও বাতিল হবে- কেবল এই যুক্তিতেই নয় বরং স্কুল ভর্তিতে লটারি একটি যথাযথ পদ্ধতি। লটারি পদ্ধতি স্থায়ী হলে তার সুফল আমরা নানাভাবেই দেখতে পাব। শিশুদের ওপর চাপ কমবে, শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য কমবে, ভর্তিতে বৈষম্য কমবে এবং সব স্কুলের শিক্ষার মান, পরিবেশ ও ফল বিষয়ক ব্যবধান কমবে বলেই বিশ্বাস। তার সঙ্গে যদি ভর্র্তিতে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাতে সোনায় সোহাগা। দুর্যোগের মধ্যেও শিশুদের একটি চাপমুক্ত ও স্বস্তির বছর শিক্ষার্থীর করোনা ভাগ্য বৈকি।
সাংবাদিক ও শিক্ষা গবেষক

mahfuz.manik@gmail.com

বিষয় : স্কুলে লটারি

মন্তব্য করুন