পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাত বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির ফলে সেখানে ধীরে ধীরে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ হ্রাস পায়। ওই চুক্তি চার খণ্ডে বিভক্ত। ক খণ্ডে চারটি, খ খণ্ডে ৩৫টি, গ খণ্ডে ১৪টি এবং ঘ খণ্ডে ১৯টিসহ মোট ৭২টি ধারা রয়েছে। এই চুক্তির ফলে ১৯৯৮ সালে সৃষ্টি হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। একই বছর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রণয়ন, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হয়েছে। চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ সরকার পর্যায়ক্রমে চুক্তির বেশ কিছু ধারা বাস্তবায়ন করেছে এবং অবশিষ্ট ধারাগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও অব্যাহত রেখেছে।\হগত ২৩ বছরে শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে\হ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে এবং ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য জেলাগুলোর প্রশাসনিক ৩৩ বিভাগের মধ্যে ১৭টি বিভাগ জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করেছে সরকার। বাকি তিনটি বিভাগ হস্তান্তরের জন্য দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা, পাহাড়িদের অভ্যন্তরীণ বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে কিছু ধারা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকার অবশিষ্ট ধারাগুলো বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে।\হসম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে পার্বত্য শান্তিচুক্তির সব ধারা পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু শান্তিচুক্তিতে পাহাড়িদের পক্ষে স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) ভাষ্যমতে, শান্তিচুক্তির ধারাগুলো বাস্তবায়ন হয়নি, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। তিনি বিভিন্ন সময় এই অভিযোগ করে থাকেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা রয়েছে। মূলত কিছু দাবি বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য পাহাড়ি সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বই অনেকাংশে দায়ী। শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সরকার চুক্তি করেছে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে; কিন্তু শান্তির জন্য অস্ত্র সমর্পণের যে প্রতিশ্রুতি জেএসএস নেতারা দিয়েছিলেন, গত ২৩ বছরেও তারা তা পূরণ করতে পুরোপুরি সক্ষম হননি। ফলে পাহাড়ে এখনও বিচ্ছিন্নভাবে রক্তপাত ঘটছে।
সন্তু লারমা শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বরাবরই সরকারকে দোষারোপ করে এসেছেন। চুক্তির একটি পক্ষ হয়ে তিনি বা তার সংগঠন কখনোই কোনো দায় নিতে চায়নি। অথচ আমরা দেখেছি, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সংকটগুলো তৈরি হয় সেগুলোর অধিকাংশের মূলে থাকে পাহাড়ি নেতা ও সংগঠনগুলোর বিরোধ। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো, সেখানকার ভূমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব। মূলত এ বিরোধ থেকেই সেখানে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটেছিল। সুতরাং এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা সহজ কোনো কাজ নয়। এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে অবশিষ্ট ধারাগুলো সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। বিগত সময়ে সন্তু লারমা এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে যথাযথভাবে সহযোগিতা করেননি বলে। যার ফলে চুক্তির কিছু ধারা এখনও ঝুলে আছে।\হপাহাড়ি সংগঠনগুলোর প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ডসহ নানা কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়েছে। সেখানে এখন আর যোগ্য নেতৃত্ব দেখা যাচ্ছে না। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করা। কিন্তু ১৯৯৮ সালে এ আইন পাস হলেও এখনও সেখানে কোনো নির্বাচন হয়নি। এর দায় কার? নির্বাচন না হওয়ায় সন্তু লারমার ওপর থেকে সেখানকার নেতাদের অনেকেই আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং দলগুলো উপদলে বিভক্ত হয়ে সন্তু লারমার\হক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। সন্তু লারমা নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় জমির মালিকানা থাকার বিষয়টি শর্ত হিসেবে জুড়ে দেন। এর ফলে আজও ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি, নির্বাচনও হয়নি। ফলে শুধু চুক্তি স্বাক্ষরকারী হিসেবে এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন সন্তু লারমা। কিন্তু এখন অনেকেই তার নেতৃত্ব মানতে চাচ্ছেন না। এ কারণে সেখানে অভ্যন্তরীণ বিবাদ জোরালো হচ্ছে; যা চুক্তি বাস্তবায়নের পথে অন্তরায়ও বটে।
মনে রাখতে হবে, যে কোনো চুক্তি এক দিনে বা একবারে পূর্ণ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। বাস্তবায়নের ধারা অব্যাহত রাখলে একটি নির্ধারিত সময় পর চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট ক্ষুদ্র কোনো বিষয় ছিল না। সেখানকার দীর্ঘদিনের রক্তপাত বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার আন্তরিকতা ও সাহসিকতার সঙ্গে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল বলেই শান্তিচুক্তি করতে সক্ষম হয়েছিল তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। এরপর পর্যায়ক্রমে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে হেঁটেছে সরকার। এখনও হাঁটছে চুক্তি বাস্তবায়নের পথে। কিন্তু চুক্তির কিছু খুঁটিনাটি বিষয়েও বিভিন্ন সময় আপত্তি তুলেছেন সন্তু লারমা। এর পরও চুক্তি বাস্তবায়নে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আদিবাসী নেতারা সরকারকে দোষারোপ না করে যদি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিরোধ, সহিংসতা ও বিভাজন দূর করতে পারেন, তাহলে তা চুক্তি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে। জটিলতা সৃষ্টি না করে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দুই পক্ষকেই নমনীয় হওয়া এবং একে অন্যকে সহযোগিতা করা জরুরি।\হসরকার চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ভূমি আইন সংশোধন করেছে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত কমিশন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পাহাড়ি নেতারা আন্তরিক হলে ভূমিবিরোধ দ্রুতই নিষ্পত্তি হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। দুই পক্ষ আন্তরিকতার সঙ্গে দ্রুতই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাবে- এই প্রত্যাশা করি।
  নিরাপত্তা বিশ্নেষক

বিষয় : পাহাড়িদের সংঘাতই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অন্তরায়

মন্তব্য করুন