অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য, নারী নির্যাতন সমাজ বাস্তবতার অন্যতম বৈরী পরিস্থিতি হিসেবে দৃশ্যমান। নানাভাবে নারী নির্যাতনের মতো কদর্য ঘটনা ঘটছেই। এমনকি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ধর্ষণবিরোধী আইন প্রণয়ন ও কার্যকরের পরও বর্বরতা বন্ধ হয়নি। এর পশ্চাৎ কারণ ফের ফুটে উঠেছে সোমবার ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল-সমকাল অনলাইন গোলটেবিল আলোচনায়। সহিংসতা বন্ধে নারীকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় যুক্ত করার পাশাপাশি নারী নির্যাতনকারী-ধর্ষককে রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে বয়কটের আহ্বান জানানো হয়েছে। 'নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা' শীর্ষক ওই অনলাইন আলোচনায় নিপীড়ক-নির্যাতককে নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়। আমরা জানি, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবে দুস্কর্মকারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পার পেয়ে যায়। পাশাপাশি এ ব্যাপারে প্রশাসনিক কোনো কোনো দায়িত্বশীলের উদাসীনতা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতাও পরিলক্ষিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই। নারীর প্রতি সহিংসতার ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এসবই প্রতিবন্ধক। নারী পারিবারিক সহিংসতারও শিকার হচ্ছেন এবং এ হার বাড়ছে, যা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। এ বছরের প্রথম চার মাসে ৩০ লাখ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন- এই উদ্বেগজনক তথ্যই বলে দেয়, নারী ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নন। আমরা জানি, নারী নির্যাতন বন্ধে গত ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ ঘোষিত ১৬ দিনের প্রচার কর্মসূচি চলছে। সমাজের যে কোনো কদর্যতা দূরীকরণে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জোরালো ভূমিকা অপরিহার্য। যে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাজে অপরাধ নির্মূলে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও যথাযথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দরকার রাজনৈতিক স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির পথ মসৃণ করা। রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির জোর, পাশাপাশি প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে কোনো নিপীড়ক-নির্যাতক যাতে পার পেতে না পারে ও অপরাধীর দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তি হয়- এ বিষয়গুলো যতক্ষণ নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ অন্ধকার থাকবেই। শুধু আলোচনা কিংবা সভা-সমাবেশে নারী নির্যাতন বন্ধের কথা বললেই চলবে না, নারীবান্ধব সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একদিকে নারী উন্নয়ন নীতির আলোকে সরকারের কল্যাণকর পরিকল্পনার কথা শুনি, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই নারী নির্যাতনের খবরও দেখি। এই বৈপরীত্যের নিরসন ঘটাতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে আরও বেশি বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনার বাস্তবায়নও সমভাবেই জরুরি। সব খবরই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে না; খবরের আড়ালেও খবর থেকে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার কারণেই আইনি প্রতিকারের পথ খুলছে- এ সত্য এড়ানোরও অবকাশ নেই। কঠোর আইন প্রণয়ন ও এর কার্যকারিতা অপরাধীর শিকড় উৎপাটনে জরুরি বটে। কিন্তু শুধু এ পথেই অপরাধীকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করা যাবে না। দরকার সামাজিক জাগরণও। তবে সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। যে বা যারা নারী নির্যাতনকারীর সহায়ক-পৃষ্ঠপোষক তাদেরও আনতে হবে আইনের আওতায়। সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পর্যায়ের লোকজনকে যখন নিপীড়ক হিসেবে দেখা যায়, তখন আমরা অধিকতর উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। জনপ্রতিনিধিদেরও এক্ষেত্রে যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখার অবকাশ রয়েছে। জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি নারীর কর্মক্ষেত্রের পরিসরও বিস্তৃত করা চাই। রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের এই দৃঢ়তার প্রকাশ বলিষ্ঠভাবে ঘটাতে হবে- নিপীড়ক-নির্যাতকের কোনো স্থান হবে না দলে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন- এই বার্তা যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তাহলে নারী নির্যাতনের মতো অনাচার-দুরাচারের ক্ষেত্র সংকুচিত হবে।