জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের অবহেলিত নারীসমাজকে জাগ্রত এবং ক্ষমতায়িত করার জন্য অবিস্মরণীয় অবদান যিনি রেখে গেছেন তার নাম বেগম রোকেয়া। ১৮৮০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বিংশ শতাব্দীর যে সময়ে বেগম রোকেয়ার জন্ম, তখন নারী সমাজকে ঘোর পর্দাপ্রথার নামে গৃহ অভ্যন্তরে বন্দি করে রাখা হতো। প্রকৃতপক্ষে এ সময় ভারত উপমহাদেশের শুধু বাঙালি মুসলমান নারী নয়, সমগ্র নারী জাতি ছিল অন্ধকারে। সমাজ ছিল কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। সেই অবস্থা থেকে নারীর জাগরণ, ক্ষমতায়ন, ও তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করা ছিল সত্যিকার অর্থেই দুরূহ ও কঠিন। কিন্তু সেই অন্ধকার অবস্থার মধ্যেও রোকেয়ার মনোজগৎ ছিল আলোকিত। তিনি নিজের চেষ্টায় অন্ধকার থেকে আলোর পথে হেঁটেছেন এবং অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে স্থির থেকেছেন। বেগম রোকেয়া নারী জাগরণ ও ক্ষমতায়নে কীভাবে নিজেকে তৈরি করছিলেন, তার প্রেক্ষাপট কমবেশি সবারই জানা। তথাপি বর্তমান প্রজন্মের পাঠকের সুবিধার্থে তার জীবনের তথ্যপঞ্জির উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র তুলে ধরছি।
বেগম রোকেয়ার বাবা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের এবং মাতা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। দু'জনই যুগের তুলনায় আধুনিক মানসিকতার হলেও নারীকে যে ঘরের মধ্যে সুকঠিন পর্দা মেনে চলতে হবে, সে বিষয়ে একমত ছিলেন। ফলে রোকেয়াকেও শিশুকাল থেকে চার দেয়ালে বন্দি অবস্থায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়েছিল। সাবের দম্পতির তিন পুত্র, তিন কন্যা। বোনদের মধ্যে রোকেয়া ছিলেন মেজ। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখে বড় ভাই মোহাম্মদ ইব্রাহিম আবুল আসাদ সাবের ছোটবেলা থেকে তাকে শিক্ষাদানে সচেষ্ট হন। বলতে গেলে বড় ভাইয়ের উৎসাহ আর চেষ্টার ফলেই রোকেয়ার ভেতর প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়।
রোকেয়ার বয়স যখন পাঁচ, তখন বড় বোন করিমুন্নেসা খানমের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যান। তারা ছিল শিক্ষিত ও আধুনিকমনস্ক পরিবার। সেখানে ইউরোপিয়ান গভর্ন্যাসের কাছ থেকে ইংরেজি অক্ষরের সঙ্গে রোকেয়ার পরিচয় ঘটে। এরপর গৃহকোণে বসে থেকেই তিনি ইংরেজি, ফার্সি, উর্দু বই পড়া শুরু করেন। উল্লেখ্য, করিমুন্নেসাও শ্রুতিধর ও জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ছিলেন। ছোট ভাইয়েরা মুন্সি সাহেবের কাছে ফার্সি শিখে আবৃত্তি করে শোনালে সঙ্গে সঙ্গেই করিমুন্নেসা মুখস্থ করতে পারতেন। ভাইদের বাংলা পড়া শুনেও তিনি মুখে মুখে আবৃত্তি করতেন। তিনি বাড়ির প্রাঙ্গণে অক্ষর এঁকে বাংলা লিখতে শিখেছিলেন, পুথি পড়তে জানতেন। একদিন পুথিপাঠ শুনে পিতা তাকে সাধু ভাষায় বাংলা পড়াতে লাগলেন। কিন্তু মেয়েকে বাংলা পড়ানো হচ্ছে জেনে মুরুব্বির দল বাধা দিল। তাদের অসন্তোষের কারণে পড়া বন্ধ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে। ১৪ বছর বয়সে এই বিয়ে করিমুন্নেসার জন্য শাপে বর হয়েছিল। শ্বশুরালয়ে গিয়ে কয়েকজন দেবর সম্পর্কের ছাত্রের সাহায্যে বাংলা ভাষা শিখে ফেলেন। বিয়ের ৯ বছরের মধ্যে বিধবা হলেও শিক্ষানুরাগের কারণেই তিনি বড় ছেলেকে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিলেন। ছোট ছেলেকে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি করেছিলেন।
করিমুন্নেসা খানম স্বভাব কবি ছিলেন। তার কবিতা ছদ্মনামে পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করেন ছোট বোন রোকেয়া। বেগম রোকেয়া তার রচিত 'মতিচূর' দ্বিতীয় খণ্ড এই বড় বোনের নামে উৎসর্গ করে লিখছিলেন- 'আমি শৈশবে তোমার স্নেহের প্রসাদে বর্ণপরিচয় পড়তে শিখি। অন্য আত্মীয়রা আমার উর্দু-ফারসি পড়ায় তত আপত্তি না করিলেও বাঙ্গালা পড়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। একমাত্র তুমিই আমার বাঙ্গালা পড়ার অনুকূলে ছিলে।'
১৮৯৮ সালে বিহারের ভাগলপুরের খান বাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয়। তার স্বামী সময়ের তুলনায় আধুনিকমনস্ক ছিলেন। তিনি বিএএমআরএসি ডিগ্রিধারী ছিলেন। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখে স্বামী সাখাওয়াত হোসেনও বেগম রোকেয়াকে ইংরেজি শিক্ষা ও সাহিত্য রচনায় উৎসাহিত করেন। বিয়ের চার বছরের মাথায় ১৯০২ সালে 'নবপ্রভা' পত্রিকায় রোকেয়ার প্রথম রচনা 'পিপাসা' প্রকাশিত হয়। মহররম মাসে কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা কেন্দ্র করে গল্পটি রচিত। ১৯০৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয় 'মতিচূর' প্রথম খণ্ড। ১৯০৫ সালে তার প্রথম ইংরেজি রচনা 'সুলতানাস ড্রিম' প্রকাশ হয় মাদ্রাজের 'ইন্ডিয়ান লেডিস ম্যাগাজিন' পত্রিকায়। ১৯০৮ সালে রচনাটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।
সাহিত্য রচনার ক্রমবিকাশকালে বেগম রোকেয়ার জীবনে আসে ঝড়। ১৯০৯ সালে স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যু হয়। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। সাহসের সঙ্গে সকল বাধাবিপত্তি উপড়ে ফেলে সামাজিক কুসংস্কার মোকাবিলা করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান। শৈশবেই তার ভেতরে নারী জাগরণের যে স্বপ্নের বীজ রোপিত হয়েছিল, সেটিকে মেলে ধরার সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন। এক বছরের মধ্যেই প্রয়াত স্বামীর শুভাকাঙ্ক্ষী ভাগলপুরের তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ শাহ আব্দুল মালেক নারীশিক্ষা প্রসারে রোকেয়ার সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তার সরকারি বাসভবনের গোলকুঠিতে পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় নারীর নিজেরও শিক্ষা গ্রহণে তেমন আগ্রহ বা উৎসাহ না থাকায় তাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির কাজও শুরু করেন রোকেয়া। পাশাপাশি নারী শিক্ষার জন্য সামাজিক প্রতিকূলতাও অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
নারীসমাজকে জাগ্রত করার পাশাপাশি নিজের সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়; কিন্তু বেগম রোকেয়া নারী জাগরণে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন সাহিত্য সাধনার দ্বারা। সাহিত্যের এমন কোনো দিক তিনি বাদ রাখেননি- রম্য রচনা, রূপক কাহিনি, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, ইংরেজি প্রবন্ধ- সব শাখায় বিচরণ করেছেন। লেখনীর মাধ্যমে নারী জাগরণের পাশাপাশি নারীর প্রতি পুরুষের মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন। তিনি নারী-পুরুষের সমতায় বিশ্বাস করতেন; কিন্তু কখনোই পুরুষ জাতির প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করেননি। অনেক লেখনীতে তিনি নারীর ক্ষমতায়নে পুরুষকে পাশে চেয়েছেন। তিনি নারীর শিক্ষার প্রতি কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন তার গল্প, রূপক কাহিনি, নিবন্ধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়। নারীর শিশুকাল থেকে বিয়ে, গর্ভাবস্থা, সন্তান লালন-পালন, সন্তানের শিক্ষাদীক্ষা, ইংরেজি শিক্ষা- এমন কোনো দিক নেই যা তার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
মতিচূরের দ্বিতীয় খণ্ড 'শিশু-পালন' নিবন্ধে তিনি একজন শিশু বিশেষজ্ঞের মতো শিশুর লালন-পালন সম্পর্কে বলেছেন। বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি মেয়েদের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি নারীশিক্ষার বহুল প্রচারে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই নিবন্ধের শেষাংশে তিনি বলেছেন- 'আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধর রক্ষার জন্য দুটি বিষয় দরকারি হয়ে পড়েছে। প্রথমত, স্ত্রী শিক্ষার বহুল প্রচার, দ্বিতীয়ত, বাল্যবিবাহ রোধ করা।' তিনি আরও বলেছেন- 'আপনারা ভেবে দেখেছেন সধবা মেয়েমানুষ বেশির ভাগ মরে কেন? কারণ তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হয় বলে। এখন দেখছি, শিশু রক্ষা করতে হলে আগে শিশুর মায়েদের রক্ষা করা দরকার। ভালো ফসল পেতে হলে গাছে যেমন সার দেওয়া দরকার। বুঝলেন? মেয়েদেরও খাওয়া-দাওয়ার একটু যত্ন করেন।'
'মুক্তিফল' নামে একটি রূপকথায় তিনি নানান রকম রূপকের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, ভাইয়েরা বোনদের পাশে নিয়ে কাজ না করলে সে কাজে আশানুরূপ সফলতা পাওয়া যায় না। রূপকথার শুরুতে তিনি উল্লেখ করেছেন, এককালের ভোলাপুরের রানী একসময় কাঙালিনীতে পরিণত হয়েছিলেন। এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন- 'তিনি যখন রানী ছিলেন, তখন পুত্রদের অধিক স্নেহ করতেন; কন্যাদের একটুও আদর-যত্ন করতেন না। এক সন্ন্যাসী এ বিষয়টি লক্ষ্য করে একদিন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এটি অন্যায়- পরিণামে রানী তার অতি আদরের পুত্রদের দ্বারা কষ্ট পাবেন। কালক্রমে সন্ন্যাসীর এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলতে শুরু করে। রানী কাঙালিনীতে পরিণত হয়ে কঠিন অসুখে পড়েন। যথারীতি পুত্রদের ব্যবহারে মনোকষ্টে পড়েন। তার আরোগ্যের কোনো লক্ষণ নেই। একদিন যখন তার পুত্র-কন্যা মায়ের রোগমুক্তির জন্য একসঙ্গে কাজ করতে বদ্ধপরিকর হলো, তখনই মায়ের রোগের মুক্তিফল আনা সম্ভব হবে বলে মায়ের বিশ্বাস জন্মালো।' এই রূপকথার মাধ্যমে তিনি পুত্র-কন্যার প্রতি মা-বাবার সমদৃষ্টি দেওয়ার গুরুত্বকেই বোঝাতে চেয়েছেন।
বেগম রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, কোনো রোগের চিকিৎসা করতে হলে প্রথমে রোগীর অবস্থা ভালোভাবে জানা আবশ্যক। তাই নারী জাতির উন্নতির পথ আবিস্কার করার আগে কেন তাদের অবনতি হয়েছে সে সম্পর্কে তিনি গবেষণা করেছেন। তিনি তার লেখা 'স্ত্রীজাতির অবনতি' প্রবন্ধে নারীরা পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিণী না হয়ে কীভাবে দাসী হয়ে উঠেছিল তা দেখাতে চেয়েছেন। নারীরা যে ক্রমশ তাদের আলস্যের কারণে পুরুষের দাসে পরিণত হয়েছেন, তা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তার নিবন্ধে উপস্থাপন করেছেন। তিনি উলেল্গখ করেছেন 'দাসীপনা করতে করতে তাদের মন পর্যন্ত দাস হয়ে গিয়েছে। তারা দাসত্বে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।' তিনি নারীর বহুবিধ অলংকার পরিধানকে দাসত্বের নিদর্শন হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। এই দাসত্ব থেকে বের হয়ে আসার জন্য শিক্ষার গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি ভগিনীদের জাগাতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন- 'পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডী কেরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী ব্যারিস্টার, লেডী জজ সবই হইব!' তিনি নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আরও উলেল্গখ করেছেন- 'আমরা কেন উপার্জ্জন করিব না? আমাদের কি হাত নেই, না পা নেই, না বুদ্ধি নেই? কি নেই? যে পরিশ্রম আমরা স্বামীর গৃহকাজে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা আমরা কি স্বাধীন ব্যবসা করতে পারব না? এই যে নারীর জাগরণ ও ক্ষমতায়নে বেগম রোকেয়ার সুদূরপ্রসারী ভাবনা, বর্তমানে তার অতিক্রমণ ঘটেছে।'
নারীর ক্ষমতায়নে ক্রমে ক্রমে বিশ্বের রোল মডেল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি আজ সারাবিশ্বে স্বীকৃত। ঘরে-বাইরে, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। এখন দূর গ্রামাঞ্চলেও নারীদের আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় বলে মনে করে না। কর্মক্ষেত্রে নারীরা নিজের দক্ষতা প্রমাণ করছেন, কৃতিত্ব দেখাচ্ছেন। নারীরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি খেলাধুলা থেকে শুরু করে বিমানচালনা, পর্বত শিখরে আরোহণ করছেন। অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও। বেগম রোকেয়া নিঃসন্দেহে আমাদের এই জাগরণের অন্যতম প্রেরণা।
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

বিষয় : বেগম রোকেয়া :নারী জাগরণের নিত্য প্রেরণা

মন্তব্য করুন