স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রথম ধাপে বৃহস্পতিবার দেশের সাতটি পৌরসভা, চারটি জেলা পরিষদ, ১০টি উপজেলা পরিষদ ও ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতার যে চিত্র শুক্রবার সমকালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। নির্বাচনকেন্দ্র্রিক সহিংসতায় একজনের প্রাণহানি ঘটেছে। সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন কয়েকজন। আমরা আশা করব, এর আইনানুগ প্রতিকার নিশ্চিত হবে। আমরা জানি, একটি আদর্শ নির্বাচনের অন্যতম শর্ত হচ্ছে ভোটারের উপস্থিতি ও স্বতঃস্ম্ফূর্ত ভোটদান। কিন্তু ওই নির্বাচনে ভোটারের 'খরা' লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গণ্ডগোলের ঝুঁকি একটু বেশি থাকে, তা আমাদের অভিজ্ঞতায় রয়েছে।

জনসমর্থনের পাশাপাশি অনেক সময় অর্থ ও পেশিশক্তি ব্যবহার হয়ে থাকে। এখন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচন হচ্ছে দলীয় ভিত্তিতে। সামনে স্থানীয় সরকার কাঠামোর আরও কয়েকটি স্তরে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে তা অস্বীকারের উপায় নেই। এই নির্বাচন যদি একযোগে অনুষ্ঠিত হতো তাহলে সংঘাত-সহিংসতা কোন পর্যায়ে পৌঁছত বিদ্যমান বাস্তবতায় এ প্রশ্নও থেকে যায়। কিন্তু ধাপে ধাপে নির্বাচন দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি কেন সামাল দেওয়া যায় না, এর কারণগুলো অনেকেরই অজানা নয়। স্থানীয় পর্যায়ের গোষ্ঠী কিংবা দলভিত্তিক হিংসা-বিদ্বেষের প্রভাব এ ক্ষেত্রে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অপর্যাপ্ততার পাশাপাশি প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিও কাজ করে।

নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত, সুষ্ঠু করার দায় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন কমিশন নিয়ে আস্থার সংকটের ব্যাপারেও ইতোমধ্যে কথাবার্তা কম হয়নি। ভোটকেন্দ্রে ভোটারের কম উপস্থিতিও এক ধরনের আস্থার সংকটেরই প্রতিফলন। নির্বাচনে প্রার্থীর হারজিত কেন্দ্র করেই সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটে। কাজেই নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণসহ প্রার্থীদের নির্বাচন আচরণবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কঠোরতার বিকল্প নেই। নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য কমিশন যে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে এবং সরকার কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী সহযোগিতা দিতে বাধ্য। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এই ক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে কিনা- প্রশ্ন আছে এ নিয়ে। আমরা আশা করব, নির্বাচন কমিশন এ সংক্রান্ত উত্থাপিত সব প্রশ্নের উত্তর তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দিতেই সক্ষম হবে।

সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের কোনোরকম উদাসীনতা কিংবা গাফিলতির কারণে নির্বাচনের স্বাভাবিক চরিত্র নষ্ট হবে তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। সামনের দিনগুলোতে যে কোনো নির্বাচন জনজীবনে যাতে অস্বস্তিকর উপলক্ষ হিসেবে দেখা না দেয় তা কমিশনকেই নিশ্চিত করতে হবে। তাই নির্বাচন কমিশনের নির্মোহ অবস্থানের পাশাপাশি ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে এর যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নমুক্ত ও উৎসবমুখর করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। পরবর্তী ধাপে স্থানীয় সরকার কাঠামোর যে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এজন্য নির্বাচন কমিশনকে এখনই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। যেহেতু স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে এখন দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হচ্ছে সেহেতু সংঘাত-সহিংসতার পথ ছেড়ে আনন্দমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রত্যেক প্রার্থীর দায়ও কম নয়।

আমরা দেখতে চাইব, স্থানীয় সরকারের পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে নির্বাচন কমিশন ভাবমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে হলেও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে কমিশনের চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে হারজিত থাকতে পারে, এমনকি নির্বাচনী কৌশলের ক্ষেত্রেও পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ অবাধ ও সুষ্ঠু রয়েছে কিনা আমরা সেটিই দেখতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, সরকারের শীর্ষ মহলও তা-ই চায়। মনে রাখা জরুরি নির্বাচন যদি অর্থবহ না হয় তাহলে আমাদের সব গণতান্ত্রিক অর্জনই হুমকির মুখে পড়বে। এমনটি শুভবোধসম্পন্ন কারোরই কাম্য হতে পারে না।