বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও বাংলাদেশের কৃষক খেতমজুর সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড আজিজুর রহমান হৃদরোগ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১০ ডিসেম্বর ৭৬ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। আজীবন বিপল্গবী কমরেড আজিজুর রহমান ১৯৪৪ সালে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় জুগিভরাট প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। তৎকালীন মাগুরা মহকুমার মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষাতেও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিলাভ করেন তিনি। এরপর খুলনার দৌলতপুরে হাজী মোহাম্মদ মহসীন বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে খুলনা বি এল কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে এইচএসসি পাস করে খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। বি এল কলেজে অধ্যয়নকালে কমরেড আজিজ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কে (বর্তমান শহীদ হাদিস পার্ক) সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) খুলনা জেলা সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ওই বছর তিনি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।
১৯৬৭-৬৮ সালে ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। খুলনার বয়রা জংশন এলাকার কড়াই কারখানার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও ৮ ঘণ্টা শ্রম সময়ের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৭ দিন টানা ধর্মঘটের ফলে মালিক পক্ষ দাবি মেনে নেয়। কড়াই কারখানার আন্দোলনের কারণে ১৯৬৯ সালের ২৫ জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় এক মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (ইপিসিপি) কমরেড মণি সিংহ ও খোকা রায়ের নেতৃত্বাধীন অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সংশোধনবাদী লাইন গ্রহণ করলে ইপিসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হয় এবং কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার ও কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহার নেতৃত্বাধীন বিপল্গবী অংশ পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) গঠন করে। কমরেড আজিজুর রহমান এই বিপল্গবী ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। ওই বছরই তিনি দলের খুলনা জেলা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি ১৯৬৯ সালে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন ও ভূমিহীনদের খাসজমি প্রদানের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কারাগারে বন্দি কমরেড আজিজ ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়েও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি বহুধাবিভক্ত এমএল ধারার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি গভীরভাবে মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদসহ রুশ, চীন, ভিয়েতনাম ও কিউবা বিপল্গবের ওপর প্রগাঢ় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। মার্ক্সবাদকে একটি আপ্তবাক্য হিসেবে গ্রহণ না করে বরং প্রয়োগের মধ্য দিয়ে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির সার্বিকতা উপলব্ধি করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সর্বহারা শ্রেণির মতাদর্শের আলোকে রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন পরিচালনা করেছেন। তিনি প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আব্দুল হকের ভাগ্নি সুরাইয়া ইয়াসমিনের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে অনিন্দ্য আরিফসহ পরিবারের সবাই কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কমিউনিস্ট রাজনীতিতে তিনি ডান ও বাম সুবিধাবাদী ধারার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম করেছেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, তা সহসা পূরণ হওয়ার নয়। প্রিয় কমরেডের মৃত্যু শোককে শক্তিতে পরিণত করে শ্রমিক কৃষক মেহনতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মৈত্রীর ভিত্তিতে বিপল্গবী গণআন্দোলনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সরকার ও সংবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই কেবল আমরা তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে পারব।

সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, কেন্দ্রীয় কমিটি
sattarabdus47@gmail.com

বিষয় : আজীবন বিপল্গবী আজিজুর রহমান

মন্তব্য করুন