একটি শহরকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকাও এর বাইরে নয়। ঢাকা শহরের জন্য প্রথম ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ২০১০ সালে সেটি প্রথম গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। একই সালে এ বিষয়ে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত সবাই এটিকে স্বাগত জানান এবং বিলম্বে হলেও এর পক্ষেই কথা বলেন। ওই সভায় আমারও উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেদিন আমি বলেছিলাম, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালে অথচ ড্যাপ গেজেট হলো ২০১০ সালে। এটা সত্তর বা আশির দশকে কেন হলো না? যদি তা হতো তাহলে নিশ্চয়ই আজকের ঢাকা শহরকে আমাদের দেখতে হতো না। ২০০৬ সালে আমি যখন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ছিলাম তখন প্রস্তাব রেখেছিলাম, গোটা বাংলাদেশের জন্য ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে যেরকম অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র বাড়িঘর, কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ ইত্যাদি গড়ে উঠছে তাতে আবাদযোগ্য বা কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে, যা কৃষিপ্রধান এ দেশে কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্য ভাতের জোগান দিতে যে পরিমাণ চালের প্রয়োজন, সেই পরিমাণ ধান উৎপাদন করতে হলে কী পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করতে হবে- তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। তারপর যে জমি থাকবে তার কত অংশ শিল্প-কারখানা, কত অংশ রাস্তা, হাসপাতাল বা স্কুল-কলেজ ইত্যাদি স্থাপনে ব্যবহার করা হবে- সেটিও ঠিক করতে হবে। এরপর যে পরিমাণ জমি থাকবে তার ওপরে আবাসিক ভবন নির্মাণ করতে হবে। সেই আবাসিক ভবন চারতলা হবে নাকি চল্লিশ তলা হবে, সেটিও হিসাব-নিকাশ করে ঠিক করতে হবে। অথচ প্রস্তাবিত ড্যাপে বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া ঢাকা শহরে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রস্তাব করা হয়েছে ৮ তলা। বলা হচ্ছে, ঢাকা শহরে যে হারে মানুষ বাড়ছে তার রাশ টেনে না ধরতে পারলে ঢাকা শহরকে বাঁচানো যাবে না। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এখনও কি ঢাকা শহর বসবাসের যোগ্য আছে? সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পর ঢাকা হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর।
ঢাকা শহর ইতোমধ্যে বসবাসের অযোগ্য একটি নগরীতে পরিণত হয়েছে, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলা যায় ক্লিনিক্যালি ডেড সিটি। মুমূর্ষু ব্যক্তিকে যেমন লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়, তেমনি ২০০৮ সালে প্রণীত মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালার মাধ্যমে আমরা ঢাকা শহরকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টাটুকু করছি মাত্র। যারা বলছেন বা বলার চেষ্টা করছেন, এই বিধিমালাই নাকি ঢাকা শহরের বসবাসযোগ্যতা হারানোর অন্যতম কারণ; তাদের কাছে বিনীতভাবে আমার কয়েকটি প্রশ্ন- ১. একটি শহরের বাসযোগ্যতার মাপকাঠি কী? ২. ২০০৮ সালের বিধিমালা, যেটি প্রথম গেজেট হয়েছিল ২০০৬ সালে, তার আগে ঢাকা শহর কতটুকু বাসযোগ্য ছিল? ৩. ২০০৬ সালের পর নতুন বিধিমালার অধীনে ঢাকা শহরে বিদ্যমান কত শতাংশ ভবন তৈরি হয়েছে? ৪. ২০০৬ সালের আগে ঢাকা শহরের কত শতাংশ ভবন নির্মিত হয়েছে? এর মধ্যে কত শতাংশ ভবন রাজউকের বিধিমালা মেনে নির্মাণ করা হয়েছে? ৫. একটি আধুনিক বসবাসযোগ্য শহরে কত শতাংশ রাস্তা থাকা দরকার, আর ঢাকা শহরে কত শতাংশ রাস্তা আছে? ৬. একটি শহরের বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কত শতাংশ থাকলে সেই শহরকে বাসযোগ্য বলা যায়? আর ঢাকা শহরের বাতাসে কত শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড বিদ্যমান? ৭. যেখানে ২০০৮ সালের বিধিমালায় নূ্যনতম ১৬.২৫ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ নরম মাটি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, সেখানে ২০০৬ সালের আগে নির্মিত ভবনগুলো কত শতাংশ জায়গা ছেড়ে নির্মিত হয়েছে? ৮. ঢাকার বাইরে একমাত্র চট্টগ্রাম ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো শহরেই তো ২০০৮ সালের বিধিমালা কার্যকর করা হয়নি। তার মধ্যে কয়টি শহর বাসযোগ্য আছে? ৯. ঢাকা শহরে যে কয়েকটি খেলার মাঠ আছে তার মধ্যে কয়টি মাঠ নতুন প্রজন্মের খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত আছে? ১০. একটি বসবাসযোগ্য শহরে সাধারণ জনগণের বিনোদনের জন্য যে পরিমাণ উন্মুক্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন ঢাকা শহরে তা আছে কি?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে- জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে বা জনসংখ্যা কমানোর উদ্দেশ্যে ঢাকা শহরে ৮ তলার বেশি ভবনের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, আগামীকাল থেকে ঢাকা শহরে আর কোনো ভবনের প্ল্যান অনুমোদন করা হবে না বা ২০০৮ সালের বিধিমালার আওতায় যেসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে তা ভেঙে ফেলা হবে, তাহলে কি ঢাকা শহরের জনঘনত্ব কমে যাবে?
ড্যাপের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, স্থাপনা নির্মাণে রাস্তার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্থ নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ ঢাকা শহরের সরু অলিগলিগুলো প্রশস্ত করার দরকার নেই। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বসবাসযোগ্য শহরে যেখানে নূ্যনতম ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকার কথা সেখানে ঢাকা শহরে আছে মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ। ১৯৮৪ ও ১৯৯৬ সালের বিধিমালায় প্ল্যান অনুমোদনের সময় মুচলেকা নিয়েও রাজউক যেখানে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে কাউকে বাধ্য করতে পারেনি, সেখানে ২০০৮ সালের বিধিমালা অনুযায়ী জনগণ বিনা বাক্যে এবং বিনামূল্যে রাস্তার জন্য জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে!
২০০৬ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্প 'হাউ টু মেক ঢাকা সিটি লিভঅ্যাবুল'-এর ওপর ঢাকা শেরাটন হোটেলে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সঞ্চালনায় একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ঢাকা শহরকে কখনোই বাসযোগ্য করা যাবে না, যতক্ষণ না সারাদেশকে বাসযোগ্য করা সম্ভব হবে। ড্যাপ শুধু ঢাকা শহরের জন্য নয়, আসুন আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের জন্য ড্যাপ প্রণয়ন করার মাধ্যমে গোটা দেশকে বসবাসযোগ্য করে গড়ে তুলি। আর যদি আমরা ঢাকা শহরের জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে চাই তাহলে ভবনের তলা বেঁধে দেওয়ার পরিবর্তে আসুন এমন কিছু করি, যাতে সাধারণ মানুষকে কষ্ট করে এই শহরে বাস করতে না হয়।
প্রকৌশলী; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্স লি.;সাবেক সভাপতি, রিহ্যাব