আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ নরেন্দ্র মোদির মধ্যে গত বৃহস্পতিবার যে 'ভার্চুয়াল বৈঠক' অনুষ্ঠিত হলো, বহুল আলোচিত তিস্তা ইস্যুর দিক থেকে দেখলে এর 'একচুয়াল' তাৎপর্য কী? সন্দেহ নেই, নদীবিষয়ক অনেক আলাপই হয়েছে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে। বৈঠকের পর যথারীতি যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়েছে, তার ৩৯টি অনুচ্ছেদের মধ্যে অন্তত ৬টি সরাসরি নদী নিয়ে। বাণিজ্য থেকে সংস্কৃতি- দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান ও সম্ভাবনাময় প্রায় অসংখ্য ইস্যুর মধ্যে সংখ্যাগত এই 'গুরুত্ব' নেহাত কম নয়। দুই দেশের মধ্যে নদী-সম্পর্ক কার্যকর ও বহুমাত্রিক করে তোলার যে দাবি নদী নিয়ে সক্রিয় নাগরিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন সময়েই তুলে থাকি, যৌথ বিবৃতিটি সেদিক থেকে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
যেমন ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে ইছামতি, কালিন্দী, রায়মঙ্গল এবং হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর তীরে মেইন পিলার ১ থেকে সীমান্তের শেষ সীমা পর্যন্ত নতুন স্ট্রিপ মানচিত্রের সেট প্রস্তুত করতে এবং স্থলসীমানা চূড়ান্তকরণে উভয় পক্ষেই যৌথ সীমান্ত সম্মেলনের প্রথম বৈঠক করতে সম্মত হয়েছে। কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী আন্তর্জাতিক সীমানাটিকে একটি নির্দিষ্ট সীমানায় রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।' কুশিয়ারার কথা বাদ দিলে, এখানে অপর যে চারটি নদীর কথা বলা হয়েছে, তা দুই দেশের স্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদী হলেও এ নিয়ে আলোচনা বিরল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার মতো 'বড়' সব নদী নিয়ে আলোচনার ভিড়ে এসব 'ছোট' নদী পাদপ্রদীপের আলোয় আসার সুযোগ বেশি পায় না। কিন্তু আন্তঃসীমান্ত নদী যত সংকীর্ণই হোক, ভূ-রাজনীতিতে তার প্রভাব কত প্রসারিত; হাড়িয়াভাঙ্গার মূল স্রোতের বিবেচনায় বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্র সীমারেখা নির্ধারণের সময় টের পাওয়া গিয়েছিল।
যৌথ বিবৃতির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- 'বাংলাদেশ তার রাজশাহী জেলার নিকটবর্তী পদ্মা নদীর তীরে নদীপথে ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার ইনোসেন্ট প্যাসেজের অনুরোধটি পুর্নব্যক্ত করেছে। ভারতীয় পক্ষ অনুরোধটি বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে।' এই 'ইনোসেন্ট প্যাসেজ' বা অক্ষতিকর যাতায়াত কী? রাজশাহী অঞ্চলে গঙ্গা বা পদ্মা যে এলাকা দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, সেখানকার মানচিত্রে বিষয়টি স্পষ্ট। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বিদ্যুৎ আন্দোলন দিয়ে বহুল পরিচিত কানসাট থেকে রাজশাহীর বাঘা পর্যন্ত নদীটি সীমান্তরেখা বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। প্রমত্ত পদ্মা বা গঙ্গার একাধিক চ্যানেল কখনও ভারত, কখনও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। ওই গোটা এলাকায় যদি সীমান্তরেখা মেনে নৌ চলাচল করতে হয়, তাহলে কয়েক কিলোমিটার পরপর দুই দেশের সীমান্ত প্রটোকল মানতে হবে। মানে, কার্যত সেখানে নৌ চলাচল অসম্ভব। অথচ দুই প্রতিবেশী যদি মেনে নেয় যে, ওই কয়েক কিলোমিটার নদীপথে নির্বিঘ্ন নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে উভয় দেশই পরস্পরকে ছাড় দেবে, তাহলে স্থানীয় পরিবহন ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব। ফলে বাংলাদেশের এই দাবি সঙ্গত এবং তা পূরণে ভারতীয় পক্ষের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।
যৌথ বিবৃতির ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদটি নিয়ে এই নিবন্ধের সীমিত পরিসরে বিশেষ মন্তব্যের অবকাশ নেই। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবু রেকর্ড হিসেবে রেখে দেওয়া যায়- 'দুই নেতা চলমান দ্বিপক্ষীয় সংযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং পিআইডব্লিউটিটির অধীনে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আগরতলায় ভারতীয় পণ্যের পরীক্ষামূলক পরিবহন, সোনামুড়া-দাউদকান্দি প্রটোকল রুট চালু এবং অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন ও বাণিজ্য (পিআইডব্লিউটিটি) প্রটোকলে দ্বিতীয় সংযোজন স্বাক্ষরসহ সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানান। দুই নেতা শিগগিরই চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য পরিবহন চালু করত সম্মত হন।'
একই কথা বলা যেত যৌথ বিবৃতির ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ নিয়েও। কিন্তু মাঝে রয়েছে একটি 'যদি'। ধারাটিতে বলা হয়েছে- 'বাংলাদেশ পক্ষ কুশিয়ারা নদীর পানি সেচের জন্য রহিমপুর খালের অবশিষ্ট অংশের খনন কাজ সম্পন্ন করার জন্য ভারতীয় পক্ষকে সংশ্নিষ্ট সীমান্ত কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার জন্য অনুরোধ করেছে। কুশিয়ারা নদী থেকে দুই দেশের পানি প্রত্যাহার পর্যবেক্ষণের জন্য উভয় দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি সম্পর্কে দ্রুত সমঝোতার জন্য ভারতীয় পক্ষকেও অনুরোধ করা হয়েছিল। দুই নেতা যৌথ নদী কমিশনের ইতিবাচক অবদানের কথা স্মরণ করেন এবং সচিব পর্যায়ের জেআরসি পরবর্তী বৈঠকের অপেক্ষা ব্যক্ত করেন।'
এখন যদির কথাটা বলি। মনে রাখতে হবে, কুশিয়ারা হলো বরাক নদী ব্যবস্থার বাংলাদেশি অংশের প্রধান ধারা। বরাক নদী সিলেট অঞ্চলের অমলসীদের নো-ম্যানসল্যান্ডে এসে দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ভূপ্রাকৃতিক অবস্থানগত কারণেই এর বেশিরভাগ প্রবাহ কুশিয়ারায় প্রবাহিত হয়। সুরমা নদীতে আমরা যে প্রবাহ দেখে থাকি, তার বেশিরভাগই আসলে ডান তীরে এসে মিলিত হওয়া লুভা, যাদুকাটা, পিয়াইন, ধলাই, চলতি প্রভৃতি উপনদীর প্রবাহ। এখন ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে কুশিয়ারা থেকে 'দুই দেশের পানি প্রত্যাহার' সম্পর্কিত 'প্রস্তাবিত সমঝোতা' আসলে কী? এ ধরনের সমঝোতায় যাওয়ার আগে অতি অবশ্যই কুশিয়ারা এবং তার ওপর নির্ভরশীল সিলেট অঞ্চলের প্রতিবেশ ব্যবস্থার পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। এজন্য কেবল দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে নয়, জনপরিসরেও যথেষ্ট আলোচনা হতে হবে। আর কূটনৈতিক দিক থেকে দেখলে, বহু বৈঠক ধরে আটকে থাকা তিস্তা ইস্যুর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আরেকটি আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে সমঝোতায় যাওয়া বাংলাদেশের জন্য উচিত হবে না। কারিগরি দিক থেকে যতটা না, রাজনৈতিক দিক থেকে ততটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিস্তা ঝুলে থাকতেই গত বছর ফেনী নিয়ে সমঝোতা দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতাসীন দলের জন্য যথেষ্ট সমালোচনামূলক হয়েছিল। ভুলে যাওয়া চলবে না।

যৌথ বিবৃতির ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ যদি দেখি, সেখানে গত এক দশক ধরে অনুষ্ঠিত অন্যান্য শীর্ষ বৈঠকের মতোই- 'দুই নেতা মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমার- ছয়টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির কাঠামোটি দ্রুত সমাপ্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছিলেন।' কুশিয়ারা নিয়ে শেষোক্ত কথাগুলো এ ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশের অধিকার, অববাহিকার প্রতিবেশগত সুরক্ষা প্রভৃতি বিষয় তো রয়েছেই; কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিবেচনাতেও তিস্তার সুরাহা না করে অন্য কোনো নদী নিয়ে সমঝোতায় যাওয়ার আগে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
প্রসঙ্গক্রমে বলি, যৌথ বিবৃতিটি পড়তে পড়তে একজন নদীকর্মী হিসেবে আরও দুটি ইস্যুর অনুপস্থিতি চোখে পড়েছে। প্রথমত, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা। ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ ২০২৫ সালে শেষ হয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের পানি-সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নদী নিয়ে সমঝোতাটি নবায়ন এবং সম্ভব হলে মেয়াদহীন চুক্তি করার বিকল্প নেই। আর সেক্ষেত্রে আলোচনা শুরু করতে হবে এখন থেকেই। বস্তুত অতীতে নদীবিষয়ক আলোচনার শম্বুকগতি বিবেচনা করলে আলোচনা শুরুর সময় ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে।
ডিসেম্বরের গোড়ায় হঠাৎ জনপরিসরে উঠে আসা ব্রহ্মপুত্র নদীতে চীনা ড্যামের ইস্যুটিও দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় উঠে আসতে পারত। কারণ তিব্বতে চীনের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দুই দেশের নদী ব্যবস্থার জন্যই গুরুতর ইস্যু। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত লিখেছি সমকালেই। আগ্রহীরা পড়তে পারেন- 'ব্রহ্মপুত্রে চীনা বাঁধ এবং বাংলাদেশের চেনা বিপদ' (সমকাল, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০)। ভারতের জন্য ওই প্রকল্পের বাড়তি ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। যে কারণে অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রে 'উজানের দেশ' ভারত ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে নিজেকেও 'ভাটির দেশ' হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চায়। কারণ যাই হোক, আলোচ্য যৌথ বিবৃতিতে প্রসঙ্গটি না থাকা বিস্ময়ক বৈকি।
যা হোক, এই নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ শুরু করেছিলাম দুই প্রধানন্ত্রীর 'ভার্চুয়াল' বৈঠকে তিস্তার 'একচুয়াল' তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে। যৌথ বিবৃতির ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রসঙ্গটি স্থান পেয়েছে- 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে উভয় সরকারের সম্মতি অনুসারে তিস্তার পানি বণ্টনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাতে ভারতের সরকারের আন্তরিক প্রতিশ্রুতি এবং অব্যাহত প্রচেষ্টার কথা পুর্নব্যক্ত করেন।'
হতাশাজনক সত্য হচ্ছে, তিস্তা বিষয়ে এতে নতুন কোনো তাৎপর্য নেই। ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতির ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে একই কথা বলা হয়েছিল। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় প্রকাশিত যৌথ বিবৃতির ৪০ নম্বর অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছিল একই কথা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের মাথাতেই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৫ সালের ৭ জুন দুই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের পর যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়েছিল, তার ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে তিস্তার প্রসঙ্গ ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল- 'প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের সম্পৃক্তির মাধ্যমে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টন চুক্তি যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করার উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।' পাঁচ বছর পরও কার্যত তিস্তা পরিস্থিতি ও ভাষ্য একই।
যদিও এই নিবন্ধ যেদিন লিখছি, সেদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী তিস্তার প্রশ্নে আশার বাণী শুনিয়েছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শনে গেলে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন- 'বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, তার মাধ্যমে তিস্তা সমস্যা ও অন্যান্য নদীর পানি বণ্টনের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন অচিরেই হতে পারে। এ নিয়ে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে।' (সমকাল অনলাইন, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০)। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তির এমন বক্তব্য আমাদের আশাবাদী না করে পারে?
লেখক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল

skrokon@gmail.com