প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়া সত্ত্বেও অর্থ উদ্ধারে 'সামান্য' অগ্রগতি কেবল হতাশাজনকই নয়, বিস্ময়করও বটে। বুধবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ফেরত আনা কিংবা বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ করার যে পরিসংখ্যান এসেছে, তা পাচারের বিপুল অর্থের তুলনায় যেন নস্যি, বলাই বাহুল্য। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্যমতে, কর ফাঁকি, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ পাচার, কোম্পানির মুনাফা লুকানো ও আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে বছরে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অর্থ পাচারে শীর্ষ ৩০ দেশের মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। এটা ঠিক যে, পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগ বসে নেই। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাচার হয়েছে, তা চিহ্নিত করতে পারলে ওইসব দেশে যোগাযোগ করে আইনগতভাবে এখন অর্থ ফেরত আনা গেলেও এটি বেশ জটিল প্রক্রিয়া। আদালতে মামলা নিষ্পত্তির পর আপিল শেষ করে তা চূড়ান্ত করতে অনেক সময়ও চলে যায়। তবে আমরা মনে করি, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের চেয়েও বড় বিষয় হলো, অর্থ পাচার বন্ধ করা। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিষেধক সবসময়ই উত্তম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের সক্রিয়তায় যেমন অর্থ পাচার বন্ধ হতে পারে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ ফেরত আনায়ও উদ্যোগী হতে পারে। পাচারের সঙ্গে জড়িত অনেকে প্রভাবশালী হওয়ায় এবং অনেকে ক্ষমতা কাঠামোয় থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অর্থ পাচার যে কেবল এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে আমরা জেনেছি। কানাডায় অর্থ পাচার নিয়ে তিনি বলেছেন, 'আমার ধারণা ছিল রাজনীতিবিদদের সংখ্যা বেশি হবে, কিন্তু আমার কাছে যে তথ্য এসেছে, যদিও এটি সামগ্রিক তথ্য নয়, সেটিতে আমি অবাক হয়েছি। সংখ্যার দিক থেকে আমাদের অনেক সরকারি কর্মচারীর বাড়িঘর সেখানে বেশি আছে এবং তাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে।' কানাডার বেগমপাড়া নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, কোটি কোটি টাকা পাচার করে অনেক বাংলাদেশি বেগমপাড়ায় স্থায়ী হয়েছেন। সেখানে বসতি গড়েছেন ৩৬শ' কোটি টাকা পাচার করে পলাতক আলোচিত পি কে হালদারও। কেবল কানাডাই নয়, বাংলাদেশের অর্থ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে যেমন পাচার হয়, তেমনি সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাবও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমরা জানি, যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা দেশে বিনিয়োগ করলে মানুষ যেমন উপকৃত হতো তেমনি দেশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হতো। আমরা চাই প্রশাসন সর্বাগ্রে পাচার রোধে মনোযোগ দিক। এ জন্য পাচার হওয়া দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দেশের মোট পাচার হওয়া অর্থের অধিকাংশই যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে হয় বলে এখানে কঠোর নজরদারির বিকল্প নেই। অর্থ পাচার রোধের ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি। দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে আমাদের মানি লন্ডারিং আইন রয়েছে।

আইনটির বাস্তবায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যেমন প্রত্যাশিত নয়, তেমনি অর্থ পাচার রোধে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের মধ্যকার সমন্বয়ও প্রয়োজন। অর্থ পাচার রোধ ও পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য সাহসী, উদ্যমী, দক্ষ জনবলের ঘাটতি পূরণে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাই। সম্পদশালীরা যেন নিরাপদে দেশে টাকা রাখতে পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। একই সঙ্গে, দেশে অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবার মাঝে দেশপ্রেম বোধও জাগ্রত করতে হবে। আমরা মনে করি, অর্থ পাচারের ক্ষেত্রগুলো সংশ্নিষ্টদের অজানা নয়। তাই সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাচারের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে যেসব অর্থ ইতোমধ্যে পাচার হয়ে গেছে, সেগুলো উদ্ধারেও দৃষ্টি দিতে হবে।