'জাগো - জাগো - জাগো রে, মাছ ধরতে চলোরে'- এরকম সমস্বরে ধ্বনি তুলে মাছ শিকার করা চলনবিলের অপেশাদার ও শৌখিন মাছ শিকারিদের একসময় রেওয়াজ ছিল। মূলত চলনবিলের দেশীয় মাছের প্রাচুর্যের কারণেই বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ শিকার করতে আসা লোকজন জমিয়ে তুলত মাছ শিকারের ক্ষেত্রগুলো। মাছ শিকারের এ উৎসবই স্থানীয়ভাবে চলনবিলের লোকজনের কাছে পলো বা বাউত উৎসব নামে পরিচিত। সুদূর অতীতে চলনবিলে বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পরেই বিশেষ করে অগ্রহায়ণ- পৌষ মাসে বা শীতের কোনো এক সকালে বিভিন্ন জলাশয়ে দলবদ্ধ হয়ে গ্রাম বা এলাকাবাসী ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাছ শিকার করতে যেতেন। মূলত একটি জলাশয়ে যখন গ্রামের কিংবা এলাকার শত শত লোকজন একই সঙ্গে একই স্থানে মাছ শিকারে নেমে পড়েন, তখন জলাশয়ের জল ঘোলা হয়ে যেত। আর এতে করে ওই জলাশয়ে থাকা মাছগুলো জেগে উঠত। আর তখনই মাছ শিকারিরা মনের আনন্দে মাছ শিকার করে খালই বা পাতিলে ভরে বাড়িতে ফিরতেন। এই ছিল বাউত বা পলো উৎসবের আনন্দ।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিল চলনবিল। নিকট অতীতেও এ বিলের আয়তন ছিল প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। চলনবিলের দেশীয় মাছের প্রাচুর্যের কারণে নামডাক যেমন চলনবিলের কৈ, বোয়াল, শোল, গুজা, চিতল, রুই, কাতলাসহ অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছ। কিন্তু চলনবিলে অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদীর নাব্য হারানো, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, স্লুইসগেট চালু করাসহ নানা কারণে এ বিলের আয়তন ক্রমেই কমে আসছে; যা গ্রীষ্ফ্মকালে আরও ছোট হয়ে ২০-২৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। তারপরও এ বছর দীর্ঘস্থায়ী ও মাঝারি বন্যার কারণে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাশয়গুলোতে স্বল্প পরিসরে এ সময়টাতে বাউত বা পলো উৎসব হচ্ছে, যা চলনবিলের একটি অন্যতম ঐতিহ্য।

কালেভদ্রে যখন চলনবিলের কোথাও পলো উৎসবে মাছ শিকার হয়, তখন দুই-একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। পলো উৎসবের জৌলুস আর আগের মতো নেই বললেই চলে। অথচ যা আজ থেকে চার-পাঁচ দশক আগে জৌলসপূর্ণ ছিল, তা এখন অতীত। চলনবিলে পলো উৎসব নিয়ে কথা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদ বিভাগের ডিন ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'মাছ পাওয়া যাক আর না যাক বাউত বা পলো উৎসব চলনবিলের একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। তবে বাউত উৎসব বর্তমান সময়ে আগের মতো সংখ্যায় বেশি না হলেও, তবুও তা চলনবিলের অতীত-ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। আর মধ্য চলনবিলে শীত মৌসুমে পানি তেমনটি না থাকলেও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর ও নাটোরের সিংড়া এলাকায় এখনও পলো উৎসব চোখে পড়ে। তবে চলনবিলের বাউত উৎসব এখনও অতীত মনে করিয়ে দেয়। প্রজন্ম যেন ফের শুনতে পায় সেই ধ্বনি- 'জাগো - জাগো - জাগো রে, মাছ ধরতে চলোরে।'

সমকালের তাড়াশ প্রতিনিধি