দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। দেশে অনেক রাজনৈতিক দল থাকলেও কারও তেমন সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। বিএনপি নেতৃত্বহীন এবং একেবারেই কোণঠাসা। সরকার বিএনপিকে চাপে রাখার নীতি নিয়েছে। সরকারকে চাপে রাখার কোনো কৌশল বিএনপি নিতে পারছে না। দেশে 'একদলীয় শাসন' চলছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে যেভাবেই হোক দেশে বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। এই স্বাভাবিক অবস্থা কতদিন থাকবে, কারও কারও মনে সে প্রশ্ন আছে। হঠাৎ কিছু ঘটে কিনা তা নিয়েও বাজারি জল্পনা-কল্পনাও আছে। বিএনপি অবশ্য মাঝেমধ্যে গণঅভ্যুত্থান জাতীয় কিছুর 'স্বপ্ন' দেখে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা তেমন কোনো আশঙ্কা কিংবা সম্ভাবনা দেখছেন না। শেখ হাসিনার সরকার অজনপ্রিয়, জনবিচ্ছিন্ন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই- এসব গৎবাঁধা কথা বছরের পর বছর ধরে বিএনপি বলে আসছে।

দেশে যে গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ-পরিস্থিতি নেই, সেটি বোঝার মতো রাজনৈতিক পরিপকস্ফতা ও বিবেচনাবোধ বিএনপির নেই। স্বেচ্ছাচারী, ক্ষমতা দখলকারী, অনির্বাচিত স্বৈর-সরকারের বিরুদ্ধে ছাড়া সাধারণত গণঅভ্যুত্থান ঘটে না। নির্বাচিত সরকার জনপ্রিয়তা হারালে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-আন্দোলন হয়, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান কখনোই নয়। বিএনপি নেতারা যে গণঅভ্যুত্থানের কথা বলেন, সেটি হয় না বুঝে অথবা শুধু বলার জন্য। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে বলেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও গণঅভ্যুত্থান হবে- এমন ঢালাও ভাবনা রাজনীতির  বাস্তব জ্ঞান যাদের নেই, তারাই ভাবতে পারেন।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শক্তি ও গণভিত্তি সম্পর্কে বিএনপির এত বছরেও সঠিক ধারণা হয়নি। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে মানুষের মধ্য থেকে, মানুষের প্রয়োজনে। আর বিএনপির জন্ম হয়েছে ক্ষমতায় থেকে, ক্ষমতার জন্য। তাই বিএনপির সমর্থক আছে, সক্ষমতা নেই। গর্জন আছে, বর্ষণ নেই। বিএনপি যা বলে তা করতে পারে না। আওয়ামী লীগ যা বলে তা করতেও পারে এবং করে। বিএনপি ক্ষমতায় থেকেও যেমন উজ্জ্বল সাফল্য দেখাতে পারে না, তেমনি বিরোধী দলে থেকেও কিছু অর্জন করতে পারে না। আওয়ামী লীগ সরকারেও সফল, বিরোধী দলে থাকলে আন্দোলনেও সফল।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি আন্দোলনের কথা বলে, অথচ তারা আওয়ামী লীগের শক্তি-দুর্বলতার দিকগুলো নিয়ে কখনও গভীরভাবে ভেবেছে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল। এই দলকে একক জনপ্রিয় দল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের ত্রুটি-দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা সবই আছে। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগকে বিএনপির সঙ্গে এক পাল্লায় মাপা যাবে না। আওয়ামী লীগ এখন আর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নেই- এটা বলে এই ঐতিহ্যবাহী দলটিকে জিয়া-খালেদা-তারেকের বিএনপির সঙ্গে তুলনা করা যথাযথ রাজনৈতিক বিবেচনাবোধের পরিচয় বহন করে না।

কেউ কেউ চলতি রাজনীতির সমালোচনা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে একই ভাষায় আক্রমণ করে পুলক অনুভব করেন। এটা ঠিক নয়।

দুই.

আইন মেনে চলা কি ঠিক, না ভুল? সকলে এক বাক্যে বলবেন, ঠিক। কিন্তু আইনের থাবা যদি রাস্তার আশপাশে ঝুপড়ি বানিয়ে যারা মাথা গুঁজে বসবাস করেন, তাদের উচ্ছেদ করে, তখন? মিথ্যে বলা খারাপ। কিন্তু বন্ধুকে বিপদ থেকে বাঁচাতে হলে? মরণাপন্ন রোগীকে সান্ত্বনা দিতে হলে?

এমন নানা প্রশ্ন বা চিন্তা রোজ আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ঠিক-ভুল, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের বিচার করতে হয় নানাভাবে। কখনও ধর্ম বিশ্বাস দিয়ে, কখনও বাবা-মা-শিক্ষক-বিশিষ্টজনের শেখানো কথা থেকে, কখনও নিজের বুদ্ধি দিয়ে আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। এই উত্তর খুঁজতে খুঁজতে দর্শনের একটি শাখা গড়ে উঠেছে। তার নাম 'এথিকস' বা নীতিবিদ্যা। যখন থেকে ঠিক করতে হয়েছে মানুষকে কী কী আইন মেনে চলতে হবে, না মানলে পেতে হবে কী কী শাস্তি, তখন থেকেই নীতির প্রশ্নে তর্ক জমে উঠেছে।

যেমন ধরা যাক, প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিসের বন্ধু সিফেলাস বলেছেন, মানুষের টাকা-পয়সা থাকা ভালো, তাহলে সে অন্যকে ঠকায় না। যার যা প্রাপ্য, তাকে তা দিতে পারে। সক্রেটিস বলছেন, তাহলে তুমি ন্যায় (জাস্টিস) বলতে বোঝো, যার যা প্রাপ্য তাকে তা দেওয়া? ধরা যাক, তোমার বন্ধু তোমার কাছে কিছু অস্ত্র জমা রেখেছে। তারপর সে পাগল হয়ে গেল। এই অবস্থায় তোমার কাছে অস্ত্র ফেরত চাইলে তুমি কি তাকে ফেরত দেবে? অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ন্যায়ের সঙ্গে যুক্তির প্রশ্নও সামনে আসছে। আর এক সঙ্গী উত্তর দিচ্ছেন, তা কেন? যার যা প্রাপ্য তাকে তাই দেওয়াই হলো ন্যায়। বন্ধুর প্রাপ্য সহায়তা, আর শত্রুর প্রাপ্য শত্রুতা। আবার আরেক সঙ্গী বললেন, ছেঁদো কথা ছাড়ো। আসলে যার হাতে ক্ষমতা, সেই ঠিক করে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় বোধটাও সময় সময় বদলে যায়। জীবনের নানা ক্ষেত্রে বারবার এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় প্রতিদিন।

ডাক্তারকে ভাবতে হয়, মরণাপন্ন রোগীকে কি স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকার দেওয়া যেতে পারে? বিজ্ঞানীকে চিন্তা করতে হয়, ক্লোনিং করে নতুন জীবন সৃষ্টি করা কি ঠিক? আইনজীবীকে ভাবতে হয়, আইন মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা রাখলেও সত্যি তার প্রয়োগ করা সমাজের পক্ষে কি ভালো? শিল্পপতি যখন কারখানা গড়ে তুলতে চান, পরিবেশবিদ আপত্তি করেন, তখন সেটি নীতির প্রশ্নই বটে, যার পোশাকি নাম 'ইকোলজিক্যাল এথিকস'। পুলিশ বা সামরিক বাহিনীকে মানবাধিকারের কথা সবসময় মাথায় রাখতে হয়, তাও কিন্তু নীতির কারণেই। অথচ তাদের দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তো ঘটছে প্রতিনিয়তই।

তিন.

তার মানে ভুল-ঠিক, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নিয়ে বিতর্ক সমাজের একটি চলমান প্রক্রিয়া। এর শেষ নেই। এখন একজন যেটাকে ভালো বা যুক্তিপূর্ণ বলে মনে করছেন, অন্য সময় তিনিই যে তার অবস্থান পরিবর্তন করবেন না তা কি জোর দিয়ে বলা যায়? যারা ক্ষমতায় থাকেন, তাদের ন্যায়নীতি বোধের সঙ্গে যারা বিরোধী দলে থাকেন তাদের ন্যায়নীতি বোধের পার্থক্য সহজেই লক্ষ্য করা যায়। এ বিরোধ যেন শেষ হবার নয়, বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে গণতন্ত্র এখনও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। বিরোধী দলে থাকলে যারা সরকারি দমন-পীড়ন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ থাকেন, ক্ষমতায় গিয়ে তারাই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন পরমানন্দে।

স্ববিরোধিতা কোথায় নেই? গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে মুখে যাদের ফেনা তুলতে দেখা যায়, তাদের মধ্যেও দেখা যায় পরমতসহিষুষ্ণতার বড় অভাব। কারও প্রতি কারও কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব সবচেয়ে বেশি।

স্ববিরোধী অবস্থান থেকে আমরা যতদিন বের হতে না পারব, ততদিন কি আমরা প্রকৃত অর্থে ভালো কিছু আশা করতে পারি? রাজনীতিতে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা কি ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তন না আনলে সম্ভব?

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক