মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ রাষ্ট্রের অন্যতম ক্ষত। মানব পাচার বৈশ্বিক সমস্যা হলেও মূলত অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষই এর শিকার বেশি। আমরাও এর বাইরে নই। এ থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার উপায় মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার গতি ও ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। এ ব্যাপারে বিচার প্রক্রিয়া গতিশীল করার পাশাপাশি আইনের ফাঁক গলে যাতে অপরাধীরা পার পেয়ে না যায়, নানা মহল থেকে এই তাগিদ সত্ত্বেও পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটছে না। রোববার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মাত্র। আমরা জানি, মামলা সাজানো থেকে শুরু করে তদন্তে দুর্বলতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমঝোতার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশ, চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে নিষ্পত্তি হওয়া ১৪টি মামলার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শতকরা ৯৮ ভাগ আসামি খালাস পেয়ে গেছে। স্বল্প সংখ্যক মামলা পর্যালোচনায় যে চিত্র উঠে এসেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেও এর আনুপাতিক হারের যে কোনো তারতম্য ঘটবে না তাও সহজেই অনুমেয়। এ ব্যাপারে পুলিশের ভাষ্য, পারিপার্শ্বিক নানা কারণে তদন্ত শেষ করতে বেগ পেতে হয়। স্পর্শকাতর ও একই সঙ্গে গোপন এই দুস্কর্মের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত এবং এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের কোনো দলিল বা নথিপত্র থাকে না। আবার অনেক ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয়ও নেন না। কিন্তু যারা রাষ্ট্রের কাছে প্রতিবিধান চান, তারাও যদি ন্যায়বিচার না পান, তাহলে তো অন্ধকারেরই বিস্তৃতি ঘটবে। আমরা জানি, ভাগ্যান্বেষণে অনেকেই পা দেন পাচারকারীদের ফাঁদে। আর মানব পাচার রোধে আমাদের আন্তর্জাতিক মানের আইন থাকা সত্ত্বেও এর প্রয়োগ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সম্ভব হচ্ছে না। এর জের ধরে মানব পাচারের বলি হয়ে সম্ভাবনাময় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জীবনের নির্মম পরিণতির অনেক বেদনাদায়ক উপাখ্যানও আমাদের সামনে রয়েছে। বিষয়টি বরাবরই দেশে-বিদেশে আলোচিত হয়ে আসছে। দালাল চক্র উন্নত দেশের সুন্দর জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে অবৈধভাবে বিপদসংকুল পথে ঠেলে দিয়ে নিজেদের পকেট স্ম্ফীত করে চলেছে। আমাদের জানা আছে, নিকট অতীতে একজন সংসদ সদস্য কুয়েতে মানব পাচারে জড়িত থাকায় সে দেশে আটক হন এবং আদালতে তার বিচার প্রক্রিয়াধীন। তাতেও প্রমাণিত হয়, মানব পাচারকারীদের শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। যারা বিপুল পরিমাণ টাকা ও জীবন পাচারকারীদের হাতে তুলে দিয়ে অধিকতর সচ্ছল জীবন যাপনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন, তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় পাচারকারী চক্র। 'সোনার হরিণ' ধরতে কত মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন কিংবা বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবনযাপন করছেন- এর হিসাব মেলানো ভার। অথচ পাচারকারীরা ফুলে-ফেঁপে উঠছেই।

রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না। আমরা মনে করি, এই অন্ধকার ঘোচাতে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। রাজনৈতিক অঙ্গীকারও জরুরি। মামলা গঠন, সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত, সাক্ষীর সুরক্ষা ইত্যাদি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথে কেউ যাতে পা না রাখেন, এ জন্য জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়াও সমভাবেই জরুরি। কোনো সভ্য-মানবিক সমাজে এমনটি চলতে পারে না। রাষ্ট্রশক্তিকে এ ব্যাপারে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যে কোনো অপরাধের ন্যায়বিচার নির্ভর করে এর সবগুলো অনুষঙ্গের ওপর। এক্ষেত্রে যে দুর্বলতা রয়েছে মানব পাচারের ১৪টি মামলার পর্যবেক্ষণ ফল এরই সাক্ষ্যবহ। আমরা এও জানি- ভুক্তভোগীরা দুর্বল, পাচারকারীরা সবল। রাষ্ট্রশক্তিকে দুর্বলের পক্ষে, অপকর্মকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নিতেই হবে। স্তূপীকৃত মানব পাচার মামলার দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের পথ যেমন করতে হবে প্রতিবন্ধকতাহীন, তেমনি দৃষ্টি দিতে হবে উৎসেও। বাড়াতে হবে কর্মসংস্থান ও বেকারদের জন্য নতুন কর্ম-উদ্যোগে প্রেষণা দিতে হবে।