জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এবং প্রাণবন্ত স্মৃতিচারণ হচ্ছে। শিশু এবং তরুণ সমাজ এসব আলোচনা থেকে অত্যন্ত অন্তরঙ্গভাবে বঙ্গবন্ধুকে জানতে পারবে। বর্তমান নিবন্ধে আমি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের একটি বিশেষ দিক নিয়ে আলোচনা করব।
১৯৭৩ সালের ২২ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি পরিষদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে 'জুলিও কুরি' শান্তি পদকে অলংকৃত করার ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানের কথা অনেকেরই স্মরণে আছে। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি, জাতীয় স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ সম্মানসূচক জুলিও কুরি শান্তি পদকে অলংকৃত করে। জুলিও কুরি শান্তি পদক বঙ্গবন্ধুকে পরিয়ে দেন বিশ্ব শান্তি পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল রমেশ চন্দ্র। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্ব শান্তি পরিষদের শ্রদ্ধা জানিয়ে রমেশ চন্দ্র বলেছিলেন, 'বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশরই নয়, বঙ্গবন্ধু সমগ্র বিশ্বের। বঙ্গবন্ধু শান্তি, স্বাধীনতা এবং বিশ্ব মানবতার প্রতীক।'
শান্তি আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা, বিভিন্ন শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ, সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শোষণ এবং শাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান থেকে রমেশ চন্দ্রের বক্তব্যের যথার্থতা উপলব্ধি করা যাবে। এই নিবন্ধে আমি সেই সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
শান্তির প্রতি বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুতি আজীবনের এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মতাদর্শের অঙ্গীভূত উপাদান। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ এবং বিশ্ব শান্তি পরিষদের সঙ্গে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাস এখন থেকে ৭০ বছরেরও বেশি। আনুমানিক ২৭-২৮ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সদস্য হন (বর্তমানের বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ) এবং ৩২ বছর বয়সে ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে গণচীনের রাজধানী পিকিং-এ (বর্তমান বেইজিং) অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী সামরিক চুক্তি 'সিয়াটো' (১৯৫৪ সাল) এবং 'সেন্টো'তে (১৯৫৫ সাল) পাকিস্তানের যোগদানের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রতিবাদে তিনি সক্রিয় অংশ নেন। তিনি ১৯৫৬ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিলেন।
বেইজিং সম্মেলন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, "ঢাকা ফিরে এসে পূর্ব পাকিস্তান শান্তি কমিটির সভায় যোগদান করলাম। আতাউর রহমান খান সাহেব সভাপতি। আমরা 'যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই'- এই আমাদের স্লোগান। সেপ্টেম্বর মাসের ১৫-১৬ তারিখে খবর এলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিরা শান্তি সম্মেলনে যোগদান করবেন। আমাদেরও যেতে হবে পিকিং-এ, দাওয়াত এসেছে। সমগ্র পাকিস্তান থেকে তিরিশজন আমন্ত্রিত, পূর্ব বাংলার ভাগে পড়েছে মাত্র পাঁচজন। আতাউর রহমান খান, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, উর্দু লেখক ইবনে হাসান এবং আমি। টিকিট অবশ্য পাওয়া যাবে যাওয়া-আসার জন্য শান্তি সম্মেলনের পক্ষ থেকে। শান্তি সম্মেলন শুরু হলো। তিনশ আটাত্তর জন সদস্য সাঁইত্রিশটি দেশ থেকে যোগদান করেছেন। ...বিভিন্ন দেশের নেতারা বক্তৃতা করতে শুরু করেন। ... পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ... কতগুলি কমিশনে সমস্ত কনফারেন্স ভাগ হয়ে ভিন্ন ভিন্ন রুমে বসা হলো। আমিও একটা কমিশনে সদস্য ছিলাম। আলোচনায় যোগদানও করেছিলাম।" (অসমাপ্ত আত্মজীবনী; পৃ. ২২১, ২২৮, ২২৯)
১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে মস্কোতে যখন বিশ্ব শান্তি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়, তখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ওই ঐতিহাসিক মহাসম্মেলনে (৭০০০ প্রতিনিধি) তিনি বাংলাদেশ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে ৩৩ সদস্যের বিশাল প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন; আমারও সুযোগ হয়েছিল ওই প্রতিনিধি দলের সদস্য হওয়ার। বিশ্ব শান্তি কংগ্রেসের সাফল্য কামনা করে বঙ্গবন্ধু বার্তা পাঠান- 'বিশ্ব শান্তি কংগ্রেসের সংবাদে আমি খুবই আনন্দিত। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত জনগণকে এই মহাসম্মেলন অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিপীড়িত মানুষকে নিজেদের শোষণ থেকে মুক্ত করতে হবে।'
বঙ্গবন্ধু বলতেন, 'আমি সমগ্র বিশ্বে শান্তি সুপ্রতিষ্ঠিত দেখতে চাই। আমি চাই বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহ অস্ত্র প্রতিযোগিতায় যে অর্থ ব্যয় করে, তা বিশ্বের দরিদ্র মানুষের উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হোক।' বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ... বিশ্বের জনমতকে ধ্বংস করার শক্তি কারো থাকে না। তাই বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমরা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি।...
বঙ্গবন্ধু স্বাধীন জাতীয় বিকাশ ও দারিদ্র্য বিমোচন, জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নিরস্ত্রীকরণের জন্য সংগ্রামকে অভিন্ন সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করতেন। ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু তার এই দর্শন বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করে, রাষ্ট্রগুলোর সর্বোচ্চ এই ফোরামে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু স্বভাবজাত বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, 'শান্তি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং তা সমগ্র বিশ্বের নর-নারীর গভীর আকাঙ্ক্ষা। কেবল শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেই আমাদের সম্পদ এবং শক্তি কাজে লাগিয়ে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-বালাই, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব থেকে মুক্তি অর্জন করে আমাদের অতি কষ্টার্জিত জাতীয় স্বাধীনতার সুফল আমরা ভোগ করতে পারব। এই বোধ এবং বিশ্বাস থেকেই আমরা এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্বে উত্তেজনা প্রশমন, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে শক্তিশালী করার নীতি বাস্তবায়নের সকল প্রচেষ্টা সমর্থন করি। এই নীতি অনুসরণ করেই আমরা ভারত মহাসাগরকে শান্তিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করার প্রস্তাবকে সর্বদাই দৃঢ় সমর্থন করি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে
আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের জন্য এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের সংগ্রামকে সমর্থন করা। অধিকার এবং স্বাধীনতায় বিশ্বাসী পৃথিবীর সকল মানুষেরই দায়িত্ব।' বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা মুগ্ধ হয়ে শোনেন।
পরিশেষে বিশ্ব শান্তি পরিষদের বরেণ্য সেক্রেটারি জেনারেল রমেশ চন্দ্রের উক্তি দিয়েই আমার নিবন্ধ শেষ করব- 'বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশরই নন, বঙ্গবন্ধু সমগ্র
বিশ্বের। বঙ্গবন্ধু শান্তি, স্বাধীনতা, বিশ্ব মানবতার প্রতীক'।
প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ
শান্তি পরিষদ

বিষয় : মুজিববর্ষ

মন্তব্য করুন