কভিড-১৯ মহামারি অপ্রত্যাশিতভাবে বিশ্বকে নেতিবাচক প্রভাবিত করেছে। মানব জাতি এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প-কারখানা, হাসপাতাল এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন পদ্ধতি, প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চিকিৎসা এবং প্রযুক্তির অনুসন্ধান করছে। সে ক্ষেত্রে বৈশ্বিক এই মহামারি মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ভ্যাকসিন আবিস্কার। অনেকটা স্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে, বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন আবিস্কার ও উৎপাদনের পর তা প্রয়োগ শুরু করে দিয়েছে এবং তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী অনেকটা ডামাডোলেরও সৃষ্টি হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে শুধু কভিড-১৯ মহামারি নয়, যে কোনো রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়। তাই ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে 'নতুন করোনাভাইরাস' নামে প্রথম চীন তারপর 'কভিড-১৯' নামে তা দ্রুতগতিতে গোটা বিশ্বকে ছোবল মারতে শুরু করলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে প্রথমত চিকিৎসার জন্য ওষুধ, তারপর যতটা সম্ভব দ্রুততার সঙ্গে ভ্যাকসিন আবিস্কারে উদগ্রীব থাকতে দেখা যায়। অনেক স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষ এই প্রাণঘাতী ব্যাধির নানান চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে। আর তাতে বেশ সফলতাও এসেছে। ভ্যাকসিন আবিস্কার, উৎপাদন ও প্রয়োগ শুরু করায় প্রকৃতপক্ষে কিছুটা স্বস্তি আনলেও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হতে পারছে না বিশ্ববাসী। কারণ, বিপজ্জনক এ ভাইরাসটি প্রতিনিয়ত তার রূপ ও চরিত্র বদলিয়ে নতুন করে হামলে পড়ছে মনুষ্যদেহে। এর সর্বশেষ একটি সংস্করণ ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় খুব দ্রুততার সঙ্গে ৭০ শতাংশের বেশি ছড়িয়ে পড়েছে।

অপেক্ষা, স্বস্তি, শঙ্কা এবং ভাইরাসের দ্রুত রূপ ও চরিত্র বদলানোর দোলাচলে কভিড-১৯ মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কীভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিশেষ করে ফাইভ-জি বা পঞ্চম প্রজন্মের প্রযুক্তি, ষষ্ঠ প্রজন্মের ওয়াইফাই এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সম্পর্কিত প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার এবং প্রয়োজনে এসবের ওপর নির্ভর করে নতুন যন্ত্রপাতি ও কলাকৌশল উদ্ভাবন করা যায় তা কিছুটা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। ফাইভ-জি, ওয়াইফাই-সিক্স এবং আইওটির সমন্বিত কলাকৌশল কীভাবে টেলিহেলথ, সংস্পর্শ নির্ধারণ, শিক্ষা, কেনা-বেচা, সাপ্লাই চেইন, ই-গভর্নমেন্ট, রিমোট বা হোম অফিস, তথ্য ভাগাভাগি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং উৎপাদন কারখানার স্বয়ংক্রিয়করণ, ই-ট্যুরিজম, বিনোদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নব নব সমাধান করতে সক্ষম হতে পারে, তার কিছু ব্যবহারে প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জের কথা এখানে তুলে ধরা হলো। ধরে নেওয়া হয়েছে, প্রস্তাবিত সমাধানগুলো মহামারিকালীন এবং মহামারিউত্তর বিশ্বে মানুষের জীবনযাত্রা ও দৈনন্দিন কাজকর্মকে সহায়তাদানে প্রভূত সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

কভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিনিয়ত যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। এ প্রবন্ধ লেখার মুহূর্তে বিশ্বের ২১৮টি দেশের প্রায় ৭৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষ কভিড-১৯ এ আক্রান্ত; মারা গেছে ১ দশমিক ৭ মিলিয়নের অধিক। দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবা খাতগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ জন্য প্রায় সব দেশের সরকারই তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আসছে, যেমন কভিড-১৯ দ্বারা অতিমাত্রায় আক্রান্ত অঞ্চলগুলো বিচ্ছিন্ন করা, বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত ট্রাফিক বন্ধ করা, স্কুল, কর্মক্ষেত্র এবং জনসমাগম স্থানগুলো বন্ধ করে দেওয়া, সাধারণ মানুষের চলাচল সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, তাদের যথাসম্ভব ঘরের বাইরে না যাওয়া, মাস্ক পরিধান, হাত ধোয়াসহ প্রাথমিক প্রতিরোধ করা ইত্যাদি। এসব নিয়ন্ত্রণের ক্রিয়াগুলো সামাজিক জীবন এবং অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশ ধাপে ধাপে নিয়মিত জীবনে ফিরে আসার জন্য তাদের কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে, ভ্যাকসিন আবিস্কারে কিছুটা সফলতা এলেও কভিড-১৯ দ্বিতীয় ধাপে অধিক মাত্রায় আঘাত হানার কারণে সার্বিক পরিস্থিতি নাজুকই রয়ে গেছে। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং এ থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী, সরকারি কর্তৃপক্ষ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী, সাধারণ জনগণসহ সংশ্নিষ্ট সব পক্ষের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পূর্ণ মাত্রার সক্ষমতা নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগ শুধু সুরক্ষার জন্য নয়, কভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্ব পরিচালনা করাও অত্যাবশ্যক হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগডাটা, ফাইভ-জি যোগাযোগ, ওয়াইফাই-সিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ব্লকচেইনের মতো প্রযুক্তি পরিবেশ, জনগণ ও অর্থনীতির উন্নতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এসব সম্ভাবনাময় সমাধান ও প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে এবং এসব থেকে প্রাপ্য সুবিধাগুলো মোক্ষম কাজে লাগাতে প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও ব্যয়, সুযোগ, গুণগত মান, ব্যবহারযোগ্য সম্পদ, ঝুঁকি ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তৃতভাবে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন শুরু করে দিয়েছেন। কারণ, এসবের প্রতিটি ক্ষেত্রে কভিড-১৯ এর কারণে বিস্তৃত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ফাইভ-জি ও ওয়াইফাই-সিক্সভিত্তিক সমাধান ব্যবহার করে সুফল পাওয়া যেতে পারে।


প্রসঙ্গত, ফাইভ-জি ওয়্যারলেস যোগাযোগ নেটওয়ার্ক মূলত বর্তমান ফোর-জি নেটওয়ার্কের দৃষ্টান্তমূলক এক বিশাল পরিবর্তন, ইংরেজিতে যাকে বলে 'প্যারাডাইম শিফট', যা সর্বত্র উচ্চহারের কভারেজ এবং ব্যবহারকারীদের অবিরত ইতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রদানে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

মোবাইল এবং ওয়্যারলেস যোগাযোগে ফোর-জি থেকে ফাইভ-জির সক্ষমতার তুল্যতা বিষয়ে ২০২০ ইনফরমেশন সোসাইটি কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষার ফলাফল সারণিতে তুলে ধরা হলো।

ফাইভ-জি মৌলিকভাবে তিন শ্রেণির সেবা প্রদান, অর্থাৎ উন্নত মোবাইল ব্রডব্যান্ড, অতি-নির্ভরযোগ্যভাবে খুব কম ল্যাটেন্সি এবং বিরাট আকারে মেশিন টু মেশিন যোগাযোগ স্থাপনে সমর্থ। তা ছাড়া ফাইভ-জি ইন্টারনেট সরাসরি এবং প্রয়োজনের সময় ওয়াইফাই-সিক্সের সমন্বয়ে ইন্টারনেট অব থিংসের (আইওটি) জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী সংযোগ প্রদান করে। এটি মূলত ইন্টারনেটে সংযুক্ত নানা প্রকার যন্ত্রপাতির সমন্বয় ঘটিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাটা সংগ্রহ ও ভাগাভাগি করে নেয়, যা অত্যধিক ডিজিটাল সেবার সক্ষমতাকে নিশ্চিত করে। এসব যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে সেন্সর, অ্যাকিউটিউটর, মোবাইল ডিভাইস, এমনকি শরীরে জামাকাপড়ের সঙ্গে পরিধানযোগ্য যন্ত্রসহ বেশকিছু ডিভাইস। এসব ডিভাইসের সক্ষমতা ও অ্যাপ্লিকেশনের প্রয়োজনীয়তাই আইওটিতে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নির্ধারণ করে।

ফাইভ-জি দূরনিয়ন্ত্রিত সমাধানে প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং বিশ্ব পরিবর্তন করতে প্রস্তুত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফাইবার টু দ্য হোম (এফটিটিএইচ) প্রযুক্তি এবং একেবারে প্রান্তিক ব্যবহারকারীর কাছে ওয়েব দুনিয়ার দুয়ার অনায়াসে খুলে দেয় ওয়াইফাই-সিক্স।

তাই আইওটির সক্ষমতা ও কার্যকারিতাকে ফাইভ-জি এমন এক সময় বহু গুণ বৃদ্ধি করে দিয়েছে, যখন কভিড-১৯ চলাকালীন এবং তৎপরবর্তীকালে টেলিহেলথসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড, ভ্রমণ, বিনোদন, নিরাপত্তা ইত্যাদি পরিচালনায় নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলে এই প্রযুক্তি 'নিউ নরমাল' সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ব্যাপারটি হচ্ছে, বিশ্ব যখন ফাইভ-জিতে যাচ্ছে, ফাইভ-জি তখন ফাইবারে যাচ্ছে। ফাইভ-জির মতো কয়েকটি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে হোম ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের জন্য উচ্চ গতিসম্পন্ন ও কম ল্যাটেন্সিসমৃদ্ধ ওয়াইফাই-সিক্স উৎপাদন করা হয়েছে। ফলে ওয়াইফাই-সিক্স যখন কোনো এফটিটিএইচ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তখন সামগ্রিকভাবে ল্যাটেন্সি কমে যায় এবং তাতে সেবা প্রদানকারীরা কোনো বাধা ছাড়াই একটি হোম ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে ফাইভ-জি ট্রাফিক অফলোড করতে পারে।

এটি স্পষ্ট যে, ফাইভ-জি দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলবে এবং মহামারি প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিকারে জুতসইভাবে ব্যবহূত হবে এই প্রযুক্তির দক্ষতা ও সক্ষমতা। এভাবে ফাইভ-জি এবং ওয়াইফাই-সিক্সের করোনাবিরোধী এ যুদ্ধ চলবে অবিরাম।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রযুক্তিবিদ
bn.adhikary@gmail.com