বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে পড়ি। তার সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। কাজ করার ক্ষেত্রে আয়শা আপা আমাদের অনেক সহযোগিতা করতেন, পরামর্শ দিতেন। এটা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে যে, তিনি আর কোনো কর্মসূচিতে আমাদের মাঝে থাকবেন না।

সেই ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন আয়শা আপা। হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধের পর সংগঠনের কাজে বেশি মনোনিবেশ করেন। আয়শা আপা শুরু থেকেই মহিলা পরিষদকে গড়ে তোলার কাজে বেশি মনোযোগী ছিলেন। তিনি প্রায়শই বলতেন- 'বাংলাদেশের সবগুলো জেলাতে কয়েকবার করে গিয়েছি সংগঠনের কাজে।' সংগঠনকে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে তিনি সারাদেশ ঘুরেছেন। ফলে মহিলা পরিষদ গড়ে উঠেছে একটি গণভিত্তির ওপরে।

আয়শা খানম অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। খুব ভালো বক্তৃতা করতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চমৎকারভাবে বক্তব্য চালিয়ে যেতে পারতেন। ঘরোয়া সভা কিংবা রাজপথ সবখানেই বক্তব্যের মাধ্যমে শ্রোতাদের উজ্জীবিত করতে পারতেন। স্বেচ্ছাশ্রমধর্মী একটি সংগঠনে মানুষ কেন কাজ করবে, কীভাবে কাজ করবে সে ব্যাপারে তিনি বক্তব্য রাখতেন। তার বক্তব্যের মধ্যে উঠে আসত সমাজ ব্যবস্থায় নারীর ঐতিহাসিক অবস্থান। তিনি যেমন জানতেন তেমনি বলতেও পারতেন। নকশিকাঁথা গাঁথার মতো করে সহজ শব্দের নিখুঁত গাঁথুনিতে বক্তব্য সাজাতেন তিনি।

মহিলা পরিষদের 'আইন সংস্কার' আন্দোলন কিংবা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচিতে নাগরিক সমাজের অনেক ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী সুফিয়া কামালের সঙ্গে নাগরিক সমাজের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই যোগাযোগ ঘনিষ্ঠভাবে রক্ষা করেছিলেন আয়শা খানম। ফলে সুফিয়া কামালের পরবর্তী সময়েও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সমর্থন লাভ করেছে মহিলা পরিষদ।

বৈশ্বিক নারী আন্দোলনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল আয়েশা আপার। চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের পরে সারাবিশ্বের নারী আন্দোলনে একটি ভিন্নমাত্রা যুক্ত হয়। ওই সময় নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সমাধানে করণীয়সহ সংশ্নিষ্ট বিষয়াদি ভালোভাবে আত্মস্থ করেছিলেন আয়শা আপা। তিনি ভীষণভাবে ঐক্যবদ্ধ নারী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, অন্যান্য নারী সংগঠন, উন্নয়ন সংগঠন ও প্রান্তিক সংগঠনের সমন্বয়ে নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের গোটা নারী আন্দোলনেই ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন নারীর উন্নয়ন সংক্রান্ত যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মহিলা পরিষদের পাশাপাশি অন্য সংগঠনগুলোও কাজ করুক।

আয়শা আপা সংগঠনে তরুণদের যুক্ত করার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন। তিনি সবসময় বলতেন, হয়তো আমরা কেউ সুফিয়া কামাল হতে পারব না, কিন্তু সবাই মিলে সুফিয়া কামালের বৈশিষ্ট্যগুলো ধারণ করতে পারব। তরুণ প্রজন্ম যাতে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় রেখে এদেশের নারী আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়, এ জন্য তিনি নিজে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতেন এবং তাদের মাঝে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান বিতরণ করতেন। আয়শা আপা নিজে অনেক পড়াশোনা করতেন এবং তরুণদের মাঝেও সেই পড়াশোনা ছড়িয়ে দিতেন। তার বিশেষ আগ্রহ ও চেষ্টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ একটি জেন্ডার সার্টিফিকেট কোর্স চালু করেছে। গত দশ বছর ধরে এই কোর্সের কার্যক্রম চলছে। এর উদ্দেশ্য- নারী আন্দোলন কর্মীদের নারী আন্দোলনের ইতিহাস ও গতিপ্রকৃতি, সমাজ ও সামাজিক বৈষম্য সম্বন্ধে অবগত করা। আয়শা খানম সমাজে বৃহৎ পরিসরে লিঙ্গ সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন এবং মহিলা পরিষদ তার বিশেষ আগ্রহে এই কোর্সটি পরিচালনা করছে।

বৈশ্বিক নারী আন্দোলনেও অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন আয়শা খানম। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যুক্তিতর্কের মাধ্যমে। ১৯৯২ সালে তিনি ভিয়েনা মানবাধিকার সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশেষ করে সংসদে নারী আসনের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় তুলে এনেছিল মহিলা পরিষদ; এক্ষেত্রে আয়শা আপার বিশেষ আগ্রহ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল। আমাদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বা অঙ্গীকারের অভাব কিংবা পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি- যে কোনো কারণেই হোক না সংসদে নারী আসনের ইস্যুটি এখন পর্যন্তও বাস্তবায়িত হয়নি। সে জায়গায় আয়শা আপার অত্যন্ত ক্ষোভ ও অভিমান ছিল।

একদিকে তিনি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করতেন, আরেকদিকে আশাবাদী হয়ে কীভাবে আন্দোলনকে অগ্রসর করা যায়, সে চেষ্টা করতেন।

আয়শা খানম অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ ছিলেন। আন্দোলন ও সংগঠনের বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। রোকেয়া সদনে মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে যাদেরকে আশ্রয় দেওয়া হতো, তাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। আশ্রিতরা তাদের সুবিধা-অসুবিধাসহ বিভিন্ন দাবি-দফার বিষয়ে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন। রোকেয়া সদনে আশ্রিত নারীদের অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আয়শা আপার মৃত্যুর খবরে তারাই বেশি ব্যথিত হয়েছেন।

নারী নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনাগুলো সমাজ থেকে দূর করার ব্যাপারে তিনি সোচ্চার ছিলেন। এক্ষেত্রে আইন সংস্কার, নতুন আইন প্রণয়ন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নির্যাতিতদের সহায়তাসহ যাবতীয় তৎপরতায় তিনি নিজে ও সংগঠনকে নিয়োজিত রাখতেন। মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ৫০ ভাগ সদস্যই ঢাকার বাইরের জেলার। পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাগুলোতে আয়শা আপা যখন বক্তব্য রাখতেন, প্রত্যেক সদস্য তার বক্তব্য ভালোভাবে শুনতেন এবং জেলায় জেলায় তার নির্দেশনা অনুযায়ী সংগঠন পরিচালনা করতেন।

নবীন-প্রবীণের সম্মিলিত চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে যাতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এগিয়ে যেতে পারে এবং বিভিন্ন প্রান্তিক ও পেশাজীবী নারীদের নিয়ে অর্থাৎ দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃহত্তর নারী আন্দোলন গড়ে ওঠে, সে জন্যই নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন আয়শা খানম। গত এক দশক ধরে তার এই চিন্তা-চেতনায় আমরা সংগঠন পরিচালনা করে আসছি।

একুশ শতকে নারী আন্দোলনে যে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, সে ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন আয়শা খানম। তিনি নারী আন্দোলনকে সমাজে ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি যুগ ও প্রজন্মের পরিসমাপ্তি ঘটল। আয়শা আপার সঙ্গে অনেকদিন একেবারে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। কাজ করার ক্ষেত্রে তার সহযোগিতা ও পরামর্শ আমাদের মধ্যে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার করেছে, দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করেছে। তার বক্তব্য সবসময় আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। আয়শা আপার কাছে আমরা অনেক ঋণী। তার প্রয়াণে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ শ্রেষ্ঠ একজন সংগঠককে হারাল। আয়শা আপাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ