ভারত সরকার যখন থেকে আর্থিক উদার নীতির আগ্রাসন শুরু করেছে, তখন থেকেই দেশটির কেন্দ্রীয় বা অধিকাংশ রাজ্যের সরকার কৃষি খাতকে দেশি-বিদেশি একচেটিয়া পুঁজির কাছে সমর্পণ করার নীতি বজায় রেখে আসছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার আসার পর তারা এই কৃষি খাতকে আরও তীব্রভাবে লুণ্ঠনের মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। মূলত ইউপিএ জমানা থেকে ভারতের কৃষিকে একচেটিয়া পুঁজির কাছে সমর্পণ করার উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এসেছে শ্রম আইন সংস্কার, কয়লা খাতের সম্পূূর্ণ বেসরকারীকরণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি। কৃষিক্ষেত্রে আনা হয়েছে একাধিক সংস্কার, যাকে দু'হাতে জোরালোভাবে তালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে দেশি-বিদেশি করপোরেট সংস্থাগুলো।

ভারতের অর্থনীতিতে কৃষকের অবদান ব্যাপক। প্রায় ১৩৫ কোটি জনগণের অর্ধেকই কৃষিক্ষেত্রে জড়িত এবং ভারতের ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে ১৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখে কৃষি। কিন্তু সরকারের কৃষি ধ্বংসের নীতির ফলে এই কৃষকরা যেমন ঋণে জর্জরিত, তেমনি দুর্বল হার্ভেস্ট এবং খরার কারণেও তারা দারুণ বিপর্যস্ত। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ যে, ২০১৯ সালে কৃষির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২৮ জন গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যা করেছে। তাই মোদি সরকার যখন নতুন কৃষি সংস্কার বিল প্রণয়ন করেছে, তখন তার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কৃষকদের সঙ্গে ৫ বছর বয়সী এক কৃষকসন্তানও বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয় কভিড-১৯-এর সময়কালে তড়িঘড়ি করে সরকার প্রণীত নতুন তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন ঘিরে। সরকার অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই অর্থাৎ কৃষক কিংবা রাজ্য সরকার, তাদের কারও সঙ্গে কোনো ধরনের যুক্তি-পরামর্শ না করেই নয়া কৃষি আইন প্রবর্তন করে।

এই কৃষি আইনে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে- অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন সংশোধন করে দানাশস্য, ভোজ্যতেল, তৈলবীজ, ডাল, পেঁয়াজ, আলুসহ সব খাদ্যশস্যকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য তালিকার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সেগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা। এর ফলে খাদ্যের মজুদ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা রাখতে পারবে না ভারতের জনসাধারণ। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা করপোরেট গোষ্ঠীর কাছে কত খাদ্যভান্ডার আছে তা কারও জানা থাকবে না। কৃষি সংস্কার আইনের আরেকটি দিক হলো, প্রচলিত বাজার ব্যবস্থার অনিবার্যতাকে অপ্রয়োজনীয় করে দিয়ে কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে ই-কমার্স চালু করা। এর ফলে এতদিন ধরে প্রচলিত মান্ডি ব্যবস্থার পরিবর্তে বিপণন ব্যবস্থার প্রসারের পথ সুগম হলো। ভারতের কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে দুর্নীতির একটা রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অন্যায্য আর্থিক বিনিময়ের সম্ভাবনা তৈরি করা হলো। তৃতীয়ত, মান্ডির সঙ্গে যুক্ত বিপুল একটা অংশের মানুষ কাজ হারাবে। চতুর্থত, ওয়্যারহাউস এবং কোল্ড স্টোরগুলো কৃষিপণ্যের বাজারে নতুন ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হবে এবং তাদের ওপর নজরদারির জন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকবে না। পঞ্চমত, এই অর্ডিন্যান্সের ফলে করপোরেট বহুজাতিক সংস্থাগুলো সদলবলে ভারতের বাজারে প্রবেশ করবে। এই সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চুক্তি চাষ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দাদন ও চুক্তি চাষ চালু ছিল। সেই চুক্তি চাষ স্বাধীন ভারতে বিভিন্ন সময়ে নানা সরকার চালু করেছিল। এখন বিজেপি সরকার নতুনভাবে এ পদ্ধতি প্রবর্তন করছে। প্রকৃত অর্থে, এই চুক্তি চাষকে যতই কৃষকের স্বার্থ রক্ষাকারী বলা হোক না কেন, এটা আসলে করপোরেশনের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং কৃষক তাদের দাসে পরিণত হবে।

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের কৃষকদের অসন্তোষ নতুন নয়। ২০১৮ সালে কৃষকরা 'মুম্বাই লংমার্চে' সমবেত হয়। এবার সদ্যবিদায়ী বছরের ২৬ নভেম্বর থেকে তারা দিল্লিতে জড়ো হয়ে দেশটির রাজধানীকে ঘিরে রেখেছে। এখন দিল্লিতে প্রায় ৩৫টি কৃষক সংগঠন এ আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে। সিপিআইএম, সিপিআই, সিপিআইএম-এল (লিবারেশন), আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক,এসইউসিসহ নানা বামপন্থি দল আন্দোলনরত কৃষকদের পাশে রয়েছে। এমনকি গণআন্দোলনের ধারায় বিশ্বাসী নয় ভারতীয় মাওবাদীরাও আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সমর্থন জানিয়েছে। সমর্থন রয়েছে আম আদমি পার্টিরও। অনেক আঞ্চলিক দলও এ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে ভারতের ট্রেড ইউনিয়নগুলো এক দিনের সাধারণ ধর্মঘটও পালন করেছে। ভারতের ব্যাংক ইউনিয়নগুলো আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কালো ব্যাজ পরিধান করেছে। আরও সংগঠন আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করেছে।

এই আন্দোলন হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মধ্যেও চিড় ধরাচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষকদের সমর্থনে পাঞ্জাবের বিজেপি সাধারণ সম্পাদক এবং দলটির পাঞ্জাব যুব সংগঠনের প্রধান দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। হরিয়ানার একজন বিজেপির বিধানসভা সদস্যও পদত্যাগ করেছেন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা অনেক শরিক দলও এই ইস্যুতে জোট ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে। পাঞ্জাবে তাদের শরিক দল সাড পার্টি ইতোমধ্যে জোট ছেড়েছে। একই প্রক্রিয়ায় রয়েছে রাজস্থানের আরএলপি দল।

এ অবস্থায় যতদূর সম্ভব ক্ষুব্ধ এই কৃষকদের সঙ্গে সরকার চুক্তিতে যাওয়ার উপায় খুঁজছে। তবে শুরুর দিকে তারা সামগ্রিক বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে আন্দোলনরত কৃষকদের দুর্বৃত্তবিরোধী শক্তির ইন্ধনে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হিসেবে আখ্যায়িত করার অপব্যাখ্যার চেষ্টাও বাদ রাখেনি।

মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয়ও কৃষকদের এ গণআন্দোলনকে খাটো করা কিংবা তাদের দাবিগুলোকে দুর্বল করার প্রবণতা চোখে পড়ে, ঠিক যেভাবে তারা ছয় বছর ধরে সব ভিন্নমত বা বিরোধী মতাবলম্বীদের নির্লজ্জভাবে আক্রমণের চর্চায় নিয়োজিত। কিন্তু সাম্প্র্রতিক কৃষক বিদ্রোহের জোয়ার থামানো যাচ্ছে না। প্রভাত পট্টনায়েকের মতো বিশ্বখ্যাত বামপন্থি অর্থনীতিবিদ কৃষকদের এ লড়াইকে শুধু তাদের লড়াই বলতে নারাজ। তার মতে, এটা ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র রক্ষারও লড়াই। সেই লড়াইকে কৃষকরা কতদূর নিয়ে যেতে পারবেন, সেটা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। তবে ভারতের সাম্প্রতিক কৃষক বিদ্রোহ আমাদের মতো কৃষিনির্ভর দেশগুলোর জন্য শিক্ষণীয়।

সাংবাদিক

বিষয় : প্রতিবেশী অনিন্দ্য আরিফ

মন্তব্য করুন