গোটা বিশ্ব করোনা দুর্যোগে যখন পর্যুদস্ত, তখন এর প্রতিষেধক টিকার আবিস্কার মানুষের শঙ্কা-ভীতি অনেকটাই দূর করতে পেরেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশে এর প্রয়োগও শুরু হয়েছে। আমাদের দেশেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয়ভাবে টিকাদানের খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আমাদের টিকা সংগ্রহের এখন পর্যন্ত মূল উৎস ভারত। প্রতিবেশী দেশটির সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারে হঠাৎ করে অনিশ্চয়তা-বিভ্রান্তি দেখা দিলেও মঙ্গলবার সংস্থাটির প্রধান তা দূর করতে চেয়েছেন। বুধবার সমকালসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে তার এক টুইট বার্তার সূত্র ধরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে টিকা রপ্তানির অনুমতি আছে। একই দিন ভারত বায়োটেকের সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতেও বিষয়টি পরিস্কার করেছে। দেশটির সরকারের পক্ষে সে দেশের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য সচিবও নিশ্চিত করেছেন, টিকা রপ্তানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এই বার্তাগুলো সংশয়-বিভ্রান্তি নিরসনে সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মূল বিষয় হচ্ছে টিকাপ্রাপ্তি। প্রকাশ্যে 'বিভ্রান্তি নিরসনে' পদক্ষেপ নিলেও অপ্রকাশ্যে প্রক্রিয়াগত নানা জটিলতার অজুহাতে বাংলাদেশের টিকাপ্রাপ্তি যাতে বিলম্বিত না হয় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতেই হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বল্প খরচে টিকা সরবরাহের দায়িত্ব দিয়েছে, সেরামকে তাও ভুলে যাওয়া চলবে না। ফলে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে টিকাপ্রাপ্তি নিছক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু হতে পারে না।

মঙ্গলবার আমাদের সরকার প্রায় সাড়ে তিন কোটি ডোজ টিকা আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রয়োগের কাজে চার হাজার ২৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকাপ্রাপ্তির ব্যাপারে হঠাৎ তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার টিকা কিনতে এই বরাদ্দ দেয়। সরকারের এই ত্বরিত সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি, সেরামের বাইরেও বিকল্প উৎস থেকে চাহিদামাফিক টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে একাধিক সমঝোতার প্রস্তুতি রাখাই শ্রেয়। আমরা জানি, রাশিয়া ও চীনের টিকা কয়েকটি দেশে ব্যবহূত হচ্ছে। আগামী দু-এক মাসের মধ্যে আরও কয়েকটি নতুন টিকা ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহে আমাদের যাতে কোনো বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, এ জন্য অন্যান্য উৎসের বিষয়টি আমলে রাখা প্রয়োজন। বুধবার সমকালে প্রকাশিত ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন পর্যায়ে পাঁচটি ধাপে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় আসবে। এই হিসাবে আমাদের প্রয়োজন প্রায় ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ডোজ টিকা।

এমতাবস্থায় বিকল্প আরও উৎস খোঁজার অপরিহার্যতা রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। একই সঙ্গে টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে যে বিভ্রান্তি-সংশয় ছড়িয়েছে, এরও কার্যকর নিরসন করা দরকার। শুধু আশাবাদের কথা শুনিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করা যাবে না, প্রয়োজন টিকাপ্রাপ্তির বিষয়টি যত দ্রুত সম্ভব নিশ্চিত করা। চুক্তি অনুযায়ী সেরাম থেকে যথাসময়ে যদি টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এর সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহলগুলো অপপ্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি বাড়াতে পারে।

করোনা দুর্যোগের এই সময়ে টিকা পাওয়া নিয়ে জনমনে প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই কোনো কারণে যদি আশাহত হওয়ার মতো কিছু ঘটে, তাহলে মানুষের মধ্যে এর বিরূপ প্রভাব প্রকট হতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে আমরা সাত কোটি ডোজ টিকা পাব। কিন্তু সরকারের খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের প্রয়োজন আরও অনেক বেশি। তার মানে সরকারের সংস্থাগুলোর মধ্যেই রয়েছে সমন্বয়হীনতা! একই সঙ্গে প্রাপ্তির পর টিকার সুষম বণ্টন প্রয়োগ যেমন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি তা যাতে দ্রুততার সঙ্গে প্রয়োগ করা যায় এই প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে হবে। করোনা দুর্যোগকালে আমরা নানারকম অনিয়ম-দুর্নীতির যে নগ্ন চিত্র লক্ষ্য করেছি, টিকার ক্ষেত্রে এর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে এ ব্যাপারেও কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে যেহেতু নানারকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সেহেতু আমাদেরও পিছিয়ে থাকার কোনো অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ প্রয়াসই কাম্য। টিকা সংগ্রহ ও প্রয়োগে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সচেতনতার বিকল্প নেই।