ইন্দোনেশিয়া জনসংখ্যা সংখ্যাধিক্যে সবচেয়ে বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র, যেখানে স্থাপন করা হয়েছিল হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর বৃহদাকার ভাস্কর্য। গল্পটা ১৯৮৮ সালের গোড়ার দিকে, একজন তরুণ ইন্দোনেশিয়ান ভাস্কর নিওমান নুয়ারতা মনস্থির করলেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নান্দনিক সৌন্দর্যমণ্ডিত একটি ভাস্কর্য রেখে যাবেন, যেটি তাদের অনুসন্ধিৎসু মনের হাজারো প্রশ্নের জবাব দেবে। কাজটা শুরু করাটা যেমন কঠিন ছিল, তেমনি কষ্টসাধ্য ছিল প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া। বাহ্যিক অর্থসংস্থানের সব আশা যখন স্তিমিত হলো, তখন নিজের জমানো ও ধার করা টাকায় শুরু করলেন ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ। দীর্ঘ ৩০ বছরের অক্লান্ত শ্রমের ফসল ইন্দোনেশিয়ার বালিতে গরুড় কাঞ্চনা ভাস্কর্য। আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয়ে নির্মিত। সুদূর চিন্তামগ্ন তরুণ ভাস্কর নিওমান নুয়ারতা চেয়েছিলেন শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশ্বের দরবারে নিজের জন্মভূমিকে সুউচ্চ রাখতে। এমন মহান শিল্পীর কারণেই তৈরি হলো বেদিসহ ১২১ মিটার (৪০০ ফুট) উচ্চতার সুবিশাল ভাস্কর্য, যা একটি ২১তলা ভবনের সমান। ভাস্কর্যের বেদি ছাড়া ৭৫ মিটার উচ্চতা এবং প্রস্থ ৬৪ মিটার (২১০ ফুট)। পুরো কাজটি করা হয়েছে ৪০০০ টন পিতল ও তামা দিয়ে, যা ২১০০০ ইস্পাত বার এবং এক লাখ ৭০ হাজার বোল্টুর সমন্বয়ে নিপুণ একটি স্থাপনা রূপ নিয়েছে। এই কাজের বাইরের অংশটি পরিমাপ দাঁড়ায় ২২ হাজার স্কয়ার মিটার। এর মূল স্তম্ভগুলো তৈরি করা হয়েছে কংক্রিট দিয়ে, কাঠামো ও ফ্রেম তৈরি করা হয়েছে স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে। বিষ্ণুর মাথায় পরা মুকুট ও গলায় পরা অলংকার তৈরি করা হয়েছে গোল্ডেন মোজাইক দিয়ে, যাতে বিষ্ণুর বিশালত্ব ও রাজকীয় ভাবগাম্ভীর্য প্রকাশ পেয়েছে সুন্দরভাবে। এটি করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই হাজার ঘণ্টা। শিল্পী প্রতিটি কাজ করেছেন এতটাই নিখুঁতভাবে, যা কোনো দর্শনার্থী বা বিশ্বের নানা শ্রেণির গবেষক ও শিল্প-সমালোচকদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছে এই সৃষ্টিশীলতা।

ভাস্কর নিওমান নুয়ারতা জাভা দ্বীপের বান্দুং শহরে তার ব্যক্তিগত ভাস্কর্য পার্কে ১০০ তরুণ শিল্পীকে নিয়ে কাজটি করেন ৩০ বছর সময় ব্যয় করে। ৭২৪টি মডিউল মোম দিয়ে তৈরি করেন, যা পরে ফাইবার গ্লাসে রূপান্তরিত করে ডাইস তৈরি করেন। পরে ওই ফাইবার গল্গাস থেকেই তৈরি করেন শক্তিশালী তামা ও পিতলের স্বপ্নিল বৃহদাকার স্থাপনা। পুরো কাজটি ১৫০০ খণ্ডে বিভক্ত করা হয় যাতে বান্দুং থেকে

বালিতে ট্রাকে নিতে সুবিধা হয় ও পরে ক্রেনের সহযোগিতায় সহজে ওপরে ওঠানো ও নামানো যায়।

ভাস্কর তার প্রিয় জন্মভূমিকে ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসে উপহার দেওয়ার জন্যই তার জীবনের মূল্যবান ৩০টি বছর ব্যয় করেছেন। দর্শনার্থীরা এই ভাস্কর্যের বিষ্ণুর বুক পরিমাণ উচ্চতা পর্যন্ত ওপরে উঠতে পারবেন এবং সমুদ্রের প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করতে পারবেন। পুরো ভাস্কর্যটিতে হিন্দু রক্ষক দেবতা বিষ্ণুর কাল্পনিক পাখি গরুড়ের ওপরে ওঠা চিত্রায়িত হয়েছে, হিন্দুদের সেই পৌরাণিক কাহিনির কথা মনে করিয়ে দেয় দর্শনার্থীদের। কিন্তু ভাস্কর এখানে হিন্দুধর্মের পৌরাণিকতার জন্যই ভাস্কর্য তৈরি করেননি, এটি তৈরি করেছেন ইন্দোনেশিয়ান সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য। কারণ ইন্দোনেশিয়ানরা মনে করেন, হিন্দুদের পৌরাণিক ঘটনাগুলো তাদের দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি পুরোটা অংশজুড়ে রয়েছে। যদিও কালের বিবর্তনে তারা এখন মুসলিম ধর্মের অনুসারী, এখন আখ্যা পেয়েছেন বিশ্বের জনসংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ হিসেবে। তবুও আদি সংস্কৃতিকে তারা বদলে দিতে চাননি, এই ভাস্কর্যটি সারাবিশ্ব থেকে বালিতে ঘুরতে আসা ৫০০০ মিলিয়ন দর্শনার্থীকে মনে করিয়ে দেবে ইন্দোনেশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ ও শিল্প-সংস্কৃতিপ্রেমী একটি গর্বিত জাতি হিসেবে। মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম যার যার, দেশ ও শিল্প-সংস্কৃতি সবার। ইন্দোনেশিয়া নিজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বুকে লালন করতে পেরেছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হলেও আমরা লালন করতে পারিনি বাংলাদেশের মহান স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ও স্মৃতি রক্ষার্থে নান্দনিক কোনো ভাস্কর্য। দেখে খুব কষ্ট হয়, যখন এ দেশেই বাংলায় কথা বলা, এ দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা, এ দেশের মাটি ব্যবহার করে এ দেশের খাদ্য এবং সব সুবিধা নিয়েও যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধিতা করে ধর্মের দোহাই দিয়ে। অথচ বিশ্বের এত বড় একটি স্থাপনা, যেটি এখনও ঠাঁই পাচ্ছে মুসলিম একটি দেশে। যা নিয়ে ওই দেশের কোনো মানুষ আজ পর্যন্ত কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করেনি। কিন্তু আমার জন্মভূমি বাংলাদেশে যখনই জাতির পিতার ভাস্কর্য স্থাপন করতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন কারা এর বিরোধিতাকারী? কোথা থেকে এলো তারা? এরা কোন ধর্মাবলম্বী? নাকি জাতি হিসেবে আমরা যুগে যুগে ছুটে যাব অপসংস্কৃতির দিকে?

ইন্টার্ন কিউরেটর, কোগ্যানেচু আর্ট সেন্টার ইউকোহোমা, জাপান