কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং ঠিক যেভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেভাবেই যে শেষ হয়েছে- এটা বোঝা কঠিন কিছু নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার সেই ব্যাকুল ভস্মপ্রার্থী, যিনি আমাদের বহু যত্নের সাংবিধানিক গালিচার সুতায় দিয়াশলাই ঠুকে দিয়েছেন। জো বাইডেনের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সিলমোহর মারার পর প্রতিনিধি সভা এবং সিনেটের দায়িত্ব হচ্ছে ট্রাম্পকে অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অভিশংসিত এবং কোনো রাষ্ট্রীয় পদের জন্য আজীবন নিষিদ্ধ করা।
যত স্বল্প সময়ের জন্যই হোক, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তার বাকি মেয়াদ পূর্ণ করতে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঝুঁকিতে ফেলা; গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে দেওয়া। তার মেয়াদ পূর্ণ করতে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, এই ধ্রুব সত্য এড়িয়ে যাওয়া- কংগ্রেস ভবনে হামলার মতো সহিংস রাষ্ট্রদ্রোহ ঘটেছে আসলে একজন উচ্ছৃঙ্খল, অনৈতিক ও ভীতিকর প্রেসিডেন্টের সহায়তা ও উৎসাহে।
২০১৫ সালে যে মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন, তখনই এটা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল যে, সুযোগ পেলে তিনি আমেরিকাকে কোথায় নামিয়ে নিতে পারেন। তিনি ছিলেন নিকৃষ্ট আত্মপ্রেমী, ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতারক প্রকৃতির, সম্পর্কের ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদী এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে দানবীয়। তার কোনো আদর্শ ছিল না; ছিল অযৌক্তিক অবস্থান। তার কোনো জোট ছিল না; ছিল জনতার ভিড়। তার কোনো চরিত্র ছিল না; ছিল লজ্জাহীন আত্মবিশ্বাস। তিনি চাইতেন তার অনুসারীরাও তেমনই লজ্জাহীন হোক।
এ সবকিছুই ছিল অনিবার্যভাবে সবার জানা, কিন্তু তাকে থামানোর জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। ২০১৫ সালে আমেরিকায় অনেক সংকট ছিল। তার অনেক সংকটই দীর্ঘদিন ধরে অগ্রাহ্য করে আসা হয়েছে; জনতুষ্টিমূলক রাজনীতিতে ব্যবহূত হয়ে এসেছে। কিন্তু ওই বছরের বৃহত্তম সংকট ছিল- প্রধান একটি রাজনৈতিক দল দখল করে নিয়েছিলেন একজন ঠগ। পরবর্তী বছরগুলোতে সেই সংকট ক্রমেই বড় হয়ে উঠেছে এবং একটি ঐতিহ্যবাহী দল ক্রমেই অজুহাত দেখিয়ে, এড়িয়ে গিয়ে, ক্ষমা করে দিয়ে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঠগবাজিতে সমর্থন দিয়ে এবং উদযাপন করে গেছে।
আমাদের সুবিধাবাদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওয়ের কথাই ভাবা যাক। ২০১৬ সালের মার্চে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ট্রাম্প হবেন একজন কর্তৃত্বপরায়ণ প্রেসিডেন্ট, যিনি আমাদের সংবিধান অগ্রাহ্য করবেন। আবার তিনিই গত নভেম্বরে জো বাইডেন নির্বাচনে জেতার পরও 'প্রতিশ্রুতি' দিয়েছিলেন যে, আগামীতে ট্রাম্প প্রশাসনের মসৃণ দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হতে যাচ্ছে।

রিপাবলিকান পার্টিও এখন যেন সংশোধনের সুযোগের শেষ প্রান্ত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এই কথা আমি বলছি, ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত বিনা বাক্য ব্যয়ে রিপাবলিকানদের ভোট দিয়ে এসেছি। সেই আমি যে গত সপ্তাহের আগে পর্যন্ত প্রত্যাশা করেছি, রিপাবলিকান পার্টি সিনেট অধিবেশনকে শেষ সুযোগ হিসেবে নেবে এবং জো বাইডেনের বিজয়কে শর্তহীনভাবে স্বাগত জানাবে। আমি বলছি না যে, দলটিতে মিট রমনি, ডেনভার রিগলম্যান, ল্যারি হোগানের মতো সাহসী রিপাবালিকানরা নেই। তারা গত পাঁচ বছর ধরেই তাদের নীতি ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু তারা সংখ্যায় সামান্য কয়েকজন। দলটির অধিকাংশ নেতা এবং তাদের সমর্থক ডানপন্থি মিডিয়ার চিয়ার লিডাররা যে রাজনৈতিক আবহ তৈরির চেষ্টা নিরন্তর করে গেছেন, তার ফলাফল হচ্ছে বুধবার মার্কিন কংগ্রেস ভবনে ন্যক্কারজনক হামলা।
বিশেষভাবে বলতে হবে রিপাবলিকানদের আইনি ফেরিওয়ালাদের কথা। যেমন রুডি গুলিয়ান থেকে মার্ক লেভিন। তারা নির্বাচনে জালিয়াতি নিয়ে দৃশ্যমানভাবেই ভিত্তিহীন অভিযোগ ক্রমাগত আওড়ে গেছেন। এদের নীতি ও নৈতিকতা বলে কিছু নেই। আরেকটু ভদ্রস্থ রিপাবলিকানরাও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উস্কে গেছেন 'আইনি উপায় খোঁজা' নিয়ে। অথচ তারা জানতেন, এতে কোনো ফল আসবে না।
ট্রাম্পের এই বাজনদারদের কেউ কেউ এখন বুধবারের সহিংসতা থেকে নিজেদের দূরত্ব দেখাতে সতর্ক শব্দবন্ধ সহযোগে টুইট করছেন। কিন্তু এরা, এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, গত কয়েক বছরে কংগ্রেসের যে ক্ষতি করেছেন, তা হামলাকারী জনতার চেয়েও গুরুতর। হামলাকারী জনতা যেসব দরজা-জানালা ভেঙেছে, তা মেরামত করা যাবে। কিন্তু এরা দল ও গণতন্ত্রের যে ক্ষতি করেছে, তা মেরামত করা যাবে না। তবে সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে। খণ্ডিত দায় নয়; সম্পূর্ণ। তার দায় অস্বীকারের সুযোগ নেই; মার্জনা পাওয়ারও সুযোগ থাকা উচিত নয়।
কিন্তু কথা হচ্ছে, গত পাঁচ বছর ধরে রিপাবলিকানরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্বাভাবিক ব্যবহারকে স্বাভাবিক হিসেবে ব্যাখ্যা করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ঘটানোর সুযোগ দিয়েছে। পাঁচ বছর ধরে তারা তাকে সুযোগ দিয়েছেন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার। চার বছর ধরে তারা তাকে অনিবার্য ও অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। একবারও বলেননি যে, তিনি দায়িত্ব পালনে অযোগ্য। গত পাঁচ বছর ধরে ডেনাল্ড ট্রাম্প যেসব সভা-সমাবেশ করেছেন, রিপাবলিকানরা সেগুলোকে গণতন্ত্রের উৎসব হিসেবে মেনে নিয়েছেন। একবারও ভাবেননি, সেগুলো ছিল আসলে নৈরাজ্যের প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র।
গত চার বছর ধরে রিপাবলিকানরা ভেবেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শর্তহীন সমর্থনে কোনো খরচ নেই। কিন্তু বুধবার তাদের ছেড়ে দেওয়া মুরগি ঘরে এসে ঢুকেছে। এই প্রবচন ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইতে আমার দ্বিধা নেই। কিন্তু এটা বাস্তব। যে কোনো সভ্য সমাজ টিকে থাকে তার বেদনাহত হওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে। সমাজের মূল্যবোধবিরোধী কোনো ঘটনায় ক্ষুব্ধ হওয়ার ক্ষমতার মাধ্যমে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরো মেয়াদে এ ধারণা যেন মাথা কুটে মরেছে।
বতর্মান পরিস্থিতির একটি চিকিৎসাপত্রই বাকি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই মুহূর্তে অভিশংসন করা এবং তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। তাকে আজীবনের জন্য রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে নিষিদ্ধ করা। আমেরিকানদের জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, ট্রাম্প যুগে কিছু বিষয় একদম মেনে নেওয়া হতো না। তার প্রথমটি হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে।
(ইংরেজি থেকে ভাষান্তর)
নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট;
পুলিৎজার বিজয়ী সংবাদ ভাষ্যকার

বিষয় : আর এক মিনিটের জন্যও ট্রাম্পকে রাখা যায় না

মন্তব্য করুন