করোনা সমগ্র বিশ্বকেই তছনছ করে দিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে অগণিত জীবন। বাংলাদেশের কত লোক এই অতিমারিতে প্রাণ দিয়েছে তার সরকারি হিসাব আমাদের জানা আছে, আসল পরিসংখ্যান সম্পর্কে ধারণা নেই। করোনার ছোবল এখনও উদ্যত। কবে কীভাবে পতিত হবে তা অনিশ্চিত।
ইতোমধ্যে করোনার থাবায় হারিয়েছি আমার প্রিয়জন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, নাট্যজন আলী যাকেরসহ অনেক গুণীজনকে। হারিয়েছি ফরিদপুরের চার অগ্রজপ্রতিম বন্ধুকে- যাদের সঙ্গে ষাটের দশকে একসঙ্গে পথ চলেছি, একাত্তরে সূর্যোদয়ের আরাধনা করেছি। এই চার মুক্তিযোদ্ধা হলেন- এবি মোহাম্মদ খুরশিদ, লোকমান হোসেন মৃধা, শরীফ আফজাল হোসেন ও খোন্দকার আতাউল হক।
১৯৭২ সালের কথা। সমাজ বিপ্লবের অঙ্গীকার নিয়ে মেজর এম এ জলিল ও আ স ম আবদুর রবকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠিত হলো। এই উদ্যোগের সঙ্গে আমরাও একাত্ম। কেন্দ্রীয় নির্দেশ এলো জাসদের জেলা কমিটি গঠন করার। সংকটে পড়লাম, জেলা সভাপতি কাকে করব? উকিল, মোক্তার, রাজনীতিক, অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। অনেকেই থাকতে রাজি, তবে সভাপতি হওয়ার 'ঝুঁকি' নিতে রাজি নন। এমন সময় কেন্দ্রীয় নেতারা জানালেন, ক্যাপ্টেন খুরশিদ ফরিদপুর যাচ্ছেন। তিনি জেলা কমিটির দায়িত্ব নিতে রাজি। খুরশিদ ভাইয়ের পুরো নাম এবি মোহাম্মদ খুরশিদ। মুক্তিযুদ্ধকালীন নাম কাপ্টেন খুরশিদ। মুক্তিযুদ্ধে ৯নং সেক্টরের অধীনে একটি নৌ ইউনিট গঠিত হয়েছিল, তিনি ছিলেন সেটির প্রধান। ষাটের দশকে যে সৈনিকরা সেনাছাউনিতে বসে বাংলাদেশ স্বাধীন করার পরিকল্পনা করেছিলেন, এবিএম খুরশিদ তাদেরই একজন। এটি ফাঁস হওয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম, সার্জেন্ট জহুরুল হকসহ ৩৫ জন সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তির সঙ্গে তিনিও আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। মনে পড়ে, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পেয়ে খুরশিদ ভাই ফরিদপুর এলেন। রাজেন্দ্র কলেজ সংলগ্ন বাসায় তখন উপচে পড়া ভিড়। খুরশিদ ভাই অনর্গল কথা বলছিলেন, কখনও বাংলায়, কখনও ইংরেজিতে। উভয় ভাষায় বিশুদ্ধ উচ্চারণ। প্রখর ব্যক্তিত্ব। সেদিন তিনি স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন। সেই স্বপ্নবাজ লোকটি ফরিদপুর জেলা জাসদের সভাপতি হলেন। ১৯৭৩-এ ফরিদপুর সদর থেকে জাতীয় সংসদেও নির্বাচন করেন। বেশ সাড়া পড়েছিল। ভালো ভোট পেয়েছিলেন। নানা সমস্যায় সংগঠনে সক্রিয় থাকতে পারলেন না। তবে নিজেকে জাসদের লোক বলেই পরিচয় দিতেন।
সম্ভবত গত ফেব্রুয়ারিতে আগরতলা মামলার অন্য অভিযুক্ত ক্যাপ্টেন বাবুলের (নূর মোহম্মদ) সঙ্গে ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে গেলাম, সেখানে অন্যান্য অভিযুক্তসহ খুরশিদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। বলেছিলাম, সেনাছাউনির মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে একটি বই লিখছি- আপনার সঙ্গে আলাপ করা দরকার। বললেন, অন্য কোথাও নয়, আমার বাসায় আসতে হবে। করোনার কারণেই যেতে দেরি হচ্ছিল। কিন্তু তার দেরি সইল না। ২ জুলাই চলে গেলেন।

১৯৬৭ সালে আমি যখন রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হই, তখন সারাদেশ ৬ দফার দাবিতে উচ্চকিত। ফরিদপুরে আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র রাজেন্দ্র কলেজ। তখন কলেজ ছেড়েছেন কিংবা শেষ পর্যায়ে আছেন, ছাত্রলীগের এমন কয়েকজন নেতৃস্থানীয় সংগঠক ছিলেন। নানা কর্মসূচিতে তারা ছুটে আসতেন, পরামর্শ দিতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন বিভূতিভূষণ ঘোষ, এ কে এম মামনুর রশীদ, খায়রুল বাসার বাবলু, মনোরঞ্জন সাহা, রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, লোকমান হোসেন মৃধা প্রমুখ। লোকমান হোসেন মৃধা বরাবরই নিভৃতচারী, তবে রাজনীতিতে নিবেদিতপ্রাণ। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের জেলা কমিটিতে ছিলেন। ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থার সভাপতিও ছিলেন। পদপদবির পেছনে কখনও ছোটেননি। এই নিভৃতচারী ব্যক্তিটি ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ফরিদপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন। এ খবর শুনে ভালো লেগেছিল যে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিকের মূল্যায়ন হয়েছে। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। লোকমান ভাই বলেছিলেন, পদটা বড়, কিন্তু বেশি কিছু করার নেই। তিনি এও বলেছিলেন, জেলা পরিষদ নিয়ে লিখো, যাতে এটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়।
আমি তাকে আমাদের গ্রামের প্রতিষ্ঠান বিভাগদী শহীদস্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে আর্থিক সহায়তা প্রদানের অনুরোধ করেছিলাম। বলেছিলেন, তুমি একটা কলেজ করেছ, বড় ভাই হিসেবে তোমার পাশে থাকা আমার কর্তব্য। জেলা পরিষদ থেকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। আগামীতে আরও সহায়তার কথা বলেছিলেন।
সর্বশেষ বছরখানেক আগে লোকমান ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দিয়েছিলাম তার লক্ষ্মীপুরের বাসায়। তখন তিনি সবে অসুস্থতা কাটিয়ে বিশ্রামে ছিলেন। সমকালের রিপোর্টার হাসানুজ্জামান ও আমি গেলাম। দেখলাম, পুরোনো সেই বাসা, বার্নিশ ওঠা সোফা-চেয়ার। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন। কথা প্রসঙ্গে বললেন, একাত্তরে তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আর ওদিকে যাওয়া হয়নি। বললাম, কলেজের একটি অনুষ্ঠানে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাব। না, লোকমান ভাইয়ের আর আমাদের গ্রাম ও কলেজ দর্শন হলো না। ১০ জুলাই ২০২০ করোনার থাবায় লোকমান ভাই বিদায় নিলেন।
ফরিদপুর জেলা জাসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার আতাউল হক। ২২ ডিসেম্বর করোনায় তার জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। আতাউল ভাই আমার এক-দুই বছরের বড়। এক ক্লাস ওপরে পড়তেন। আমি যখন ১৯৬৭ সালে কলেজে ভর্তি হলাম, তখন আতাউল ভাই জেলে। ৬ দফার চিকা মারতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। আমরা তখন স্লোগান দিতাম- জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব। তারপর বলতাম- জেলের তালা ভাঙব, আতাউল হককে আনব। এই কারাভোগ তাকে দিয়েছিল ব্যাপক খ্যাতি।
স্বাধীনতার পর যখন ছাত্রলীগ বিভক্ত হলো, তখন নাসিরউদ্দিন আহমেদ মুসা, সৈয়দ কবিরুল আলম মাও, শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, সালাউদ্দিন আহমেদ, নাজমুল হাসান নসরুসহ ফরিদপুরে ছাত্রলীগ নেতাদের সিংহভাগই সিদ্দিকী-মাখন গ্রুপে গেলেন। রব-সিরাজ গ্রুপ তরুণদের আগমনে মুখর হয়ে উঠল। তবে পরিচিত মুখ আতাউল হক ও আমি। আমাকে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হতে হলো। আতাউল ভাইয়ের ওপর বর্তাল জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। কিন্তু বেশিদিন এই দায়িত্বে থাকতে পারলেন না। বাবার অবর্তমানে পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে বর্তাল। ঢাকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। দীর্ঘদিন দৈনিক নব অভিযানের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তবে তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি স্বাধীনতা-উত্তর ফরিদপুর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদনার মধ্য দিয়ে।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাপ্তাহিক আলোর মিছিলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাংবাদিকদের নানা কল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি বই লেখা শুরু করেছিলেন। শেষ করতে পেরেছেন কিনা জানতে পারিনি।
২৯ ডিসেম্বর চলে গেলেন শরীফ আফজাল হোসেন। আমরা ফরিদপুরে একসঙ্গে ছাত্রলীগ করেছি, আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। ১৯৬৮ সালে রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনের কিছুদিন আগে আফজাল ভাই এনএসএফের গুন্ডাদের হাতে ছুরিকাহত হন। ওই দিন একই গুন্ডাদের হাতে আমিও লাঞ্ছিত হই, ঘটনাক্রমে রক্তাক্ত হইনি। ওই বছর আফজাল ভাই রাজেন্দ্র কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মনে পড়ে, ১৯৭১-এর মে-জুনে বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত দুই লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবী ও গৌরী আইউবের সঙ্গে আফজাল ভাই, সৈয়দ কবিরুল আলম মাও ও আমি বনগাঁ, রানাঘাট, বাগদা প্রভৃতি এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে একসঙ্গে ঘুরেছি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর তাড়া খাওয়া সর্বস্বহারা মানুষদের সান্ত্বনা দিয়েছি। তারপর আফজাল হোসেন দক্ষিণ-পশ্চিম বেসামরিক অঞ্চলের চেয়ারম্যান ফণীভূষণ মজুমদারের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। মুজিব বাহিনীতে মাও আর চাকুলিয়ায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অসুস্থ হয়ে আমি কল্যাণী যুব শিবিরের পরিচালনায় যুক্ত হই। তারপর আমাদের দেখা হলো স্বাধীন বাংলায়।
ছাত্রজীবন শেষে আফজাল হোসেন ব্যবসা শুরু করেন। শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোক্তাদের তিনিও একজন। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সমাজসেবায় নিবেদিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা নর্দান কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ ছাড়া আরও বিদ্যালয়, এতিমখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ায় অবদান রেখেছেন। তিনি ফরিদপুরে টাইমস ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মুখে বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। এটি ছিল তার জন্য বড় কষ্টের ব্যাপার।
মনোনিবেশ করেন সাহিত্য চর্চায়ও। কবিতা, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনিসহ তার লেখা বেশ ক'টি বই রয়েছে। পত্রিকায় মাঝেমধ্যে কলাম লিখতেন। ১৯৮০ সালের দিকের কোনো একটি সাপ্তাহিকে প্রকাশিত তার নিবন্ধ 'ফরিদপুরের প্রথম প্রতিরোধ' হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত স্বাধীনতার দলিলপত্রে সংকলিত হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের একটি নির্মোহ প্রামাণ্য দলিল।
আফজাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি, অনেক কথা। এ লেখায় সেসব বলার সুযোগ নেই।
স্বায়ত্তশাসন, মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজ বিনির্মাণে এই চার বিশিষ্টজনের ভূমিকা অনন্য। জাতি ও সমাজকে তাদের আরও দেওয়ার ছিল, তাদের সৃজনশীল হাতও ক্রিয়াশীল ছিল। কিন্তু অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যেতে হলো।
যখন মুজিববর্ষ চলছে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দ্বারপ্রান্তে, তখন এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চলে যাওয়া মানা যায় না। এটি ভেবে কষ্ট হয়, নতুন প্রজন্ম তাদের কাছ থেকে আর একাত্তরের গল্প শুনতে পাবে না।

সাংবাদিক ও লেখক