বৈচিত্র্যপূর্ণ ছয় ঋতুর এই দেশে শীতকাল কেবল জীবনানন্দ দাশের 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' নয়; বরং বাঙালি সংস্কৃতিতে এর রয়েছে অন্তর্গত উজ্জ্বলতা। মাঠে মাঠে যেমন থাকে সবজির সমারোহ, তেমনই ঘরে ঘরে দেখা দেয় পিঠার পরম্পরা। সাধারণ বৃক্ষে যদিও শীতকাল পাতাঝরার মৌসুম, সেখানে স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আসে খেজুরগাছ। অন্যান্য বৃক্ষ যখন বসন্তের আবাহনের জন্য অপেক্ষা করে, খেজুরগাছ সেখানে শীতেই হয়ে ওঠে 'রসবতী'। শীতের সকাল মধুর করে তোলে এই রস, রস দিয়ে তৈরি গুড় ও পিঠা-পায়েসে। খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের প্রথম দিকে সমকালের লোকালয় পাতায় প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনটিতে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই উদ্ৃব্দত হয়েছেন- 'নতুন খেজুর রস এনেছি, মেটে কলস ভরে,/ও আমার রস-পিয়াসী রসিক-জনের তরে।' দুর্ভাগ্য নিয়ে খেজুর রস নিয়ে আবহমান বাংলার সেই চিরায়ত উচ্ছ্বাসে যেন ভাটা পড়েছে। 'রসিক তুমি রস হারাইতেছ' শিরোনামে সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নেহাত বিরস।

বিশেষ ওই প্রতিবেদনে বিগত কয়েক বছরে মাদারীপুর অঞ্চলের 'মধুবৃক্ষ' খেজুরগাছের আবাদ, রস সংগ্রহের গাছের সংখ্যা, গাছির সংখ্যা, খেজুরের গুড়ের উৎপাদন ও চাহিদা ইত্যাদির যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা যেমন বর্ণাঢ্য অতীতের ইঙ্গিত দেয়, তেমনই তুলে ধরে বিবর্ণ ভবিষ্যতের কথা। আমরা জানি, কেবল মাদারীপুর নয়; দেশের অন্যান্য এলাকায়ও বিশেষত যশোর, ফরিদপুর, খুলনা, কুমিল্লা ও উত্তরাঞ্চলে বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির এই অনিবার্য অনুষঙ্গের ক্রমসংকোচনই স্পষ্ট হয়। আমাদের গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক 'মধুবৃক্ষ' ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিরস চিত্র নিছক সাংস্কৃতিক লোকসান হতে পারে না। খেজুর রস ও গুড়ের পুষ্টি ও ঔষধি গুণও বিবেচনা করতে হবে। বিবেচনা করতে হবে অর্থনৈতিক দিকও। শীতে দেশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এই 'মধুবৃক্ষ' থেকে সংগৃহীত রস ও এ দিয়ে তৈরি গুড় ছড়িয়ে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটবাজারে। একেবারে উৎসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক একশ্রেণির মানুষের, যাদের গাছি বলা হয়, তাদের জীবন-জীবিকাও এই রসনির্ভর। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিখ্যাত ছোটগল্প 'রস' আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খেজুরগাছ ঘিরে 'গাছি' সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক গুরুত্ব। তিনি লিখেছিলেন- 'যে ধারালো ছ্যান একটু চামড়ায় লাগলেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে মানুষের গা থেকে, হাতের গুণে সেই ছ্যানের ছোঁয়ায় খেজুরগাছের ভেতর থেকে মিষ্টি রস চুইয়ে পড়ে।'

আমাদের প্রশ্ন, গাছই যখন হারিয়ে যাচ্ছে, গাছিরা টিকে থাকে কীভাবে? বস্তুত এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি 'ব্র্যান্ড' যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, ইউরোপ-আমেরিকায়ও খেজুরের গুড়ের চাহিদা রয়েছে এবং একসময় সেসব দেশে তা পাঠানোও হতো। প্রাণ ও পণ্যের মেধাস্বত্ব নিয়ে গোটা বিশ্ব যখন প্রাণপণে লড়াই করে চলছে, তখন খাদ্য-সংস্কৃতির এমন মূল্যবান অনুষঙ্গ আমরা হেলায় হারিয়ে যেতে দেব? দেশে যখন বজ্রপাতের হার বাড়ছে, তখন খেজুরের মতো দীর্ঘ বৃক্ষের প্রতিবেশগত মূল্যও মনে রাখতে হবে বৈকি। আমরা মনে করি, আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রতিবেশগত মূল্য বিবেচনায় খেজুরগাছ এবং তা ঘিরে জীবন-জীবিকার উচ্ছ্বাস হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। এ ব্যাপারে সরকারি পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা নিঃসন্দেহে জরুরি; কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক উদ্যোগও নিতে হবে। ইটের ভাটার ক্ষুধা মেটাতে গিয়ে রসের ভান্ডার খেজুরগাছ আগুনে ঠেসে দেওয়া রোধ করতে হলে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি, ভুলে যাওয়া চলবে না। খেজুরগাছ ও রসের সঙ্গে আমাদের প্রাণ ও প্রকৃতির যে বন্ধন- তা যেন ছিন্ন করার মতো অবিমৃষ্যকারিতা আর কিছু হতে পারে না।

বিষয় : রস সংস্কৃতির বিরস সংবাদ

মন্তব্য করুন