সর্বগ্রাসী করোনা একের পর এক কেড়ে নিচ্ছে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলেন দেশের সুপরিচিত সাংবাদিক ও কলাম লেখক মিজানুর রহমান খান। তিনি এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন তা ছিল ভাবনাতীত। ডিসেম্বরের শুরুতেই তার করোনাক্রান্ত হওয়ার সংবাদ জানতে পারি। প্রত্যাশা ছিল, তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার তার ক্ষুরধার লেখনীতে মনোনিবেশ করবেন। কিন্তু গত সোমবার সন্ধ্যায় শুনতে হলো তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
প্রথমদিকে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি তার লেখনীর ভক্ত ছিলাম। ১৯৯৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনা করি। আদালত সম্পর্কীয় যে কোনো বিষয়ের প্রতি আমার ব্যাপক আগ্রহ থাকে। ছাত্রজীবন থেকে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কাজেই সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা পেশার প্রতি আমার এক ধরনের অনুরাগ ছিল। আমি প্রথম থেকেই দেখে আসছি মিজানুর রহমান খান বিভিন্ন সময়ে আইনের জটিল বিষয়ে গভীর বিশ্নেষণধর্মী নিবন্ধ লিখতেন। আমরা তার লেখা নিবন্ধ পড়তাম। তিনি এমন কিছু আইনি বিষয়েও নিবন্ধ লিখতেন, যে বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেক আইনজীবী কখনও চিন্তা করতেন না।
২০২০ সালের মার্চে আমি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হই। এরপর করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের আদালত ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। করোনার কারণে ভার্চুয়াল আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের বিদ্যমান আইন সম্পর্কে বিভিন্নজনের মধ্যে বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়। মিজানুর রহমান খানও একইভাবে কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করতেন। বর্তমানে আইনের যে বিধান রয়েছে সেই বিধানমতে, তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে অর্থাৎ ভার্চুয়ালি সুপ্রিম কোর্ট চলতে পারে এটি তিনি বিশ্বাস করতেন এবং এ বিষয়ে আমার সঙ্গে মতামত শেয়ার করেছেন। আমিও তার সঙ্গে মতামত শেয়ার করেছি। এ বিষয়ে তিনি আমার একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন।
তার মতামত ছিল- বিদ্যমান আইনেই সুপ্রিম কোর্ট সেটা সংশোধন করতে পারতেন এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে যে অধ্যাদেশটি জারি হলো (যার ভিত্তিতে বর্তমানে ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় আদালত পরিচালিত হচ্ছে) তার কোনো দরকার ছিল না। এতদসত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং পরে এটাকে আইনে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশে ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় বিচারকাজ পরিচালনার বিধান রাখা হয়। করোনা পরিস্থিতিতে আদালত ফিজিক্যালি না ভার্চুয়ালি পরিচালিত হবে- এ বিষয়ে আইন হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে কীভাবে আইন-আদালত চলে সেসব বিষয়ে আমাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি আদালত চালুর ব্যাপারে কী ধরনের ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়েও তিনি জানতে চেয়েছেন। করোনাকালে আমরা সমিতির পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতির কাছে যেসব দাবি-দফা উত্থাপন করেছি, সে দাবি-দফা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন এবং একাধিক নিবন্ধে সেগুলোর বিশ্নেষণ তুলে ধরেছেন। একটি নিবন্ধে তিনি আমার উদ্ৃব্দতি তুলে ধরে লিখেছিলেন, 'রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটি নির্বাহী বিভাগ, যার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি পুরোদমে কাজ করছিলেন। দ্বিতীয় বিভাগটি হলো আইন বিভাগ। করোনার মধ্যেও সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছিল। শুধু বিচার বিভাগ অকার্যকর। দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগ অকার্যকর থাকার কারণে সাংবিধানিক সংকট শুরু হয়েছে। এটা কোনো দেশের জন্যই কাম্য নয়। সুতরাং আদালতকে চলতে দিতে হবে।' আমার এই মতামতের সঙ্গে মিজানুর রহমান খান একমত ছিলেন। আমিও তার সঙ্গে একমত ছিলাম যে, আমাদের বিদ্যমান আইনেও সুপ্রিম কোর্ট তার বিদ্যমান বিধি সংশোধনপূর্বক ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে মামলা এবং আদালত পরিচালনা করতে পারতেন। যদিও পরবর্তী সময়ে নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সেটি আইনগতভাবেই সিদ্ধ করা হয়েছে।
বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে কিছু আদালত ভার্চুয়ালি চলে, আর কিছু আদালত চলে ফিজিক্যালি। আমরা গত বছরের জুলাই মাসে প্রধান বিচারপতিকে পরামর্শ দিয়েছিলাম- বিচারপতিদের মধ্যে যারা সশরীরে আদালত পরিচালনা করতে চান, তারা যেন সশরীরে আদালত পরিচালনা করতে পারেন। আর যারা ভার্চুয়ালি আদালত পরিচালনা করতে চান তাদেরও যেন সে সুযোগ দেওয়া হয়। মিজানুর রহমান খান আমাদের এ মতের সঙ্গে একমত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা কেন প্রস্তাব করি না একই সঙ্গে শারীরিক উপস্থিতিতে এবং শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচারব্যবস্থা এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে।

মিজানুর রহমান খান (জন্ম : ৩১ অক্টোবর, ১৯৬৭; মৃত্যু : ১১ জানুয়ারি, ২০২১)

সংবিধান ও আইনি বিষয়ে লেখা মিজানুর রহমান খানের অনেক নিবন্ধ আমি পড়েছি। তার লেখা থেকে আইনজীবীদের অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। আমি নিজেও তার লেখা নিবন্ধ আদালতে উপস্থাপন করেছি। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির ওই সময় বঙ্গীয় জুয়া আইন সম্পর্কে তিনি একটি বিশ্নেষণধর্মী নিবন্ধ লিখেছিলেন। মামলা শুনানিকালে আমি তার সেই নিবন্ধটি আদালতের কাছে উপস্থাপন করেছিলাম।
মিজানুর রহমান খান ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্ভীক মানুষ ছিলেন। তিনি তার লেখার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানে থাকতেন। একবার একটি নিবন্ধের কারণে আদালতে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয়েছিল। কমপক্ষে তিনদিন তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে বলা হয়েছিল, নিজের অবস্থান থেকে আদালতের কাছে দুঃখ প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু তিনি এত বেশি অনঢ় ছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেননি। তিনি যে দৃঢ় ছিলেন, নির্ভীক ছিলেন এই ঘটনা তার স্বাক্ষর বহন করে।
মিজানুর রহমান খান আইনের ছাত্র নন কিংবা আইন বিষয়ে একাডেমিক কোনো পড়ালেখা করেননি। তিনি হিসাববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সংবিধান-আইন বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞানার্জন করেন। তিনি একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, আইনের অনেক জটিল বিষয় সহজভাবে উপস্থাপন করতেন। আমি মনে করি আইনের শিক্ষার্থী, আইনজীবী এবং আইন সচেতন যে কোনো ব্যক্তির জন্য তার প্রত্যেকটি লেখা অত্যন্ত মূল্যবান।
আমরা মিজানুর রহমান খানের শূন্যতা খুব বেশি অনুভব করব। কারণ তার মতো আইনি জটিল বিষয় প্রাঞ্জলভাবে বিশ্নেষণ করা বা আইনের এত গভীর বিষয়ে ব্যাখ্যা করার মতো সাংবাদিক বা এ ধরনের লেখনী খুব কম মানুষের মধ্যে দেখেছি। তার এ অকাল মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। প্রয়াত মিজানুর রহমান খানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। দেশ, জাতি ও বিচার বিভাগকে তার লেখনীর মাধ্যমে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করার সুযোগ ছিল; যা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। তিনি ছিলেন একজন আলোকবর্তিকা। আমরা তাকে হারিয়েছি। তার চলে যাওয়ার যে ক্ষতি তা কেবল সাংবাদিকতা অঙ্গনের জন্য নয় বরং বিচার বিভাগের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি। আমি আশা করি, তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের মাঝে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন। আমি বিশ্বাস করি, বিভিন্ন ইস্যুর ওপর তার লেখাগুলো আদালতে আমরা রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করতে পারব।

 সম্পাদক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি

বিষয় : আইন-সাংবাদিকতার অপূরণীয় ক্ষতি

মন্তব্য করুন