কোনো অকৃতজ্ঞকে আমরা বলি 'নিমকহারাম'। এক প্রজাতির মাকড়সা যেমন জন্মের পর তার মাকে খেয়ে ফেলে, তেমনি স্বয়ং 'নিমক'ই যখন ধ্বংস করে দেয় তার জন্মস্থান, তখন তাকে কী অভিধা দেওয়া যায়? শোনা যাক সেই 'হারাম' নিমকের উপকূলীয় উপাখ্যান।

কপোতাক্ষের তীরে এবার যেখানে নতুন বাঁধ দেওয়া হয়েছে তার নিচেই ছিল কেরামত শেখের ৫ বিঘার ভিটাবাড়ি। ছিল ফসলি জমি। সে জমিটুকু এখনও আছে। তবে লবণাক্ততার কারণে সেখানে ফসল ফলে না। ভিটাবাড়ি চলে গেছে কপোতাক্ষের পেটে। এখন তিনি নিঃস্ব। এক সময়ের গৃহস্থ কেরামত শেখ আজ মাছ বিক্রেতা। নদী থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চলে তার। তার দুই ছেলে এলাকা ছেড়েছেন এক বছর আগে। খুলনা শহরের একটি বস্তিতে থেকে রিকশা চালান তারা। অথচ তিনি রয়ে গেছেন ফসলি জমির টানে। সেখানে আবার যদি ফসল ফলানো যায়- এই আশায়।

খুলনার কয়রা উপজেলার হরিণখোলা গ্রামের কেরামত শেখের মতো এলাকার হাজারো গৃহস্থ পরিবারের এমন অবস্থা এখন। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদীতীরবর্তী বাঁধ ভেঙে নোনাপানিতে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। তৈরি হয় নতুন বাঁধ। বাঁধের বাইরে হারিয়ে যায় বসতভিটা, ফসলি জমি। আবার বাঁধের ভেতরের জমিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে ফসল ফলাতে না পারায় অসহায় হয়ে পড়ছে কৃষক পরিবারগুলো। প্রকৃতির বৈরিতায় জীবনযুদ্ধে টিকতে না পেরে অবশেষে নিরুপায় মানুষ বাধ্য হয় পৈতৃক ভিটা ছাড়তে।

ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানা যায়, গত ১০ বছরে এ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ১৬ হাজার পরিবার এলাকা ছেড়েছে। স্থানান্তর হয়েছে ১০ হাজার পরিবার। লবণাক্ততা স্থায়ী হওয়ায় এক হাজার ৩০০ হেক্টর জমি ফসলহীন রয়েছে। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে ৪০০ হেক্টর কৃষিজমি। আবার পানি ও মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় চিংড়ি ব্যবসায় লোকসান গুনতে হচ্ছে এ এলাকার চাষিদের। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছে। এ সংখ্যাও কম নয়।

উপজেলার হোগলা গ্রামের ওলিয়ার রহমান কয়েক বছর ধরে তার নিজের ও অন্যের জমি লিজ নিয়ে চিংড়ি চাষ করতেন। সম্প্রতি চিংড়ি ব্যবসায় লোকসান গুনতে গুনতে এখন ধারদেনায় ডুবে গেছেন। নিরুপায় হয়ে দুই ছেলে ও ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বরিশালের একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজে চলে গেছেন এবার। ওলিয়ারের মতো ওই এলাকার অনেক চিংড়ি চাষি পেশা পরিবর্তন করেছেন।

কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলাউদ্দীন হোসেন বলেন, প্রতি বছর এখানকার নদনদীর পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৫-৬ পিপিটি পর্যন্ত লবণের মাত্রা এ এলাকার জন্য সহনীয়। অথচ গ্রীষ্ফ্মকালে তা ২৫-৩০ পিপিটি পর্যন্ত বেড়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত লবণাক্ততায় চিংড়ি চাষেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. জগদীশ চন্দ্র জোয়ার্দার সমকালকে বলেন, মাটিতে লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তার উর্বরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। ফলে সেখানে কোনো ধরনের ফসল উৎপাদন সম্ভব হয় না। লবণের স্থায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদি হলে সেই মাটিতে ঘাস পর্যন্ত জন্মাতে পারে না। স্যালাইন জোনে বাতাসেও লবণের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এতে দালানকোঠা, লোহার তৈরি স্থাপত্য, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিও মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

সরেজমিন দেখা গেছে, পাঁচটি নদীবেষ্টিত কয়রা উপজেলায় বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদীতীরবর্তী দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে নোনাপানি ঢুকে পড়ে। সময়মতো বাঁধ মেরামত না হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী নোনাপানি আটকে থাকে জমিতে। এতে সেখানে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ কারণে এ উপজেলায় পাল্টে যাচ্ছে জীবন-জীবিকার চিত্র। উপজেলার পূর্ব পাশে শাকবাড়িয়া ও শিবসা নদী, উত্তরে কয়রা নদী, পশ্চিমে খরস্রোতা কপোতাক্ষ নদ এবং দক্ষিণে আড় পাঙ্গাশিয়া গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। এর তিন পাশে সুন্দরবন। তার মাঝখানে দ্বীপের মতো সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কয়রা উপজেলা। প্রতি বছর নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ ছাপিয়ে অথবা ভেঙে এলাকায় নোনাপানি ঢুকে পড়ে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি পরিবেশ। ফলে কৃষিনির্ভরতা দিন দিন কমে যাওয়ায় বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে।
মাটিয়াভাঙ্গা গ্রামের মনজুরুল আলম বলেন, বছর দশেক আগেও আমাদের জমিগুলো অনেক উর্বর ছিল। কিন্তু এখন লবণাক্ততা গ্রাস করেছে মাটি। ভাঙা বাঁধ আর ঘেরের নোনাপানি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় এখন সেখানে ঘাসও হয় না।

ওই এলাকার ইউপি সদস্য বেলাল হোসেন জানান, আইলার সময় বাঁধ ভেঙে দীর্ঘমেয়াদি নোনাপানি আটকে ছিল। সে পানি কমতে না কমতেই আরেকটি দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। সর্বশেষ আম্পানে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এলাকা। এভাবে গত ১০ বছরে ওই এলাকায় কমপক্ষে ৫০ বিঘা ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে এলাকা ছেড়েছে ৫১টি পরিবার।

দশহালিয়া গ্রামে গিয়ে সেখানকার কয়েকজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এক সময় সেখানে পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস ছিল। তাদের প্রত্যেকের ভিটাবাড়িসহ ফসলি জমি ছিল। কপোতাক্ষের আগ্রাসনে গত ২০ বছরে সেখানকার প্রায় সাড়ে ৪০০ বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। নিঃস্ব হয়ে গ্রাম ছেড়েছে প্রায় ৩০০ পরিবার। এখন যারা টিকে আছে, তাদের দিন কাটছে বেহাল অবস্থায়।

গ্রামের মিজান মোল্যা বলেন, 'একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে নোনাপানির তাণ্ডবে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সবার। গাছগাছালি মরে গিয়ে বাড়িঘর ন্যাড়া হয়ে গেছে। মনে হয় যেন মরুভূমিতে বাস করতিছি।'

ওই গ্রামের মতি ঢালী বলেন, 'এলাকায় তেমন কোনো কাজ নেই। আগে নিজেগের ক্ষেত-খামারে কাজ করতাম। এখন সে উপায়ও নেই। এখন সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ করি। তাতে যা পাই তা দিয়ে মাস চলে কোনোরকমে। ভাবছি, শহরে চলি যাব কিনা।'
তার পাশে বসে থাকা কানাই মিস্ত্রি পাশের একটি মাটির ঘর দেখিয়ে বলেন, 'অভাবের তাড়নায় তিন পুরুষের ভিটা ফেলে ওই পরিবারটি কোথায় চলে গেছে তা কেউ বলতে পারে না।'

মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, নোনাপানির কারণে এলাকার খাবার পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমের পর এলাকায় খাবার পানির সংকট তীব্র হয়। নদীভাঙন আর নোনাপানির আগ্রাসনে দিন দিন বদলে যাচ্ছে এলাকার জীবন-জীবিকা। তিনি জানান, তার মেয়াদকালে গত পাঁচ বছরে ওই ইউনিয়ন থেকে ৫০০ পরিবার স্থানান্তর হয়েছে। উপজেলার অন্য ছয়টি ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষিবিদ মিজান মাহমুদ বলেন, এ এলাকার নদনদীর পানিতে লবণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকায় লবণ পানি প্রবেশ করছে এবং জমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। মারা যাচ্ছে গাছগাছালিসহ ফসলাদি। এতে চাষাবাদের জমির পরিমাণ প্রতি বছর কমছে। এর মধ্যে আমরা লবণসহিষ্ণু জাতের ধান ও রবিশস্য ফলানোর পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি কৃষকদের।

কয়রার ইউএনও অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, নদীবেষ্টিত এ উপজেলার প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। এর প্রভাব পড়ছে সব ক্ষেত্রে। সেই সঙ্গে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয় এখানকার বাসিন্দাদের। সরকারিভাবে দুর্যোগে অসহায় মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা ও পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা 'জাগ্রত যুব সংঘে'র কর্মকর্তা মশিউল আবেদীন বলেন, লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। খাওয়ার পানির সংকট থেকে শুরু করে শিক্ষাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর মানুষের বিপদ সবচেয়ে বেশি।