মানুষের মানুষ হিসেবে পরিশুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা অতীব জরুরি- এ কথা জ্ঞানীজনরা বলে থাকেন। সবাই প্রকাশ্যে তা স্বীকারও করেন। তবে, সে কাজে সচরাচর কেউই প্রবৃত্ত হন না বা হতে চান না। মানুষ যদি আত্মসমালোচনায় প্রবৃত্ত হয়, তাহলে অন্য কারও তার কাজের সমালোচনা করার সুযোগ থাকে না। আত্মসমালোচনার আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো ভবিষ্যৎ পথচলায় তা টর্চলাইটের কাজ করে। অন্ধকারে পথ চলতে টর্চের আলো যেমন পথিককে সঠিক পথের দিকনির্দেশ করে, আত্মসমালোচনাও একই ভুল দ্বিতীয়বার করা থেকে মানুষকে বিরত থাকতে সহায়তা করে।

যুগে যুগে মনীষীরা মানুষকে আত্মসমালোচনায় উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৪৬৯ বছর আগে জন্ম নেওয়া গ্রিক দার্শনিক মহামতি সক্রেটিস তার অন্যতম বাণী 'নিজেকে জানো'র দ্বারা মানুষকে আত্মসমালোচনার পথই দেখাতে চেয়েছেন। নিজেকে জানার চেষ্টা মানুষকে নিজের সম্বন্ধে সচেতন হতে সহায়তা করে। মনীষীরা বলে গেলেও আমরা কিন্তু আত্মসমালোচনার দিকে অগ্রসর হতে আগ্রহী নই। পরিবর্তে অপরের সমালোচনা করাকেই দায়িত্ব বলে মনে করি। আত্মসমালোচনার পরিবর্তে মানুষ যখন অপরের সমালোচনায় মুখর হয়, তখন লোকসমাজে তা সমালোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।

গত ১৩ ডিসেম্বর সমকালে বিএনপি নেতা খায়রুল কবীর খোকনের লেখা 'আত্মসমালোচনার পথ তৈরি হোক' নিবন্ধটি বেশ আগ্রহ সহকারেই পড়তে শুরু করেছিলাম। ধারণা ছিল নিবন্ধে বোধকরি তিনি তার দলের বর্তমান অবস্থা-দুরবস্থার কারণ খুঁজে বের করার নিমিত্তে আত্মসমালোচনার পথের সন্ধানের কথা বলেছেন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি যারপরনাই হতাশ হয়েছি। কেননা, তিনি নিজেদের নয়, আত্মসমালোচনার জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর সে আহ্বান জানাতে গিয়ে তিনি পুরো নিবন্ধজুড়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনায় মুখর থেকেছেন। তা তিনি করতেই পারেন। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী সরকারের সমালোচনা করা দোষের কিছু নয়। বরং বিরোধী দল যদি সেটা না করে তখন মানুষকে হতাশ হতে হয়। কিন্তু তিনি আত্মসমালোচনার কথা বলতে গিয়ে শুধুই সমালোচনায় সময় ব্যয় করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন। তিনি যদি সরকারকে আত্মসমালোচনার নসিহত করার পাশাপাশি নিজ দল বা সরকারের অতীত কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করতেন, তাহলে তার কথাগুলো অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পেত নিঃসন্দেহে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আত্মসমালোচনার সুযোগ একেবারে সীমিত। এখানে যে বা যারাই দলের নীতি-আদর্শ বা নেতার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করবে, তার ওপরই নেমে আসবে সাংগঠনিক ব্যবস্থার খÿ। অতি সম্প্রতি বিএনপিতে ঘটে যাওয়া 'শোকজ' কাহিনি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা মনে করেন, বিএনপির আজকের এই দুরবস্থার কারণ খুঁজে বের করতে হলে তাদের আত্মসমালোচনা-আত্মোপলব্ধি করতে হবে। বিএনপির মতো একটি কর্মীবহুল এবং যথেষ্ট জনসমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল কেন এমন হীনবল হয়ে পড়ল, তার কারণ অনুসন্ধান কি জরুরি নয়? বিএনপি নেতারা অবশ্য হরহামেশাই বলে থাকেন যে, সরকার ও সরকারি দলের জুলুম-নির্যাতনের কারণে তাদের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকতে পারছে না। কিন্তু পাশাপাশি যে প্রশ্ন আপনা আপনি এসে যায় তা হলো, সরকার বিএনপিকে এমন চাপে ফেলার সুযোগ পেল কীভাবে? রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের মতে, বিএনপির ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই তারা চাপের মুখে পড়েছে। অনেকেই মনে করেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জন করা ছিল বিএনপির প্রথম ভুল। দলটি দ্বিতীয় ভুল করে তার পরের বছর। ২০১৪ সালের নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিনে আহূত সমাবেশকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে 'লাগাতার অবরোধ' আন্দোলন দলটির নেতাকর্মীদের ঠেলে দিয়েছে বেকায়দা পরিস্থিতিতে। সেই ভুলেই খেসারত দলটি এখনও দিয়ে চলেছে।

সাধারণত মানুষ হোঁচট খেলে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে, নতুন করে চলার পথ খুঁজে বের করতে তৎপর হয়। কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে এসব চেষ্টার কোনোটিই দেখা যায়নি, দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বোদ্ধামহল বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, বিএনপিকে অতীতের ভুলত্রুটি সংশোধন করে নতুন করে পথচলা শুরু করতে হবে। নিজেদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ঝেড়ে ফেলতে হবে। অনেকেই মনে করেন, বিএনপির উচিত জামায়াতে ইসলামীকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া। তাদের কারণে বিএনপির প্রতিপক্ষরা দলটিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্তানা বলে সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। নির্বাচন বা অন্য কোনো ইস্যুতে বিপরীত আদর্শের দলের সঙ্গেও সাময়িক ঐক্য বা জোট হতে পারে। তাই বলে একবার জোট বাঁধার পর তা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না এটা কেমন কথা? সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, কখনও কখনও বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর 'নিশান বরদারে'র ভূমিকাও পালন করতে দেখা গেছে।

অন্যদিকে দলকে শক্তিশালী করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল, তা যে নিতে পারেননি, সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত বারো বছরে বেশ কয়েকবার ঘটা করে দলের পুনর্গঠনের কথা শোনা গেছে। সে লক্ষ্যে গঠিত  হয়েছে বহু কমিটি-উপকমিটি। কিন্তু অগ্রগতি অতি সামান্যই। ৮২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির অধিকাংশ এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। ৩১টি জেলায় রয়েছে আহ্বায়ক কমিটি। কোথাও নতুন কমিটি করা যাচ্ছে না কোন্দলের কারণে। সহযোগী সংগঠনগুলোর একই অবস্থা।

গত ৭ জানুয়ারি একটি দৈনিক 'ক্ষমতার বাইরে ১৪ বছরে বিএনপি' শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণে দলটি নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছে। অবশ্য দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তা মানতে নারাজ। তার মতে, বিএনপিতে কোনো নেতৃত্বশূন্যতা নেই। বিএনপি যে গত চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল এবং ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত হয়েছে, তা কি ঢেকে রাখার উপায় আছে? এখানেই আত্মসমালোচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপি নেতারা যদি আত্মসমালোচনা, আত্মোপলব্ধি না করে কেবলই সরকারের দিকে আঙুল নির্দেশ করে দায়িত্ব শেষ করতে চান, তাহলে বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে রাজনীতির মাঠে সতেজ হয়ে ফিরে আসা যে তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে, সে কথা বলা বোধকরি অসমীচীন হবে না।

খায়রুল কবীর খোকন তার নিবন্ধের এক পর্যায়ে 'আমরা আত্মসমালোচনা শিখতে চাই' বলে মন্তব্য করেছেন। তার এ শেখার আগ্রহকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। কারণ আত্মসমালোচনাই পারে তাদের দলকে ভুল শুধরে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে। বিএনপির জন্য যে সেটা এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি তা বোধকরি দ্বিতীয়বার বলার অপেক্ষা রাখে না।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক

বিষয় : রাজনীতি মহিউদ্দিন খান মোহন

মন্তব্য করুন