শনিবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে উপস্থিতির হার আশাপ্রদ হলেও সহিংসতা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ ছাড়াও সিরাজগঞ্জ সদর পৌরসভায় ফল ঘোষণার পর প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় বিজয়ী কাউন্সিলর প্রার্থীর নিহত হওয়া যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি এ নির্বাচনের আগে এক কাউন্সিলর প্রার্থীসহ তিনজনের প্রাণহানির ঘটনাও কম হতাশাজনক নয়। আমরা মনে করি, দীর্ঘমেয়াদে এ সহিংসতার ঘটনাগুলোই সামনে আসবে। অথচ আমরা লক্ষ্য করেছি, সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় বিভিন্ন নির্বাচনে যে ভোটের খরা দেখা গিয়েছিল, শনিবারের দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে তা অনেকটাই কেটে গেছে। সহিংসতার বাইরেও বিভিন্ন পৌরসভায় আরও নানা অনিয়মের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বিশেষ করে কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা যেমন দেখা গেছে, তেমনি ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও সামনে এসেছে। দ্বিতীয় ধাপের এ নির্বাচনে ৬০টি পৌরসভার মধ্যে চারটি পৌরসভায় ভোটের আগেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও এবারে অধিকাংশ পৌরসভায়ই বিরোধী বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে, তারপরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন যেমন প্রত্যাশিত নয়, তেমনি গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যেরও বিপরীত। সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, নির্বাচনের প্রচারে থাকলেও ভোটে তেমন সক্রিয় ছিল না বিএনপি। আমরা দেখেছি, জয়ী কাউন্সিলদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের।

বিএনপির একজন নেতা ক্ষমতাসীনদের কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করেছেন। আমরা মনে করি, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যে তৎপরতা প্রয়োজন ছিল, কমিশন অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার দায় নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। আমরা জানি, নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হলেও তা প্রয়োগের বিষয়টি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির সদিচ্ছা ও দৃঢ়তার ওপর। দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশন সে ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে দেখাতে পারেনি। সকল পর্যায়ের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পেশিশক্তি প্রদর্শনসহ বেশি সুযোগ নিতে চাইবে- এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের জন্যও নির্বাচনের 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' করার দায়িত্ব সর্বাগ্রে নির্বাচন কমিশনের। কমিশন সেভাবে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা নেবে- এটাই ছিল প্রত্যাশিত। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তা দেখা যায়নি। দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে প্রায় অর্ধেক এলাকায় ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে যথাযথভাবে ভোট অনুষ্ঠিত হলেও কোথাও কোথাও ইভিএম জালিয়াতির খবর আমরা দেখেছি।

কয়েকটি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীনরা গোপন কক্ষে প্রবেশ করে ভোটারদের জোর করে ভোট দিতে বাধ্য করার ঘটনা যেভাবে সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাতে আমরা বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন। আমরা নির্বাচন কমিশনকে এসব ঘটনা তদন্তের আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ভোটাররা যেভাবে স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে ভোট দিতে এসেছে, তা ইতিবাচক। কিন্তু ভোটার যদি কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারে কিংবা কেন্দ্রে এসে দেখে তার ভোট হয়ে গেছে, তা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয় বরং ভবিষ্যতে আস্থার সংকট সৃষ্টি করবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ভোট গ্রহণে যেমন প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টরাও হামলার শিকার হয়েছেন, তেমনি কোথাও কোথাও নির্বাচনী অনিয়মে পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদেরও জড়িত থাকার খবর আমরা দেখছি। উভয় ক্ষেত্রেই ঘটনাগুলো তদন্ত করে নির্বাচন কমিশন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। অনেক সময় নিরাপত্তার কারণেও বিরোধী দল পোলিং এজেন্ট দিতে পারে না। শনিবারের নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট ও পোস্টার দেখতে না পেয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, এমন অবস্থায় এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না। আমরা মনে করি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা ও ক্ষমতাসীন দলের সদিচ্ছার ওপর। আমরা বিশ্বাস করি, দায়িত্বশীল হিসেবে উভয় প্রতিষ্ঠানই অংশগ্রহণমূলক ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে সচেষ্ট হয়ে ভোটারদের মধ্যে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতেও ধরে রাখবে।

বিষয় : পৌরসভা নির্বাচন

মন্তব্য করুন