বিভিন্ন তারিখে বিভিন্ন অঞ্চলে গুচ্ছে গুচ্ছে পৌরসভাগুলোর নির্বাচন হচ্ছে। এরপর সেভাবেই হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। স্থানীয় সরকার সংস্থা তথা তৃণমূলের নির্বাচন রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র চর্চার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। নির্বাচনে কম-বেশি অনিয়ম, কারচুপি ও সহিংসতা উন্নয়নশীল অনেক দেশে ঘটে। এসব অপকর্ম খুব নিম্নমাত্রায় থাকলে নির্বাচন জনমনে গ্রহণযোগ্য হতে সমস্যা হয় না। যদিও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই আমাদের কাম্য। ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো তেমন নির্বাচন আমরা একদিন অর্জন করতেও পারব। আমাদের দেশে তুলনামূলক ভালো নির্বাচন আগেও হয়েছে। মানুষ ঈদের দিনের উৎসবের মতো আনন্দে ভোট দিয়েছেন। তৃণমূলের ভোটে তা বরং বেশিই লক্ষ্য করা যেত। সেই ব্রিটিশ আমলে এদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সূচনা এবং কয়েক যুগ ধরে ক্রমোন্নতির ধারায় বিকশিত হয়েছে। তবে অতীতে তো বটেই, স্বাধীনতার পর থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত এই স্তরের নির্বাচনে সহিংস ঘটনাবলি ও প্রাণনাশ বেশি মাত্রায় হয়নি। কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে ২০১৬ সাল থেকে কী হলো যে, সেই ঐতিহ্য আমরা হারিয়ে ফেললাম, মিডিয়াতে অনিয়মই শুধু নয়, ভোটারশূন্য ভোটকেন্দ্রের ছবি ভেসে উঠল, রক্তারক্তি-খুনোখুনির মাত্রা অনেক বেড়ে গেল এবং তা থামানো দুস্কর হয়ে পড়ল? তাই এ বিষয়ে গভীর মনঃসংযোগ প্রয়োজন।
পৌর নির্বাচন চলার মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে গ্রামের বাসিন্দা একজন পরিচিত রাজনৈতিক কর্মীকে ফোন দিয়ে হালচাল জানতে চাইলাম। তিনি আধা গ্রাম্য ভাষায় একটি সরল বর্ণনায় বললেন, মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ঝাঁপ চলছে। মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে মার্কা পেলেই পাস। যিনি নৌকা মার্কা পাবেন তাকে ভোটের আগেই সকলে পাস বলে ধরে নেয়। তাই মনোনয়ন পেতে অনেক খরচাপাতি লাগে। আসল ভোটাভুটি হবে মেম্বার-কাউন্সিলর পদে। সেটিতে নৌকা বা ধানের শীষ মার্কা নেই। অনেক মার্কা আছে। সেখানে যে যেভাবে ভোট নিতে পারে। কাইজ্জা তারাই করে। এই চিত্র সব জায়গার জন্য সত্য কিনা জানি না। হয়তো তার এলাকায়। হয়তো বেশিরভাগ এলাকায়। তবে ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও বর্তমানের আংশিক হয়ে যাওয়া পৌর নির্বাচনের চিত্র দেখলে দুটি বৈশিষ্ট্য ওই বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। প্রথমত, নৌকার প্রার্থীদের একচেটিয়া বিজয়। দ্বিতীয়ত, সংঘর্ষ-সহিংসতা মেয়র-চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কর্মীদের মধ্যে নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদের সমর্থকদের মধ্যে। ভোটকেন্দ্রে হাঙ্গামা প্রধানত তাদেরই।
গত ২৮ ডিসেম্বর ও ১৬ জানুয়ারি দুই দফায় যে মোট ৮৪টি পৌরসভার নির্বাচন হলো, তাতে তুলনামূলক বেশি ভোটারের উপস্থিতি ছিল বলে সংবাদমাধ্যমে কিছুটা সন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজরে থাকবে ভোটারের উপস্থিতি ও সহিংসতার মাত্রা। চলতি পৌর নির্বাচনে ঝিনাইদহের শৈলকূপায় প্রচারকালে সংঘর্ষে দুইজন এবং সিরাজগঞ্জে ভোটের ফল প্রকাশের পর একজন বিজয়ী কাউন্সিলর খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েকজন। আর ২৭ জানুয়ারি ভোট সামনে রেখে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারকালে ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন একজন।
মৃত্যুমাত্রই শোকের। অকালে ও অপঘাতে প্রতিটি মৃত্যু অধিক দুঃখের। আগামী ৩০ জানুয়ারি তৃতীয় দফায় ৬৪টি এবং মে মাস পর্যন্ত দেশের মোট ৩২৮টি পৌরসভার বাকিগুলোর নির্বাচন একাধিক ধাপে হবে। এর মধ্যে মার্চ-এপ্রিলে হবে কয়েক ধাপে মোট চার হাজার ৫৬২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। এটিকে দেশের বৃহত্তম নির্বাচনযজ্ঞ বলা যায়। যে অশুভ প্রবণতা চলছে তাতে এসব নির্বাচনে খুনোখুনি ও রক্তস্রোতের আশঙ্কা দূর করতে সংশ্নিষ্ট সরকারি, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বাত্মক চেষ্টা নিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে দফায় দফায় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করে প্রাণ দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে লড়ে দেশ স্বাধীন করার অন্যতম স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র। এখন দেশে কোনো বড় রাজনৈতিক সংকট নেই। বিপ্লব-উপবিপ্লব নেই। জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা জনগণ শাসিত হবে বলে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখন কেন অহেতুক নিরপরাধ মানুষকে জীবন দিতে হবে?
বর্তমান অবস্থার পটভূমির জন্য আমাদের চার থেকে ছয় বছর আগে দৃষ্টি ফেরাতে হবে। সমকালীন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা হয়েছে ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন তথা দশম সংসদ নির্বাচন নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দল বর্জন করে। ফলে নির্বাচিত সংসদে আওয়ামী লীগের একক প্রাধান্যসহ দেশে একটি রাজনৈতিক ভারসাম্যহীন তৈরি হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে কোনো রকম আলাপ-আলোচনা-বিতর্ক-সেমিনার ছাড়া অনেকটা হুট করেই শতবর্ষের ঐতিহ্যে ছেদ ঘটিয়ে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে স্থানীয় সরকারের উচ্চপদগুলোর নির্বাচনের আইন পাস করা হয়। আগে নির্দলীয়ভাবে নিজেদের কাছের চেনা জনদরদি নেতারা তৃণমূলে নির্বাচিত হতেন। স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ব্যবস্থা অনেক দেশে আছে। এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি আছে। কিন্তু সেসব আলোচনা, সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা ও জাতীয় মানসকে প্রস্তুত না করে তৃণমূলের নির্দলীয় নির্বাচন ব্যবস্থাটা ভেঙে ফেলা হয়। তখন এ বিষয়ে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছিলেন। আমরাও সমকালে সম্পাদকীয় মত প্রকাশ করেছিলাম। তবে সেসব বিবেচনা গ্রাহ্য হয়নি। আইন করা হয়, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের পদগুলো দলীয় প্রতীকে হবে, সদস্য-কাউন্সিলর প্রভৃতি নয়। এই নতুন আইন তৃণমূলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরাট পরিবর্তন ঘটায়। সুচিন্তিতভাবে উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে করলে যা হতে পারত ইতিবাচক পরিবর্তন, তা বিপরীতে নেতিবাচক হয়ে তৃণমূলে ঐতিহ্যবাহী গণতন্ত্রের সর্বনাশ ঘটায়। আইনে পরিবর্তনের পরে প্রথম পৌরসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকেই আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা ওঠে যে, এত বিরাট সংখ্যক দলীয় মনোনয়ন এবং দলের মধ্যে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়া খুব কঠিন। তখন আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ দলীয় প্রতীকে করার বিষয়ে দ্বিধা দেখা দেয়। এমনকি তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আইন যখন হয়েছে তখন একবার করেই দেখা যাক, নইলে পরে সরে আসা যাবে। অর্থাৎ আইনটিকে সাময়িক ও দলীয় উপযোগিতা হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
এরপর ২০১৬ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ছয় ধাপে মোট চার হাজার ১০৪টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক সহিংস ও প্রাণঘাতী নির্বাচন বলে পর্যবেক্ষকদের দ্বারা অভিহিত হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, তৃণমূলে সদস্য ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের একটি বড় অংশ নূ্যনতম এসএসসি ও তার নিচের শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন, ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ী এবং অনেক ছিল ক্রিমিনাল মামলার আসামি। রাজনীতিমনস্ক সমাজসেবী মানুষ আর নেই। বহুরকম নির্বাচনী অনিয়ম, শক্তি প্রয়োগ ও জাল-জুয়াচুরি ছাড়াও সেবার মোট নিহতের সংখ্যা ১৪৫ ও আহত হয়েছিল ১১ হাজারের বেশি মানুষ। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যাও দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক। আওয়ামী লীগের প্রায় একচেটিয়া বিজয়। সংঘর্ষগুলোর অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে এবং হতাহতও তাই। যেহেতু এখন প্রায় সর্বত্র সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, জেলার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রভৃতি বিভিন্ন স্তরে একই দলের ক্ষমতাধররা বিরাজ করছেন এবং অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে জেতার সুযোগ আছে, তাই দলের ভেতরের একেক নেতার অনুসারীরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
আরও একটি বিবেচ্য বিষয় হলো, গণতান্ত্রিক অনেক দেশে স্থানীয় সরকারে নাগরিকদের সরাসরি ভোটে কাউন্সিলররা নির্বাচিত হওয়ার পর তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র বা সংস্থা প্রধান নির্বাচিত করেন। এতে তিনি ব্যর্থ হলে বা দুর্নীতির দায়ে পড়লে আরেকজনকে প্রধান নির্বাচন করা যায়। এতে যৌথতা থাকে এবং সংস্থাটি অচল হয় না। এ রকম পরামর্শ থাকলেও আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা তা চান না। ফলে আমাদের স্থানীয় সরকার সংস্থায় মেয়র-চেয়ারম্যানরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। মার্কার নির্বাচনে তা আরও বেশি হয়েছে। দলীয় সরকারও অপছন্দের লোককে সরিয়ে প্রশাসক বসিয়ে দিতে পারেন। গণতন্ত্রের নামেও স্বেচ্ছাচারিতা পোষণ সম্ভব।
২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেনি বরং গণফোরামসহ ছোট কয়েকটি দল নিয়ে মোর্চা গঠন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। কিন্তু হাজারটা অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে যে নির্বাচন হয়েছে তাতে ওই মোর্চা ৩০০ আসনের মাত্র ছয়টিতে জিতেছে। আওয়ামী লীগের একাধিপত্য আরও দৃঢ় হয়েছে। এ অবস্থায় আবার এসেছে তৃণমূলের নির্বাচন।
২০১৪-পরবর্তীকালে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যবস্থার বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সাংবিধানিক সংস্থাটির হাতে অনেক আইনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মেরুদণ্ডহীনতা, স্তাবকতা ও ভীরুতার পরিচয় দিয়ে নির্বাচনে অনিয়ম ও সহিংসতা থামানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করা হয়নি।
দেশে একদিকে রাজনীতি আদর্শবর্জিত হয়ে কার্যত ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ধনসম্পদ লুণ্ঠনের পেশায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের নির্বাচনের এ অবস্থা। এটা চলতে দেওয়া যায় না। নিরপেক্ষ পরিবেশে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, রক্তপাতহীন নির্বাচন ও গণতন্ত্র চর্চার আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অতীতে দেশে সেরকম নির্বাচন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু মুক্ত নির্বাচনে গণরায় নিয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের সোপানে পা রেখেছিলেন। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা থাকলে নির্বাচনী সংস্কৃতির অধঃপতনের কারণগুলো দূর করে আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচনী সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

বিষয় : রাজনীতি

মন্তব্য করুন