২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মধ্য বাগ্যার গ্রামে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে রেখে এক গৃহবধূকে (৩২) সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের শিকার নারী তখন জানিয়েছিলেন, গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সমর্থিত মার্কায় ভোট দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি না হলে এ নিয়ে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে তারা তাকে 'দেখে নেওয়া'র হুমকি দেন। ঘটনার দিন রাতেই বাড়িতে ঢুকে সেই গৃহবধূকে মারধর ও ধর্ষণ করা হয়।

২০২০ সালের ৪ অক্টোবর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়ন এলাকায় এক গৃহবধূকে (৩৫) বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন ও নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, অনৈতিক প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় ভিডিওটি প্রকাশের আরও এক মাস আগে ২ সেপ্টেম্বর রাতে স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনীর সদস্যরা ভুক্তভোগী নারীকে যৌন নির্যাতন করে। এর আগেও তারা ওই নারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে বলে জানা যায়।

গত ১ জানুয়ারি নোয়াখালীতে ঘরে ঢুকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের অভিযোগে এক নারী আদালতে একটি মামলা করেন। তাতে, ১ জানুয়ারি রাতে 'স্থানীয় সন্ত্রাসী'রা সন্তানদের সামনে ওই নারীকে 'ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে' বিবস্ত্র করে নিপীড়ন চালায় বলে অভিযোগ করা হয়। ঘটনার প্রায় ১৫ দিন পর এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়।

ওপরের তিনটি ঘটনাই নোয়াখালীতে সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কেন নোয়াখালীতে ধর্ষণ বাড়ছে? নতুন জেগে ওঠা নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলে বিভিন্ন জনপদের মানুষ নতুনভাবে বসতি শুরু করেছিল এবং সেটি বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। ফলে, ভূমিপুত্রদের সঙ্গে নতুন বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব লম্বা সময় থেকে চলে আসছে। সামাজিক ক্ষমতা-দ্বন্দ্বের কারণে এখানে অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের মালিকানা ইত্যাদি নিয়ে এক সময় মামলা-হামলা-সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা দেখা যেত। সে সময় দ্বন্দ্বে 'নারীর ইজ্জত নষ্ট' করাকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ব্যাপকভাবে রক্ষণশীল অঞ্চল হওয়ার ফলে যদি কোনো পরিবারে নারীর প্রতি নিপীড়ন, নির্যাতনের ঘটনা ঘটত, তখন সেই পরিবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হতো। সে সময় সংবাদমাধ্যমের বিস্তৃতি কম থাকায় সে ঘটনাগুলো জনদৃষ্টির আড়ালে থেকে যেত। এই চলে যাওয়াটা সহিংসতাকারীদের জন্য একটি আদর্শ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে যে, ধর্ষণের ফলে নারীর 'ইজ্জত নষ্ট' হবে এবং এটিই সমস্যা দ্বন্দ্বে জিতে যাওয়ার ফলপ্রসূ উপায়।

ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীকে টার্গেট করার যে প্রবণতা তা এখনও ব্যাপকভাবে উপস্থিত। ফলে নারী, এই অঞ্চলে একের ওপর অন্যের ক্ষমতা চর্চার একক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেইসঙ্গে বর্তমান সময়ে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক-দলীয় ক্ষমতা। ওপরের তিনটি ঘটনা এবং এই অঞ্চলে ঘটে যাওয়া অন্যান্য ঘটনায় দেখা যায় প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবস্থান করে এবং বেশিরভাগ ঘটনাই হয়তো রাজনৈতিক পরিচয়ে ঘটে অথবা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেগুলোকে রাজনীতিকায়ন করা হয়।

সুবর্ণচরের ভুক্তভোগী নারী তার পছন্দের মার্কায় ভোট দেওয়ার কারণে সেখানকার ক্ষমতাবানরা 'ক্ষমতা বোঝাতে' এবং 'শিক্ষা দিতে' ওই নারীকে ধর্ষণ করে। ফলে ধর্ষণ সেখানে যৌনতা নয়, সেটি ক্ষমতা এবং প্রতিশোধের হাতিয়ার। বেগমগঞ্জের ভুক্তভোগী নারীর ক্ষেত্রেও তাই। বারবার ধর্ষণের শিকার হয়ে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে জানিয়েও কোনো ফল পাননি। কারণ 'ক্ষমতাশালী' হওয়ায় অভিযুক্ত দেলোয়ার বাহিনীর বিরুদ্ধে 'কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না'। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক হাতিয়ার ঘটনায় দেখা যায়, এই ঘটনায় মূলত দুই পরিবারের মধ্যে জমিজমা বিষয়ক ঝামেলা রয়েছে এবং একপক্ষ ভুক্তভোগী নারীর পরিবারকে অপদস্থ করতে সেই নারীকে হেনস্তা করার সুযোগ নেয়। প্রতিবেশীর ঘরে গেলে তার সঙ্গে প্রতিবেশী পুরুষের 'অবৈধ সম্পর্ক' রয়েছে এই কথা বলে পুরো বাড়ি ঘেরাও করে সেই 'নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে' এবং পুরুষটিকে 'বিবস্ত্র করে নির্যাতন' করা হয়। যারা এ ঘটনায় অভিযুক্ত তারা সবাই 'সরকারদলীয়' এক বড় 'নেতা গ্রুপের লোক'। ফলে, এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তারা বাড়ি ঘেরাও করে 'বিচার করার ক্ষমতা রাখেন' এবং ভুক্তভোগী নারী পুলিশের কাছে গেলে তারা 'মামলা নেননি' বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, এ ঘটনার ভিডিওতে যখন দেখা যায়, অভিযুক্তরা স্থানীয় এক নেতার দলীয় লোক, তখন 'অন্য গ্রুপ' নোয়াখালীতে ফের বেগমগঞ্জের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করে, যাতে করে প্রতিপক্ষ গ্রুপকে বেকায়দায় ফেলা যায়। এ ঘটনায় শুধু দল-বিদল নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে 'নারীকে ভিকটিমাইজ' করার কৌশল নেওয়া হয়।

নোয়াখালী অঞ্চলে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ব্যাপক দলীয়করণের ফলে কমিউনিটি, সরকার, প্রশাসনের সকল পর্যায়ে 'নিজেদের লোক' সর্বত্র একটি 'দায়মুক্তি'র সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে দুস্কৃতকারীরা এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি উপভোগ করে, যা তাদের এই অপরাধগুলো চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়। তাছাড়া, দুস্কৃতকারীদের অনেকে ক্ষমতার রাজনীতিতে সংযুক্ত বা আইনি প্রক্রিয়াটিকে প্রভাবিত করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। তাই অপরাধীরা আগাম বুঝতে পারে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।

এ ধরনের দলীয় বা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা সহিংসতা এবং তার পুনরাবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটিতে নারীর জন্য এক ধরনের 'উচিত/ উচিত না' নির্ধারণ করে। এই অঞ্চলে এমন বহুল চর্চা চলমান; চায়ের আড্ডায় 'নারীর উচিত/উচিত না' একটা বড় আলাপের জায়গা। এতে করে একদিকে যেমন কমিউনিটির আলোচনায় নারীর সহিংসতার শিকার হওয়ার কারণটি ধর্ষক নয়, বরং নারীর দিকে যায়; একই সঙ্গে নারী 'অনুচিত' কাজ করলে ধর্ষণ হবে, এর ভ্যালিডেশন দেয়।

এই চর্চা স্থানীয় মানুষের মধ্যেই প্রোথিত হয়ে থাকে যে, নারীকে তার 'অনুচিত' কাজের কারণে 'শিক্ষা দিতে', 'বেইজ্জত' করতে ধর্ষণ করা যায় এবং পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত পরিবেশ, সুযোগ খুঁজে নিয়ে এই অপরাধেরই অনুকরণ হয়। এক্ষেত্রে 'নোয়াখালীতে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ হয়'- এই প্রচলিত বিবৃতিটিও একটি বড় নিয়ামক। পাশাপাশি বিচারহীনতার দরুন আগের ধর্ষণগুলো জেনারালাইজেশন হয়; প্রবল প্রতিবাদ প্রতিরোধে ফুঁসে উঠলেও আমরা পরের ঘটনাগুলোকে আর আগের মতো গুরুত্বসহকারে আমলে নিই না। সেগুলো ধর্ষণ নয়, বরং একেকটি হুবহু পুরোনো ঘটনা হিসেবে।

এজন্য, যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনার পরিবর্তে তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। যেহেতু, অপরাধীরা যে কোনো ঘটনায় নিজেদের সামনে নিয়ে আসে এবং প্রশাসন ও রাজনৈতিক দল এই জাতীয় পরিচয়কে বিবেচনায় নেয়; তাই যে এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হবে, সেখানকার রাজনৈতিক নেতাদের এ জাতীয় ঘটনায় জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নারী নির্যাতনের যে কোনো ঘটনাকে প্রথমত, নথিবদ্ধ করতে হবে এবং প্রো-অ্যাক্টিভ প্রতিরক্ষামূলক হতে হবে।

সম্প্রতি সাধারণ মানুষের স্বপ্রণোদিত ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন ব্যাপকভাবে সাড়া ফেললেও তার পাশাপাশি সরকারকেই ধর্ষণবিরোধী সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অধিক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড- এমন আইনের চেয়েও ধর্ষণের মূল কারণ ও অপরাধ উৎপাটনে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা রাজনৈতিক দল থেকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

সবশেষে, নিপীড়ন বা ধর্ষণের শিকার নারীকে সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একঘরে করার যে ঘৃণ্য-সংস্কৃতি রয়েছে, তার পরিবর্তে ধর্ষণের শিকার নারীকে অন্য সব দুর্ঘটনার শিকার মানুষের মতো মর্যাদা দিতে হবে। ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বহুপক্ষীয় সংলাপ-উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, এখনই !

প্রধান নির্বাহী, পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যাকশন নেটওয়ার্ক-প্রান

বিষয় : সমাজ নুরুল আলম মাসুদ

মন্তব্য করুন