বেদখল হওয়া খাসজমি উদ্ধার এবং দখলদারদের আইনের আওতায় আনতে নতুন আইনের খসড়া তৈরির যে খবর শনিবার সমকালে প্রকাশ হয়েছে, তাকে স্বাগত না জানানোর কারণ নেই। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এই যুক্তি সংগত যে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে খাসজমি উদ্ধার সম্ভব হলেও দখলদারদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। দখলদাররা শাস্তির বাইরে থেকে গেলে উদ্ধারকৃত ভূমি পুনর্দখলের ঝুঁকি থেকে যায় বৈকি। আমরা প্রায়শই এর নজির দেখে থাকি। এজন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে হবে না। সাম্প্রতিককালে খোদ রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর তীরবর্তী খাসজমি অনেক হাঁকডাকের মাধ্যমে দখল উচ্ছেদ করা গেলেও কয়েক মাসের মধ্যে পুনর্দখল হতে দেখা গেছে। কেবল নদীর ভূমি নয়; বন বিভাগের খাসজমিরও একটি বড় অংশ দিন দিন দখলদারের পেটে চলে গেছে।

আমাদের মনে আছে, গত বছর সেপ্টেম্বরে সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, সারাদেশে বন বিভাগের পৌনে তিন লাখ একরের বেশি ভূমি ৭৭ হাজার ব্যক্তি জবরদখল করে রেখেছে। সারাদেশে রেল বিভাগেরও কম জমি বেদখল হয়নি। একই কথা বলা চলে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। সব ক্ষেত্রেই যে অভিন্ন চিত্র দেখা যায়- ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ বিদ্যমান ব্যবস্থায় জমি উদ্ধার করা হলেও পুনর্দখল হতে সময় লাগে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা জমি উদ্ধারের 'সাহস' পাওয়া যায় না। এমনকি খাসজমিতে খোদ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা যায় না দখলদারের দাপটে। এমন খবর সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিরল নয় যে, খাসজমিতে ভূমিহীনদের জন্য গৃহীত গৃহায়ণ প্রকল্পও বছরের পর বছর আটকে থাকে সংশ্নিষ্ট ভূমি দখলমুক্ত না হওয়ার কারণে। এতে করে একদিকে যেমন সামষ্টিক সম্পদ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভোগে যায়, অন্যদিকে বঞ্চিত হতে থাকে সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি কতটা গুরুতর- সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই রয়েছে তার খণ্ডচিত্র। এতে বলা হয়েছে, সারাদেশে যে কমবেশি ৪২ লাখ একর খাসজমি রয়েছে, সংশ্নিষ্টদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে তার বড় অংশই বেহাত হয়েছে। কেউ প্রভাব খাটিয়ে, কেউ জাল দলিল করে এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলে রেখেছে।

এভাবে খাসজমি বেদখল হওয়ার কারণে সরকার কেবল বিপুল রাজস্ব থেকেই বঞ্চিত হয় না; দফায় দফায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ ভূমি উদ্ধার ব্যবস্থাপনায় বিপুল খরচও হয় রাষ্ট্রীয় অর্থের। এই লুকোচুরি খেলা বন্ধ করতে হলে দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি দখলদারদের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান করে নতুন একটি আইন নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, নতুন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি হবে না তো? মনে রাখতে হবে আইন যতই হোক, এর সার্থকতা হচ্ছে প্রয়োগে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এক্ষেত্রেই রয়েছে ঘাটতি। আমরা জানি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থার এখতিয়ারের বাইরে থাকা বিপুল খাসজমি দেখভাল করে মূলত মাঠ প্রশাসনের জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিসগুলো। দশকের পর দশক এই প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর ঔদাসীন্যই খাসজমি দখলের বর্তমান চিত্র তৈরি করেছে। আমরা মনে করি, মাঠ প্রশাসন যদি আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে বিদ্যমান ব্যবস্থাতেও বেশিরভাগ খাসজমি দখলমুক্ত করা সম্ভব।

এই অভিযোগও অমূলক হতে পারে না যে, খাসজমির মতো সামষ্টিক সম্পদ বেদখল হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনেরই এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে। আমরা অস্বীকার করি না যে, প্রভাবশালী অনেক দখলদারের কাছেই মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অসহায়। দখলদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে উদ্যোগী কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক বদলির নজিরও আমরা দেখেছি। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন আইন আসার পর দখলদারের এ ধরনের দাপট তিরোহিত হওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে কি? নতুন আইন নিশ্চয়ই জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি আইন প্রয়োগের নিশ্চয়তা। এক্ষেত্রে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যেমন সক্রিয়তা প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমরা সেটিই দেখতে চাই সর্বাগ্রে।