দেশের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই যেন পাল্টে যাচ্ছে চিত্র। স্থানীয় সরকার কাঠামোর পৌরসভা নির্বাচন চলছে ধাপে ধাপে। ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এসব নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠ হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর পরই অনুষ্ঠিত হবে ইউপি নির্বাচন। যেহেতু এখন স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন হচ্ছে (কাউন্সিলর-মেম্বার পদ বাদে), সেহেতু এর উত্তাপ একটু ভিন্ন মাত্রায়ই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত কয়েকটি পৌর নির্বাচনে সহিংস ঘটনায় হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আগামীতে এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় কিনা এবং এর ফলে রাজনীতি নতুন মোড় নেয় কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

পৌর নির্বাচনের বিগত ধাপে মেয়র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে পড়েছে। নোয়াখালীতে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পরিবার সম্পর্কে নোয়াখালী-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর মন্তব্যের জেরে সেখানে সভা-সমাবেশ চলছে। ওবায়দুল কাদেরের ভাই নবনির্বাচিত পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা নির্বাচনের প্রচার অভিযান চলার সময় কিছু মন্তব্য করেছেন, যা শুধু অনেকের মনেই নয়, দলের কারও কারও মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, তা সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি। তার বিরুদ্ধে নানারকম অভিযোগ উঠেছে দলের ভেতর থেকেই। গত ২২ জানুয়ারি ফরিদপুরের সদরপুরে আওয়ামী লীগের বিবদমান দুটি পক্ষের রেষারেষির জের ধরে দলীয় কার্যালয়ে তালা পড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান ও সাবেক মেয়রের মধ্যেও এক পশলা বাগ্‌যুদ্ধ দেখা গেল সম্প্রতি। এসব ঘটনা বিশ্নেষণে বলা যায়, আওয়ামী লীগ যেন এখন নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএনপির রাজনীতি অনেক দিন ধরেই গণ্ডিবদ্ধ হয়ে আছে। সংবাদমাধ্যমেই দেখেছি, তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করতে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উল্টো সাংগঠনিক কার্যক্রম এলোমেলো হয়ে পড়েছে। অনেক দিন ধরেই মাঠ পর্যায়ে বিএনপির দলীয় কার্যক্রম প্রায় স্থবির বলা যায়। অনেকটাই বিবৃতিনির্ভর কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার মধ্যেই তাদের রাজনীতি আটকে আছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য বিশেষভাবে যে সমতল মাঠ প্রয়োজন, তাও তাদের প্রতিকূলে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার বিএনপিকে লক্ষ্য করে যেসব মন্তব্য করতে শোনা যায়, তা অনেকেই মনে করেন শোভন নয়। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনকারী জাতীয় পার্টির রাজনীতিও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। তাদেরও অভ্যন্তরীণ কোন্দল আছে। তা ছাড়া সরকারি জোটে থেকে তারা কেমন বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে, এ নিয়েও নতুন করে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। বাম দলগুলোর কর্মসূচি কিংবা রাজনৈতিক কার্যক্রম অনেকটাই কার্যালয়নির্ভর। দেশের বাম রাজনীতির এই চিত্র নতুন কিছু নয়। কারণ তাদের সাংগঠনিক ও জনভিত্তি দুর্বল। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের মধ্যে ঘটে গেছে নতুন মেরুকরণ। তারা সরাসরি রাজনীতিতে অবতীর্ণ হওয়ার পর তাদেরও ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। তারা লিপ্ত হয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে বাগ্‌যুদ্ধে। মোটামুটি এই হলো আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বর্তমান চিত্র। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এ কেমন 'গণতান্ত্রিক' রাজনীতি?

আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ যেহেতু দুর্বল, সেহেতু রাজনীতির মাঠে তাদের কোনো রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় পড়তে হচ্ছে না। শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অপরিহার্য হলেও তা অনুপস্থিত। কিন্তু এ অবস্থা তো গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে শুধু অন্তরায়ই নয়, নতুন করে অনেক নেতিবাচকতা সৃষ্টির শঙ্কাটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগের একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মানসিকতায়ও ক্ষমতার মোহ যেন জেঁকে বসেছে। সেখান থেকেই কি এমন 'গৃহদাহ'?

'গৃহদাহ' শব্দটির ব্যবহার অতীতে বিভিন্ন সময়ে রাজনীতির ক্ষেত্রে হয়েছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় এও বলা যায়, আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফের 'গৃহদাহ' শব্দটিই যেন ব্যবহারের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। খুব জোর দিয়ে উন্নয়ন অগ্রগতির কথা বলা হয় সরকারি দলের তরফে। এটা সত্য, আমাদের উন্নয়ন অগ্রগতি হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই; কিন্তু গণতন্ত্রের যে মূল অনুষঙ্গ সুস্থ রাজনীতি, এর অবস্থা কী? এখানেই থমকে যেতে হয়। কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না কিংবা সবার জন্য এর সুফল আনবে না, যদি রাজনীতির গুণগত উন্নয়ন করা না যায়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির মানোন্নয়নের ব্যাপারে এ পর্যন্ত কথাবার্তা কম হয়নি, কার্যত ইতিবাচক কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও রাজনীতির গুণগত মানোন্নয়নের কথা অহরহই বলেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কার্যক্ষেত্রে তাদের এই উচ্চারণের প্রতিফলন কতটা দেখা যায়?

একটা বিষয় অবশ্যই অনস্বীকার্য- গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের জন্য সুস্থ রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনীতিতে এই সুস্থতারই বড় অভাব। ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলগুলোর স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিতে চায় এবং এও নতুন কোনো চিত্র নয়। পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা ও অসহিষ্ণুতা। এ অবস্থায় রাজনীতি হয়ে ওঠে সংঘাতময় এবং আমাদের অভিজ্ঞতা এসব ক্ষেত্রে মোটেও প্রীতিকর নয়। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এমন পরিস্থিতি অস্বস্তিকর।

এ অবস্থায় রাজনীতি-সংশ্নিষ্ট সব পক্ষকেই সুস্থ ধারার এবং জনকল্যাণমূলক রাজনীতি নিশ্চিত করতে অধিকতর মনোযোগ দিতে হবে। গণতন্ত্রে মত-পথের ভিন্নতা থাকবেই, এটি মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এমনকি একই দলের মধ্যেও ভিন্ন ধারা থাকতে পারে। কিন্তু এ জন্য অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি হবে কিংবা পরিস্থিতি বৈরী রূপ নেবে আর এর মাশুল গুনবে দেশের সাধারণ মানুষ- এমনটি তো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি দলের 'গৃহদাহ' কেবল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। জাতীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে। এ ছাড়াও অভিযোগ আছে, স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনে সরকারি দলের কর্মীরা অধিকতর সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের জন্য সবার আগে দরকার সমতলভূমি। প্রশ্নমুক্ত, সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাজনীতির অলংকার। এ ক্ষেত্রে সব পক্ষেরই থাকবে সমান অধিকার। এসব বিষয়ে এ পর্যন্ত বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে, সুপারিশও উপস্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ কিংবা পরিবেশ উত্তপ্ত হতে পারে এমন কোনো কিছুই গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শোভনীয় নয়। গণতন্ত্র সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। পরমতসহিষ্ণুতাই হলো গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। সুস্থ ধারার রাজনীতি যেহেতু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম, তাই এ রাজনীতির প্রতি মানুষের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখন এই আগ্রহে ক্রমাগত ভাটা পড়ছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নমুক্ত করা না গেলে রাজনীতির চিত্র আরও অস্বচ্ছই হবে। এমনটি তো শুভবোধসম্পন্ন কারোরই কাম্য হতে পারে না। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন যদি সত্যিকার অর্থেই রাজনীতিকরা করতে সক্ষম হন, তাহলে তা হবে সবার জন্যই মঙ্গল।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বিষয় : রাজনীতি এম হাফিজ উদ্দিন খান

মন্তব্য করুন