উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার এবারের ফল নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চলমান করোনাদুর্যোগের কারণে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় এ ফল আগের দুটি পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হলেও আমরা একে সাধুবাদ জানাই। আমরা আগেও বলেছি, পরিস্থিতির নাজুকতায় পরীক্ষার বিকল্প হিসেবে এ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থেই সরকার গ্রহণ করেছে। করোনার কারণে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাসহ অন্যান্য শ্রেণি পরীক্ষাও বাতিল করতে হয়েছে। তারপরও গুরুত্বের বিচারে উচ্চমাধ্যমিকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি ছিল, যে সিদ্ধান্তের আলোকে আমরা এবার শতভাগ কৃতকার্য হওয়ার রেকর্ড দেখছি। আমরা এত বছর ধরে শতভাগ শিক্ষার্থীর কৃতকার্য হওয়ার ওপর যে জোর দিয়ে আসছিলাম, বিশেষ পরিস্থিতির কারণে হলেও এবার তার বাস্তবায়ন হয়েছে।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা সবার প্রচেষ্টায় তা অসম্ভব নয়। আমাদের মনে আছে, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে উচ্চমাধ্যমিকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয় এবং কথা ছিল ডিসেম্বরেই ফল প্রকাশ হবে। কিছুটা দেরিতে হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আমরা পেলাম। তবে এটা সত্য যে, ফল তৈরিতে এবার যেমন শিক্ষা প্রশাসনকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে, তেমনি পরীক্ষা ছাড়া ফল প্রকাশের জন্য জাতীয় সংসদে আইনও সংশোধন করতে হয়েছে। আমরা মনে করি, উচ্চমাধ্যমিকের এবারের ফল কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থীর মনোবেদনার কারণ হলেও অধিকাংশের মুখেই হাসি ফুটিয়েছে। তবে যারা সংক্ষুব্ধ হয়ে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করবে, তাদের বিষয়টি অন্যান্যবারের চেয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এবার উচ্চমাধ্যমিকে সর্বোচ্চ গ্রেডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী গতবারের তুলনায় তিনগুণের চেয়ে বেশি হলেও জিপিএ ৫ প্রাপ্তদের ৮০ শতাংশই বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। বিষয়টি কেন হলো তা খতিয়ে দেখা দরকার।

বলাবাহুল্য, এবারের ফল নিয়ে অনেকের মধ্যে যে নেতিবাচক মনোভাব আমরা দেখছি, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। বর্তমান বৈশ্বিক করোনাদুর্যোগে যেমন কারও হাত ছিল না, তেমনি এবারের উচ্চমাধ্যমিকের ফলের দায়ও কোনো শিক্ষার্থীর নয়। বরং আমাদের মনে আছে, গত বছরের এপ্রিলের শুরুতেই এ পরীক্ষাটি যখন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা তখন প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলছিল এবং এর পরও শিক্ষার্থীরা সশরীরে পরীক্ষাও দিতে চেয়েছিল। আমরা দেখেছি, শনিবার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীও উচ্চমাধ্যমিকের ফল নিয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য করতে নিষেধ করেছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন, এতে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়তে পারে। সব বোর্ডে কৃতকার্য প্রায় চৌদ্দ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষায় যথেষ্ট আসন থাকলেও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না। তবে এবার স্বস্তির বিষয় হলো, অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। আগে শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভর্তি পরীক্ষার জন্য যাওয়ার ভোগান্তিতে পড়তে হতো, এবার তা অনেকটাই কমে আসবে।

আমরা মনে করি, স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গুচ্ছ পদ্ধতিতে এলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য ভর্তি পরীক্ষা আরও সহজ হতে পারত। আমাদের প্রত্যাশা, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় ভর্তিতে মেধা নির্ধারণে উচ্চমাধ্যমিকের ফলের চেয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলের ওপর জোর দেওয়া উচিত, বিষয়টি আমরা আগেও বলেছি। আমরা জানি, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে এমন অনেক শিক্ষার্থী থাকা অস্বাভাবিক নয়, যারা আগের এসএসসি কিংবা জেএসসি পরীক্ষায় খারাপ করলেও উচ্চমাধ্যমিকে ভালো করার জন্য তৎপর হয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল; ভর্তি পরীক্ষা প্রাধান্য দিলে অন্তত সেসব শিক্ষার্থী উপকৃত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এর আগে করোনাদুর্যোগের মধ্যেও শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনের প্রচেষ্টায় এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের ফলও তারই ধারাবাহিকতা। এখন আমাদের তাকাতে হবে ভবিষ্যতের পানে। ফল প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থীকে আমাদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।