দেশের উচ্চ আদালতে প্রায় আড়াই হাজার দুর্নীতির মামলা 'ঝুলছে'- সোমবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে উঠে আসা এই চিত্র দেশের সামগ্রিক 'মামলাজট' থেকে ভিন্ন নয়। আমরা জানি, এখন দেশের বিভিন্ন আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৩৬ লাখেরও বেশি। সেখানে 'মাত্র' আড়াই হাজার মামলা সংখ্যাগত দিক থেকে নেহাত সামান্য বিবেচিত হতে পারত। এ ক্ষেত্রে সম্পাদকীয় স্তম্ভের এমন ভাষ্য অসঙ্গত হতো না যে, ঝুলন্ত এই মামলার সংখ্যা আমাদের উদ্বিগ্ন করলেও বিস্মিত করে না। কিন্তু যে বিষয়টি ভুলে যাওয়ার অবকাশ নেই- সারাদেশে দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। তার মানে, মোট মামলার অর্ধেকেরও বেশি আটকে আছে উচ্চ আদালতে এসে। এও মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলার বেশিরভাগ বিবাদীই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে যথেষ্ট প্রভাবশালী। সে ক্ষেত্রে এমন আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না- সার্বিক মামলাজটের কারণ নয়; কারণ পরোক্ষ নানা কারসাজিতেই এগুলো আটকে আছে। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতে জমে থাকা দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য ৪৫ জনের একটি আইনজীবী প্যানেল এবং হাইকোর্ট বিভাগে তিনটি বেঞ্চ সুনির্দিষ্ট রয়েছে।

আমরা এও জানি, গত বছর শুরুর দিকে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক থেকে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে বেঞ্চ বাড়ানোর সুপারিশ করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তারপরও কেন নিষ্পত্তির গতি শ্নথ- এর উত্তর সহজ নয়। তবে আমরা মনে করি, আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করা গেলে পরিস্থিতির বহুলাংশে উন্নতি হতে পারে। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে যথার্থই বলেছেন যে, আইনে যেভাবে চার বা ছয় মাসের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে মামলা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে, সেটা মেনে চলা সম্ভব হলে কোনো মামলাই দীর্ঘ দিন আদালতে ঝুলে থাকবে না। আমরাও মনে করি, ঠুনকো অজুহাতে মামলার শুনানি মুলতবি বন্ধ করা গেলে দীর্ঘসূত্রতা কাটতে বাধ্য। আলোচ্য প্রতিবেদনে উদ্ৃব্দত টিআইবির নির্বাহী পরিচালকের এ বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য- দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতি উৎসাহিত হতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতির দায়ে আটক ব্যক্তিদের জামিন একটি বড় ভূমিকা রাখে। কারণ এই প্রভাবশালীরা জামিনে বেরিয়ে গিয়ে প্রভাব খাটানোর সব পন্থাই অনুসরণ করতে থাকে। জামিন ছাড়াও মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে দুর্নীতির মামলাগুলোর ক্ষেত্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি রাষ্ট্রপক্ষের একজন আইনজীবীকে দুদকে তলব করা হয়েছিল দুর্নীতিবাজদের সহায়তার অভিযোগে।

আমাদের মনে আছে, কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে খোদ দুদকের এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির দায়ে আটক আসামিকে জামিন পাইয়ে দিতে 'সহযোগিতা' করার অভিযোগ উঠেছিল। এমন অনিয়ম ও দুর্নীতি অন্যত্রও ঘটে কিনা, খতিয়ে দেখা জরুরি। কয়েক বছর আগে সমকালেই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, দুদকের মামলায় জামিনপ্রাপ্তির হার ক্রমে বাড়ছে। আমরা অস্বীকার করি না যে, সংবিধান অনুসারে দেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান অধিকারপ্রাপ্ত। দুদকের নিশ্চয়ই উচিত সংবিধানের সেই বাণী সমুন্নত রাখা। কিন্তু যখন হঠাৎ দুর্নীতির মামলার ক্ষেত্রে জামিনপ্রাপ্তি বাড়ে বা মামলার গতি কমে, সে ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়ার বিকল্প নেই। কেউ যদি প্রকৃত জামিন বা খালাস পান, তাহলেও তদন্ত প্রক্রিয়া যাচাই করে দেখা উচিত।

দুর্নীতি রোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়াও কেবল মামলাজট কমানোর জন্যও দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। কারণ এসব বিচারক কিংবা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ব্যস্ততার কারণে আরও অনেক সাধারণ মামলার কার্যক্রম গতি হারাতে পারে। আর একটি মামলা ঝুলে থাকা মানে বিচারপ্রার্থীর জন্য তা অনিঃশেষ যন্ত্রণা ও অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন। অন্যদিকে একবার একটি মামলার শুনানি পিছিয়ে যাওয়া মানে ইতোমধ্যে জমে থাকা মামলাজট আরও প্রকট হওয়া। এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্টদের ভেবে দেখতে বলি আমরা। বস্তুত বিচার প্রক্রিয়া যে নিছক আইন-আদালত, সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথি-দলিলাদির ব্যাপার নয়; এর সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িত- সেই মানবিক বোধ সংশ্নিষ্ট সবার জাগ্রত হওয়া জরুরি। আমরা দেখতে চাই, দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার মাধ্যমে সার্বিক মামলাজট কমাতে সংশ্নিষ্টরা উদ্যোগী হয়েছেন।