'স্কুল' শব্দটি শোনার পর কোন বিষয়টি সাধারণত আপনার মাথায় আসে? নিশ্চয়ই এমন একটি জায়গার কথা মনে হয়, যেখানে শিশুরা জ্ঞান অর্জন এবং দক্ষতা বিকাশের উদ্দেশ্যে যায়। কিংবা এমন একটি জায়গা যেখানে শিশুরা জ্ঞানের পাখায় ভর করে উড়তে শেখে, খেলা বা গল্পের ছলে নতুন বন্ধু বানায়, আজীবন রোমন্থনের মতো সুন্দর সব ঘটনা স্মৃতির খাঁচায় বন্দি করে, যেখানে শিশুরা নিজেকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে। আমরা কখনোই স্কুলকে এমন কোনো স্থান হিসেবে ভাবি না বা ভাবতে চাই না, যেখানে শিশুরা কোনো ধরনের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারে, যা তাদের মনে সারাজীবনের মতো দাগ ফেলে দেয়।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সারাবিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। শিশু নির্যাতন বর্তমানে বিশ্বব্যাপী চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্বেগের পেছনের কারণ অবশ্য যথেষ্ট অর্থবহ। শিশু নির্যাতন আগামী দিনের কর্ণধার-শিশুদের এবং একই সঙ্গে আজকের সমাজকে এক পরিণতির দিকে ধাবিত করছে। সেন্টার অ্যান্ড গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের এক হিসাব অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে (মার্চ ২০১৯-মার্চ ২০২০) ১০টি দেশের প্রায় চার লাখ মেয়েশিশু স্কুলে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, শিক্ষকরাই এসব যৌন নির্যাতনের জন্য দায়ী। শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। হয়তো সে জন্যই বেশিরভাগ সময় যৌন হয়রানি এবং শিশু নির্যাতনের জন্য শিক্ষকদের দায়ী করা হয় না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে, এটিই সবচেয়ে ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। সেন্টার অ্যান্ড গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট আরও দেখেছে, বিশ্বের অনেক দেশেই শিক্ষকদের জন্য এমন কোনো আচরণবিধি নেই, যা সাধারণভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন নির্যাতন বা হয়রানি নিষিদ্ধ করে।
বিষয়টি কেবল যে বিশ্বের অন্য দেশগুলোয় হচ্ছে এমন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে, বাংলাদেশেও শিশু নির্যাতনের হার বেড়েছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) গবেষণা অনুসারে, ২০১৮ সালে ৫৭১ জন শিশু ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৮৭ শিশু যৌন হয়রানির সম্মুখীন হয়েছে। ২০১৯ সালে ১৬৪ শিশু ধর্ষণ বা গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে ২৭ শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মতে, নির্যাতনের শিকার শিশুর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ ঘটনার খবর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত পৌঁছায় না।
শিশুদের সুরক্ষা এবং যৌন নির্যাতন রোধে পাঁচটি পদক্ষেপ সংবলিত একটি কাঠামো রয়েছে। প্রথমত, শিশু নির্যাতনের বিষয়টি সম্পর্কে জানতে হবে। বিষয়টি জানা না গেলে কখনোই এটি রোধ করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের ঘটনা কমিয়ে আনতে এবং হয়রানির ঝুঁকি হ্রাস করতে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হবে। চতুর্থত, শিশু নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত করতে হবে। সবশেষে, সন্দেহ হলে, কেউ প্রকাশ করলে বা কোথাও হয়রানি হচ্ছে তা দেখতে পেলে যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। মনে রাখতে হবে, যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ৯৫ ভাগই সত্য  হয়ে থাকে।
সারাদেশের অল্প সংখ্যক স্কুলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ শিশু সুরক্ষা নীতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে আইবি পাঠ্যক্রম অনুসরণকারী আন্তর্জাতিক স্কুলগুলো শিশু সুরক্ষা নীতি এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বেশ কঠোর। মালী, ক্যান্টিন স্টাফ, দারোয়ান, টেকনিশিয়ানসহ সব শিক্ষক, প্রশাসন কর্মী ও সহকারীদের এতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া প্রত্যেক কর্মীর আইএসডিতে তাদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রশিক্ষণে পাস করা অত্যাবশ্যক।
সহিংসতা নিশ্চিতভাবে প্রতিরোধযোগ্য এবং যথাযথ উদ্যোগ ও জ্ঞান দিয়ে এই বিষয়টি মোকাবিলা করা এবং শিশু-কিশোরদের শিক্ষা ও বিকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, শিশু নির্যাতন যে কোনো জায়গায় ঘটতে পারে, তাই সহিংসতামুক্ত একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে এই পরিস্থিতি উপলব্ধি করা  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধান, মানবসম্পদ বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকা

বিষয় : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা

মন্তব্য করুন