বিনা অপরাধে পাঁচ বছর কারাগারে আটক থাকা রাজধানীর পল্লবী এলাকার বেনারসি কারিগর মো. আরমান হাইকোর্টের নির্দেশে গত ২১ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, মাদকের একটি মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির পরিবর্তে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। সম্প্রতি একটি দৈনিকে 'কারাগারে আরেক জাহালম' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর এর ওপর ভিত্তি করে একটি রিট হয়। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩১ ডিসেম্বর আরমানকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সাজাপ্রাপ্ত পরোয়ানাভুক্ত এক আসামির বাবার নামের সঙ্গে মিল থাকায় পুলিশ আরমানকে গ্রেপ্তার করেছিল। পুলিশের এমন 'ভুল' বহুবারই অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে এবং এই ভুলের মাশুল গুনতে হয়েছে বা হচ্ছে নিরপরাধ কাউকে না কাউকে। আরমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর থানা-হাজত থেকে আদালত হয়ে জেল গেট পর্যন্ত সংশ্নিষ্ট সবাইকে বলেছেন, তিনি নির্দোষ এবং পুলিশ যে আসামিকে খুঁজছে সেই ব্যক্তি তিনি নন। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেননি। তার জীবন থেকে দায়িত্বশীলদের 'ভুল'-এর কারণে ঝরে গেল পাঁচটি বছর। আদালতের নির্দেশনায় দায়িত্বশীলদের দায় এড়ানোর যে কোনো পথ নেই, তা-ই ফের প্রতীয়মান হয়েছে।
আমাদের মনে আছে সেই জাহালমের কথা। দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশের 'ভুল'-এর শিকার হয়ে এই পাটকল শ্রমিকের বিনা অপরাধে কারাগারে কেটে গিয়েছিল কয়েকটি বছর। একই রকমভাবে জাহালমের আহাজারি না দুদক, না পুলিশ, কারও মন গলাতে পারেনি। উচ্চ আদালত জাহালমকে অবিলম্বে মুক্তিদানের পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোকে লক্ষ্য করে কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। হয়তো অনেকেরই মনে থাকার কথা সেই ফজলু মিয়ার বিষয়টি, যাকে একইভাবে জীবনের ২২টি বছর হারাতে হয়েছিল। এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের ধরাধরপুর গ্রামের ফজলু মিয়াকে পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মনগড়া চার্জশিট দেয়। এমন মনগড়া কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট 'অপরাধ' রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর অনেকেই করে চলেছেন।
শুধু তা-ই নয়, পুলিশের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার খবরও যখন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে সাধারণ মানুষ জানতে পারে, তখন সংগতই প্রশ্ন জাগে- 'দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন'ই যাদের ব্রত তাদের 'ভুল' আর 'অপরাধ'-এর কারণে আর কত মূল্যবান জীবনের ক্ষয় ঘটবে? আবার এও সত্য, এই পুলিশ বিভাগেই অনেক দায়িত্বনিষ্ঠ, সৎ, মানবিক, কতর্ব্যপরায়ণ অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছেন। করোনা দুর্যোগকালে তা ফের প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু এও সত্য- অসাধু, দুর্নীতিবাজের সংখ্যাও কম নয় এবং তারাই এমন দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি আমাদের সমাজে উচ্চারিত হচ্ছে! এই দাবির বিপরীতে দায়িত্বশীল কারোর এমন স্বেচ্ছাচারিতা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যালোচিত হতে পারে?
নিকট অতীতে বিনা দোষে ৩৯ বছর জেল খেটে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ক্রেইগ কোলি নামের এক বাসিন্দা মুক্তি পেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্ষতিপূরণ বাবদ দুই কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার পেয়েছেন (বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৭৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা)। আমাদের আরমান, ফজলু, জাহালমরা পুলিশ-দুদকের 'ভুল' কিংবা 'অপরাধ'-এর শিকার হয়ে জীবনের যে অংশ কারা প্রকোষ্ঠে খুঁইয়েছেন, মানবাধিকারের নিক্তির মানদণ্ডে তাদের অবস্থাটা কী? দুর্নীতি দমনে ভারতে আন্না হাজারের নানারকম কর্মসূচি দায়িত্বশীলদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। ওই অধ্যায় খুব দূরের নয়। দুর্নীতি বিষয়টিই জটিল এবং বহুমাত্রিক। যত সহজে আমরা তা নিয়ে কথা বলি কিংবা মতামত জানাই, অনেকেই মনে করেন তা এত সহজ-সরল নয়। কোন উপায়ে সহজভাবে দুর্নীতি রুখে দেওয়া যাবে, তাও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই অনিয়ম-দুর্নীতি-অপরাধের জন্ম হয়। দায়িত্বশীল কারও কারও ভুলও এ থেকেই সৃষ্ট।
অতীতে 'ভূমি ব্যবস্থাপনা' শীর্ষক এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছিলেন, 'পদ্ধতিগত কারণেই দেশে ঘুষ খাওয়া সবচেয়ে সহজ কাজ। যাদের মানসম্মানের ভয় নেই, আত্মমর্যাদা নেই তাদের পক্ষে দুর্নীতি সহজ।' তিনি ওই অনুষ্ঠানেই লজ্জাহীনতার এই সংস্কৃতির অবসানে দুদক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। অনেকেই প্রাসঙ্গিক নানা ক্ষেত্রে 'বিচারহীনতার সংস্কৃতি'- এই শব্দযুগল উচ্চারণ করে থাকেন। দুদদ চেয়ারম্যান বলেছিলেন, 'লজ্জাহীনতার সংস্কৃতি'র কথা। সংস্কৃতি শব্দটি ব্যাপক অর্থে ইতিবাচক এবং একটি জাতিগোষ্ঠীর নানা বিষয়ের মধ্যে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই এসব ক্ষেত্রে 'অপ' শব্দটি যুক্ত করাই মনে হয় শ্রেয়। আরমান, জাহালম কিংবা ফজলুদের বিনা দোষে কারাভোগের বিষয়টি যদি বিশদভাবে আলোচনায় আসে, তাহলে তো এ প্রশ্নই দাঁড়ায়- তারা কি শুধু 'ভুল' আর দায়িত্বশীলদের 'অপরাধ'-এরই শিকার? না, তা-ই নয়। এর পেছনেও অনিয়ম-দুর্নীতির মতো চরম নেতিবাচক বিষয় যুক্ত। আমাদের আইনের দর্শনে বলা আছে, শত অপরাধী পার পেয়ে যাক; কিন্তু একজনও যেন বিনা দোষে কিংবা অপরাধে কারাভোগ না করেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, এমন শ্রুতিমধুর ও শোভন কিংবা ভালো কথা শুধু যেন কাগজে-কলমেই থেকে যায়।
সেই কবে কলকাতায় নির্মিত বিখ্যাত 'সবার উপরে' বাংলা চলচ্চিত্রটিতে প্রখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের কণ্ঠে একটি সংলাপ উচ্চারিত হয়- 'ফিরিয়ে দাও আমার বারোটি বছর'। সেখানেও এই আরমানদের মতো একই ঘটনা ঘটে এবং এরই প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয় চলচ্চিত্রটি। নানা দেশেই কোনো না কোনো সময়ে দেখা গেছে, দায়িত্বহীনতা-অনিয়ম-দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে দু'রকম অবস্থা তৈরি হতে। এক. যেখানে অনেকেই মনে করছেন, সবাই দুস্কর্ম করছে, তাহলে আমি করব না কেন? দুই. যেখানে অধিকাংশ মানুষ ভাবছেন কেউ দুস্কর্ম করে না, তাহলে আমি করব কেন? আমাদের নানারকম নেতিবাচকতার গণ্ডি থেকে বের হতে হলে প্রথম অবস্থা থেকে সমাজকে দ্বিতীয় অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের কেউ কেউ এমন অভিযোগও করেছেন, দেশের কারাগারগুলোতে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বিনা বিচারে আটক রয়েছেন। এ অভিযোগ খতিয়ে দেখে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে হয়তো আরমানদের মতো নিরপরাধ আরও কেউ কেউ বেরিয়ে আসবেন। বাবলু শেখ, জজ মিয়ার বিষয়ও অনেকেরই ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তারা দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছেন দায়িত্বশীলদের 'ভুল' বা 'অপরাধ'-এর কারণে। যাদের নিরপরাধরা বছরের পর বছর দুর্ভোগের জীবন পার করেছেন কিংবা করছেন তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। সুনির্দিষ্ট অপরাধ ছাড়া যেমন কাউকে হয়রানি করা অন্যায়, তেমনি যাকে গ্রেপ্তার করা হলো তিনিই অপরাধী কিনা তা যাচাই-বাছাই করা আইনি সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলদের যে গুরুদায়িত্ব এটি যেন তারা ভুলে না যান। মনে পড়ছে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তরে'-এ বর্ণিত একটি উক্তি। সেখানে বলা হয়েছে- 'বিচারের বাজারে গেলাম; দেখলাম, সেটা কসাইখানা। টুপি মাথায়, গামলা মাথায়, ছোট-বড় কসাই সকলে ছুরি হাতে গরু কাটিতেছে। মহিষাদি, বড় বড় পশু সকল শিং নাড়িয়া ছুটিয়া পালাইতেছে। ছাগ-গরুসহ সকল পশু ধরা পড়িতেছে।' আমাদের সমাজে দেখা যায়, সুবিধাবঞ্চিত মানুষরাই দায়িত্বশীলদের কারও কারও 'ভুল' কিংবা 'অপরাধ'-এর শিকার হন। আর একজনের অপরাধে আরেকজনকে পাঠানো হয় কারাগারে! প্রশ্ন হচ্ছে- এরকমই কি চলতে থাকবে? কোনো গণতান্ত্রিক, মানবিক, আইনি কাঠামোবদ্ধ সমাজে তো এমনটি চলতে পারে না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা মানবাধিকারের বুলি কপচাবেন আর সমান্তরালে ঘটে চলবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা, তা হতে পারে না।
লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com