প্রশাসন এবং অর্থনীতির প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধুর তীক্ষষ্ট নজর ছিল। ১১ আগস্ট, ১৯৭৫। আমি তখন রপ্তানি উন্নয়ন প্রধান। সংস্থাপন বিভাগ থেকে হঠাৎ ফোনে খবর পেলাম, লন্ডনে ইকোনমিক মিনিস্টার হিসেবে আমার পদায়ন হয়েছে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে। সংস্থাপন সচিব ছিলেন মাহবুবুর রহমান। তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি ফাইল দেখালেন। লন্ডনে ইকোনমিক মিনিস্টার পদায়নের প্রস্তাবের বিপরীতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বহস্তে লিখেছেন (এই মর্মে) 'ঐ পদে একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তার নিযুক্তি আবশ্যক। ইনাম আহমদ চৌধুরীকে নিযুক্ত করা হইল।' মনে পড়ে, কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং নির্দেশ নিতে তার সঙ্গে দেখা করি সচিব আবদুর রহিমের আয়োজনে ১৩ আগস্ট। ওই সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে রপ্তানি বৃদ্ধি করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন এবং লন্ডনে অবস্থানরত শহীদজায়া বোন নাসিম হাইয়ের কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। পরের দিনই ইতিহাসের নৃশংসতম বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে আত্মবলিদান দিলেন জাতির পিতা। তার সঙ্গে শহীদ হলেন ঢাকাস্থ তার পরিবারের সব সদস্যও। রচিত হলো বাংলার ইতিহাসের কলঙ্কতম অধ্যায়, বাংলার কারবালা।
নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। নিঃসন্দেহে তিনি বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র সার্বভৌম বাংলাদেশের স্রষ্টা, জাতির পিতা। কিন্তু এটা শুধু তার একটি পরিচয়। বৃহত্তর পৃথিবীর গণ্ডিতে তার আরেকটি অত্যুজ্জ্বল পরিচয় রয়েছে। শেখ মুজিব মানুষের বন্ধু, সংগ্রামী মানুষের বন্ধু, শান্তিকামী মানুষের বন্ধু। বহুবার তিনি বলেছেন শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পরাক্রমশালীর আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে তার আজীবনের সংগ্রাম। যেখানে মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছে, যেখানে মানুষ আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদ, বঞ্চনা, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, সেখানেই আমরা দেখি নিঃস্বার্থ প্রতিবাদী লড়াকু শেখ মুজিবকে। জীবনের প্রারম্ভে, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনকালেই তিনি জীবনে সর্বপ্রথম কারারুদ্ধ হন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে। তার 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে (পৃ. ১২) আমরা দেখি, কী করে হিন্দু মহাসভার স্থানীয় সভাপতি সুরেন ব্যানার্জি, রমাপদ দত্ত এবং ওদের সহযোগী কতিপয় কর্মচারী ষড়যন্ত্র করে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে হত্যা প্রচেষ্টার বানোয়াট অভিযোগ এনে তাকে জেলবন্দি করে। পরে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মামলার নিষ্পত্তি হয়। আত্মজীবনীতে আছে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিমাতাসুলভ আচরণ ছাড়াও (পৃ. ২৩) 'হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচারেও মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।' কিন্তু এসব সত্ত্বেও প্রতিবাদী তরুণ শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন সর্বতোভাবে অসাম্প্রদায়িক। বস্তুতপক্ষে, সাম্প্রদায়িকতা, হিংসা, দ্বেষ, অবিচার, অন্যায়, শোষণ, মানবাধিকার হরণ- এসবের বিরুদ্ধেই তো ছিল তার আপসহীন আজীবন সংগ্রাম। আমৃত্যু কোনো প্রলোভন, অত্যাচার বা ভীতি প্রদর্শন তাকে কখনও লক্ষ্যচ্যুত করতে বা তার আদর্শের স্খলন ঘটাতে পারেনি। আমাদের সৌভাগ্য যে, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ কিছু অনিশ্চিত কালের পরে তারই যোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা তারই নির্দেশিত পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
বিশ্ব নেতৃত্ব গ্রহণে বঙ্গবন্ধুর যে অপার সম্ভাবনা ছিল তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সুপরিস্ম্ফুট ছিল। আমি বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের ৫-৯ সেপ্টেম্বর আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত 'ন্যাম' শীর্ষ সম্মেলন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উল্লেখ করতে চাই। ওই মাসে ইরাক ও ইজিপ্টে একটি বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সফর নির্ধারিত ছিল। আমার নেতৃত্বে গঠিত এই টিমের সদস্য ছিলেন রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর একজন পরিচালক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব। আলজিরিয়া সরকারের অনুমতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব করা হলো যে, এই টিমটি যদি দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে তখন আলজিয়ার্স যায়, তাহলে সেখানে অনুষ্ঠিতব্য একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা (আলজিরীয় সরকার আয়োজিত) অংশগ্রহণ ছাড়াও সম্ভব হলে অন্যান্য ডেলিগেশনের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরিচিতির চেষ্টা করতে পারে। বাণিজ্য সম্প্রসারণে সদা উদগ্রীব প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাব অনুমোদন করলে কায়রোর পরপরই আমরা আলজিয়ার্স যাই। যদিও 'ন্যাম' সম্মেলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, তবুও উপস্থিতির কল্যাণে আমরা ওই সম্মেলনের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করি এবং পরোক্ষভাবে অবগত থাকি। বাস্তবিকই বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সেখানে ছিল অবিস্মরণীয়। সম্মেলনে ভাষণে তিনি উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও বর্ণবাদবিরোধী বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে জোরালো বক্তব্য দেন। তিনি বিশ্ব শান্তি স্থাপন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। ফিলিস্তিনের সমস্যা সমাধানে ইসরায়েলি আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে এবং সেখানে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সমর্থনে তার বলিষ্ঠ আহ্বান ও ভূমিকা যথেষ্ট উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। বহু রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে, কখনও-বা তাদেরই আগ্রহে বঙ্গবন্ধু দ্বিপক্ষীয় সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেন। এক কথায় বলতে পারি, তার এই অতুলনীয় নেতৃত্বসুলভ আচরণ ও সেই ভূমিকার স্বীকৃতি আমাদের সবার মধ্যে প্রবল গর্ববোধের সৃষ্টি করে।

আগেই বলেছি, তৃতীয় বিশ্ব আঙ্কটাড সম্মেলনে যেখানে বাংলাদেশের সদস্যপদ গৃহীত হলো, সেখানে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রেরিত হয়ে বাংলাদেশ ডেলিগেশনের নেতা হিসেবে আমার যোগদানের সৌভাগ্য হয়েছিল। সেখানে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল রমেশ চন্দ্র এবং চিলির শান্তি পরিষদের সেক্রেটারি মারিয়া মালেয়ান্দার সঙ্গে পরিচয় হয়। রমেশ চন্দ্রের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজাদ একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। মারিয়া মালেয়ান্দা থাকতেন কবি পাবলো নেরুদার ক্রিস্টোফারবাল পাহাড়ের একটি বাড়িতে। সম্ভবত ভাড়াটিয়া হিসেবে। প্রথম হোটেলে জায়গা না পেয়ে দু'দিন আমি সে বাড়িতে থাকি। ওই মহলে বঙ্গবন্ধু একজন আদৃত, সম্মানিত এবং প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পাবলো নেরুদা আবার প্রেসিডেন্ট আয়েন্দের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। বিভিন্ন আলোচনায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত অনুভূতি প্রকাশ পেত। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক, সমাজতান্ত্রিক মানবপ্রেমী শান্তিবাদ এবং লক্ষ্য অর্জনে অবিচল সংগ্রাম তাদের আকৃষ্ট করেছিল। একটি সামাজিক আমন্ত্রণের জবাবে পাবলো নেরুদা বলেন, অবশ্যই 'মুজিবের বাংলাদেশ' দেখতে যাব। মারিয়া মালুয়েন্দা যোগ দিয়ে বলেন, 'আমার জন্য সেটা তো হবে এক তীর্থযাত্রা- পিলগ্রিমেজ।' ফিরে এসে আমি লিখেছিলাম, 'চিলি-তীর্থে'। মারিয়া মালুয়েন্দাকে শুধিয়েছিলাম 'আসছ কবে বাংলা-তীর্থে?' দু'বছরের আগেই চিলির 'আর্মি ক্যু' সব আশা-স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে চিলিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল। যথার্থই সম্প্রতি জননেত্রী শেখ হাসিনা সামরিক অভিধান থেকে 'মার্শাল ল'কে চির নির্বাসনে পাঠাবার আহ্বান জানিয়েছেন। যা হোক, সে বছরই অর্থাৎ ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটির সভায় পৃথিবীর ১৫০টি দেশের শান্তি পরিষদগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনে অনন্য-সাধারণ ভূমিকা এবং বিশ্ব শান্তি স্থাপনে তার বিশ্বাস ও নেতৃত্বের জন্য বঙ্গবন্ধুকে 'জুলিও কুরি' শান্তি পদক দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো।
২৩ মে, ১৯৭৩। বিশ্ব শান্তি পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এশীয় শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে প্রদান করা হয়েছিল 'জুলিও কুরি' শান্তি পদক। বলা হয়েছিল, 'বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আজ শুধু বাঙালির বন্ধু নন। বঙ্গবন্ধু সংগ্রামী মানুষের বন্ধু, শান্তিকামী মানুষের বন্ধু।' (সভাপতির ভাষণের ফটোকপি সংযোজিত)। বঙ্গবন্ধু উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন, অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক শোষকের ঘৃণ্য বেড়াজাল এবং পরাক্রমীর সর্বগ্রাসী নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে সাম্য ও সুবিচারের ভিত্তিতে সারা পৃথিবীর সংগ্রামী দেশ ও মানুষকে একতাবদ্ধ হয়ে শান্তি ও প্রগতির পথে অগ্রসরমান হতে। বাস্তবিকই যতদিন পৃথিবীতে দরিদ্র, নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের, জনগোষ্ঠীর, জাতির মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকবে, ততদিন অনুপ্রেরণা হয়ে, আলোকবর্তিকা হয়ে শেখ মুজিব পথ দেখাবেন। বিশ্ববাসীর হৃদয়ে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবেন অভ্রভেদী গিরিরাজ হিমালয়ের মতো। শেখ মুজিবের মধ্যে ফিদেল কাস্ত্রো এই হিমালয়কেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
আমাদের সৌভাগ্য, সেই আলোকেই আজ আমরা উদ্ভাসিত। সার্বিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণ সমঝোতার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধান, জাতিসংঘ ও যূথবদ্ধ রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবকল্যাণে গৃহীত কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন, অবহেলিত নারী ও সংগ্রামী মানুষের ক্ষমতায়ন- এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বিরাট ও অতুলনীয় সাফল্য আজ অনস্বীকার্য। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নকামী দেশগুলোর বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা তো বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত পথেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই অগ্রযাত্রায় রয়েছে ও থাকবে আমাদের সবার অকুণ্ঠ সক্রিয় সমর্থন। শেখ হাসিনার জয় হোক। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদ; অবসরপ্রাপ্ত সচিব