ষড়ঋতুর বাংলাদেশে প্রকৃতির নানা রকম বৈচিত্র্যের মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। বিশেষ করে হেমন্তের নবান্নের আমেজ কাটতে না কাটতেই ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তরের হিমশীতল বাতাসে ভেসে আসে শীতের আগমন। পৌষ ও মাঘ মাসে শীত বেশি থাকে। মূলত বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের এখন যে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে, এর মূল কারণ জলবায়ুর প্রভাব আর ভৌগোলিক অবস্থান। দেশের উত্তরে সুবিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালা, আর দক্ষিণে প্রবাহিত হচ্ছে বঙ্গোপসাগর; যেখানে মিলিত হয়েছে হাজার নদীর স্রোতধারা। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে যেমন ঝড়-বৃষ্টি লেগেই আছে, তেমনি হিমালয়ের শীতল বাতাসের তোড়ে ঘন কুয়াশা আর মাঝেমধ্যে শৈত্যপ্রবাহের কবলে এ দেশের মানুষের দুর্দশার শেষ থাকে না। বিশেষ করে ভৌগোলিক কারণে দেশের উত্তরের শেষ প্রান্তে ও হিমালয়ের পাদদেশে কুড়িগ্রামের অবস্থান হওয়ায় শীতকালে এ জেলার শিশু, বৃদ্ধ, দরিদ্র মানুষকে চরম দুর্দশায় পড়তে হয়।

প্রবাদ আছে- 'মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে।' এ বছর শীতের প্রকোপে এ প্রবাদের বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে। এ বছর পৌষের শুরুতেই শীত জেঁকে বসেছিল। পুরো পৌষ মাসই কম-বেশি শীত ছিল। মাঝেমধ্যে দু'একদিন সূর্যের দেখা মিললেও তার প্রভাব খুব বেশি ছিল না। পৌষ পেরিয়ে মাঘের মধ্য সময় পর্যন্ত শীতের প্রকোপ ছিল খুব বেশি। জানুয়ারি মাসের শেষ দিন কুড়িগ্রামে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সারাদিন সূর্যের দেখা মেলেনি, সঙ্গে ছিল শীতল হাওয়া। ঘরের বাইর হওয়া দূরের কথা, ঘরের ভেতরে থাকাই দায় ছিল! এ সময় শিশু-বৃদ্ধরা নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় হাসপাতালেও রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল।

আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ পূরণ হয় উত্তরাঞ্চলের সেচভিত্তিক বোরো চাষাবাদের ওপর। আর বোরোর চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় পৌষ-মাঘ মাস। বিশেষ করে পৌষের মাঝামাঝি থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত জমিতে চারা লাগানোর কাজ চলে। ফলে প্রচণ্ড এই শীতে চাষিদের ঠান্ডা উপেক্ষা করে বোরোর ক্ষেতে কাজ করতে হয়েছে। বোরো চাষাবাদের অন্যতম উপাদান হচ্ছে চারা। আমরা জানি, ভালো বীজে ভালো ফলন। অর্থাৎ চারা ভালো না হলে গাছও ভালো হবে না। এ বছর বোরোর বীজতলাও শীতের কারণে ক্ষতি হয়েছে। যদিও চাষিরা পলিথিনে বীজতলা ঢেকে রাখা, বালাই নাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি, বীজতলার মাথার শিশির ফেলে দেওয়াসহ নানাভাবে পানি আটকে বাড়তি পরিচর্যা করায় বীজতলার ক্ষতির চিত্র স্ম্ফীত হতে পারেনি। সব মিলে ঘন কুয়াশার কারণে বোরো চাষিদের দিন ভালো কাটেনি। আবার জমিতে বোরোর চারা রোপণ করলেও শীতের কারণে বোরো আবাদের চেহারা পাল্টে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে ঝড়, বৃষ্টি, বন্যার আগেকার সেই চিত্র তেমন আর দেখা যায় না। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে ঋতুবৈচিত্র্যের পরিবর্তন হয়েছে। মানুষকে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই টিকে থাকতে হচ্ছে। অবশ্য মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই মানুষকে জীবন-জীবিকা ও সমৃদ্ধির সোপান রচনা করতে হচ্ছে।

তবে দেশের পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর তালিকার শীর্ষে থাকা কুড়িগ্রামের আর্থ-সামাজিক চিত্রের খতিয়ান কম-বেশি সবারই জানা। এ জেলার দরিদ্র, নিম্ন আয়ভুক্ত ও ভাসমান বেকার মানুষের সংখ্যাও বেশি। শ্রম বিক্রি করেই চালাতে হয় তাদের জীবন-জীবিকা। এবার পৌষের শুরুতে প্রথম ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, তাও ছিল কুড়িগ্রামে। আবার জানুয়ারির শেষ দিনের আবহাওয়ার সর্বনিম্ন রেকর্ড ছিল ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং তাও এই কুড়িগ্রামেই। এ জেলায় গরিব মানুষের শীতে কষ্ট বাড়ে। যদিও সরকারি-বেসরকারিভাবে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দেশের সামর্থ্যবানদের এ ক্ষেত্রে হাত প্রসারিত রাখতে হবে।

সাবেক ছাত্রনেতা