সম্ভবত ১৯৮৭ সালের মার্চ মাস। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে চলছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনসভা। চট্টগ্রামে জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিটি জনসভাই লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হতো। আমরা তখন ছোট হলেও লালদীঘি ময়দানে হাজির হতাম।

যাই হোক, দেখলাম জননেত্রী শেখ হাসিনা উপবিষ্ট মঞ্চে; তিনি সর্বশেষ বক্তা। নেতারা একে একে ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই বক্তৃতা করতে দাঁড়ালেন একজন যুব বয়সী নেতা। দেখতে সাদাসিধে কিন্তু যখন তিনি ছড়িয়ে দিলেন তার কথার সুরের জাদু; তখন মনে হলো, রাগ সংগীত, রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলসংগীতের মতো বক্তৃতাও এক ধরনের সংগীত। সেদিন রাতে এই সংগীতশিল্পী আমাদের বাড়ি এলেন। নাম তার ওবায়দুল কাদের। আমার মেজো চাচা আব্দুল্লাহ আল হারুনের অতি পছন্দের রাজনৈতিক সহকর্মী ও ছোট ভাই আর ছোট চাচা আব্দুল্লাহ আল আহসানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ছাত্রলীগের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা।

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানদের ইতিহাস-জ্ঞান হিসাব করতে হলে তার নিজের বয়সের সঙ্গে পূর্বপুরুষদের বয়স যোগ করতে হয়। কারণ অনেক ইতিহাস তারা জানতে পারে পূর্বপুরুষের প্রত্যক্ষ দর্শনের স্মৃতি থেকে; আবার অনেক কিছুই তারা জানে নিজের স্মৃতির ভান্ডার ঘেঁটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, আব্দুল মালেক উকিল, আমেনা বেগম, জোহরা তাজউদ্দীন, সাজেদা চৌধুরীসহ অনেক ডাকসাঁইটে আওয়ামী লীগ নেতার আগমনে আমাদের ছোট্ট অথচ গর্বিত বাসাটি হয়েছে ধন্য। এর পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতিবিদ হিসেবে এই বাসায় এসেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, ওবায়দুল কাদেরসহ সে সময়ের আলোকিত রাজনীতিবিদরা; যাদের সামনে বসে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও ছাত্রলীগের ওবায়দুল কাদের হিসেবে আজও সমোচ্চারিত। ওবায়দুল কাদের ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট, দুই পরীক্ষাতেই স্ট্যান্ড করেছিলেন। অথচ জীবন ধারণের জন্য বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। নোয়াখালীর ছাত্রজীবনে ডাকসাঁইটে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মালেক উকিলের সান্নিধ্যে থেকে নিয়েছিলেন রাজনীতির পাঠ; শেখ ফজলুল হক মনির অধীনে করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যা ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির হত্যাকাণ্ডের পর তারই প্রতিষ্ঠিত বাংলার বাণীতে সাংবাদিকতা করে নিজের সাদামাটা জীবনটা যাপন করে গেছেন।

১৯৭৭ সালে জেলে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের। ১৯৭৯ সালে ডাকসু নির্বাচনের প্রাক্কালে সব আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কবজা করার আশায় লোভের টোপে ফেলে ওবায়দুল কাদেরসহ তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতাদের কিনে নিতে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান! অনেকের ক্ষেত্রে সফল হলেও ছাত্রলীগের ওবায়দুল কাদেরকে কিনতে পারেননি। তাকে কিনতে না পেরে নিক্ষেপ করা হয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়েও জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সঙ্গে বারবার জেলে গেছেন ওবায়দুল কাদের। ২০০৭ সালের এক সময়ের কুশীলব জেনারেল মইনউদ্দিনরাও রেহাই দেননি ওবায়দুল কাদেরকে। রিমান্ডের নামে চলেছে রীতিমতো শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার।

ওবায়দুল কাদের স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় চষে বেড়িয়েছেন সারা বাংলায়। চট্টগ্রামে এলে তাকে মাঝেমধ্যে দেখতাম আমার চাচা আব্দুল্লাহ আল আহসানের বাসায় মধ্যরাত পর্যন্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে মিটিং করতে; আবার খুব ভোরে তিনি বেরিয়ে যেতেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। যেন কোনো ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই! অবসাদ নেই! একবার তো মৃত্যুই তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ থেকে তিলে তিলে গড়ে ওঠা যে দু'একজন নেতা এখনও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছেন, ওবায়দুল কাদের তাদের অন্যতম। আমাদের প্রজন্মের পরেও অনেক প্রজন্ম এসেছে, যারা ওবায়দুল কাদেরদের গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের অনেকটাই জানে না। সেই সুযোগে আওয়ামী লীগ নেতা বনে যাওয়া অনেক ব্যক্তিই ওবায়দুল কাদেরের মতো নেতাদের চরিত্র হননের দুঃসাহস দেখান। নোয়াখালী থেকে নির্বাচিত এক সংসদ সদস্য তাদের একজন। অথচ ওই সাংসদের পিতা ১৯৭৩ সালে ঘড়ি মার্কা নিয়ে নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছিলেন। ওবায়দুল কাদেরের পিতা ছিলেন একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন না পেয়ে ওই সাংসদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে বিএনপি প্রার্থী মওদুদ আহমদের জয় ত্বরান্বিত করেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মওদুদ আহমদ পেয়েছিলেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট; আওয়ামী লীগ প্রার্থী ওবায়দুল কাদের পেয়েছিলেন ৪৫ হাজার ৯৭২ ভোট ও আলোচ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছিলেন ৪২ হাজার ৪৮ ভোট। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ভোট গণনা হলে ওই আসন থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ওবায়দুল কাদের নির্বাচিত হতেন।

একজন স্থানীয় নেতার প্রলাপে হয়তো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাতীয় নেতা মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুল কাদেরের কিছু আসে যায় না। কিন্তু ইতিহাস আমাদের আশঙ্কিত করে। কারণ ইতিহাস বিকৃতির যে ধারা একবার শুরু করেছিলেন জেনারেল জিয়া ও তার বশংবদ বিএনপি; সে ধারা থেকে নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ শ্রম দিতে হচ্ছে। ইতিহাস বিকৃতির তাৎক্ষণিক জবাব যদি দেওয়া না হয়, তা একসময় পরবর্তী প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে। তাই মনে হলো, এ বিষয়ে অবশ্যই কিছু লেখা দরকার।

আইনজীবী; সদস্য, আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
Imranul kabir, bapi18@gmail.com