গবেষণায় চুরির কেলেঙ্কারি কাঁধে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শিক্ষকের পদাবনতি হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ এবং পিএইচডি অভিসন্দর্ভ জালিয়াতির মতো ভয়ানক অপরাধের পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ ধরনের শাস্তির খবর এলো। যদিও দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নামে এসব জালিয়াত গবেষণা প্রকাশ করার অভিযোগ গণমাধ্যমে চাউর হচ্ছিল। তবে একাডেমিক শাস্তির এই দৃষ্টান্ত কেবলই শুরু মাত্র।

এ নিউ ডাইমেনশন অব কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার :এ কেস স্টাডি অব দ্য কালচারাল ইম্পেরিয়ালিজম' শিরোনামে আট পৃষ্ঠার একটি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের 'সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউ' জার্নালে প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমানকে সহযোগী অধ্যাপক থেকে এক ধাপ নামিয়ে সহকারী ও তার সহকর্মী অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজানকে দুই বছর প্রভাষক পদে থাকতে হবে উল্লেখ করে একাডেমিক শাস্তি দিয়েছে। প্রায় একই ধরনের কাজের দায়ে, পিএইচডি থিসিসে জালিয়াতিতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ওমর ফারুককে সহকারী অধ্যাপক থেকে প্রভাষক পদে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই জালিয়াতির ঘটনা 'কেবলমাত্র' গণমাধ্যমে চাউর হয়েছে বলেই কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমন শাস্তির বন্দোবস্ত করল? নাকি এ ধরনের অভিযোগে শিক্ষকদের শাস্তি নিয়মতান্ত্রিক? এই শিক্ষকদের শাস্তিতে কি বিশ্ববিদ্যালয় নিজের দায় এড়িয়ে যেতে পারে?

অনেকেই হয়তো জানেন, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে জাপানের প্রধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিকেন থেকে হারুকো ওবাকাতার নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত স্টেমুলাস ট্রিগারড আকজিয়েশন অব প্লুরোপুটেন্সি (স্ট্যাপ) নামে একপ্রকার স্টেমসেল বিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়, ভ্রুণীয় স্টেম কোষ থেকে যে কোনো প্রকার কোষে রূপান্তর করা সম্ভব। এরপর ওই গবেষণাপত্রের ডাটা চুরির অভিযোগ ওঠে বিজ্ঞানী মহল থেকে। নেচার কর্তৃপক্ষ ওবাকাতাকে গবেষণার সঠিকতা প্রমাণের জন্য তথ্য-উপাত্ত দিতে বললে তিনি ব্যর্থ হন। আর এ নিয়ে সারাবিশ্বে তুমুল আলোচনা শুরু হলে ওই প্রবন্ধের এক সহযোগী গবেষক ও রিকেনের সহযোগী অধ্যাপক আত্মহত্যাও করেন। বাতিল হয়ে যায় নেচারে প্রকাশিত নিবন্ধটি। এ ঘটনায় ড. হারুকো ওবাকাতাকে রিকেন থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। শুধু তাই নয়, এই কেলেঙ্কারি সহ্য করতে না পেরে তার শাস্তিস্বরূপ ২০১১ সালে ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেওয়া পিএইচডি সনদ বাতিল করা হয়। অথচ পিএইচডির সঙ্গে ওবাকাতার নেচারে ওই গবেষণার কোনো সম্পর্ক ছিল না। শুধু তাই নয়, গবেষণায় কুম্ভিলকবৃত্তির দায়ে পুরো জাপানে ওবাকাতাকে একাডেমিক পজিশন দেওয়া হয়নি। এখনও মাঝেমধ্যে আমাদের অধ্যাপকরা ওবাকাতার গবেষণায় ওই কথা স্মরণ করে দিয়ে শব্দবাক্যে কপি-পেস্টে সাবধান থাকতে বলেন। এই একটি ঘটনাই নয়, বছর দুয়েক আগে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অধ্যাপকের গবেষণায় কেলেঙ্কারির দায়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, তার ল্যাবকে ডিজলভড করে দেওয়া হয়। কয়েক মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়। প্রতিবছরই ডজন ডজন শিক্ষক কেবল পদোন্নতির আশায় পিএইচডি করছেন। পিএইচডি নিয়ে ঘরে ফিরে, পদোন্নতি বাগিয়ে 'স্থিতাবস্থায়' ফিরে শিক্ষকরা পরবর্তী গবেষণায় কতটা এগিয়ে যাচ্ছেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ দেখলেই টের পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, গবেষণার মান বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয় কী? আমাদের দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে কতটা জ্ঞানের ঢেকুর তুলতে পারছেন? তারা যে নিয়মশৃঙ্খলে দেশের বাইরে গবেষণার ইথিক্স শিখে আসছেন, সেটি কেন নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োগ করতে পারছেন না? বিষয়টি জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে যা দেখেছি, তাতে সত্যিই গা শিউরে ওঠার মতো অবস্থা।

নিজেদের সহকর্মী না হয়ে, এসব কাজের মূল্যায়নের জন্য দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীয় এক্সপার্টদের অন্তর্ভুক্ত করলেও সেসব গবেষণার ভালো ও খারাপ দিক নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতো। একটি গবেষণা শেষ করার পর তা জার্নালে যাওয়া উচিত। সেখানে পিয়ার রিভিউ হওয়ার পর তা প্রকাশযোগ্য হতে পারে, আবার নাও পারে। এটাই আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার এসব নীতিতে বলীয়ান হয়েও দায়সারাভাবে নিজেদের সিভির ওয়েট বাড়ানোর দায়িত্বটা এভাবে করে যাচ্ছে। মানসম্মত প্রকাশনার চেয়ে আমাদের সম্মানিত কোনো কোনো শিক্ষক কপি-পেস্টের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশনা সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। ঠিক একই পথ অনুসরণ করতে দেখা যায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও। এই দেশের স্নাতকোত্তর পর্বে থিসিসগুলোর যে মূল্যায়ন হচ্ছে, তা সত্যি ভয়ানক।

গবেষণায় নৈতিকতার মানদণ্ড হলো ট্রান্সপারেন্সি। আমরা আবেগের চেয়ে প্রযুক্তিগত ব্যবহারকে গুরুত্ব দিই। গবেষণাপত্র এখন কপি-পেস্ট পত্রিকার কোনো খবর নয় যে, আপনি উৎস ছাড়াই অন্যের লেখা সরাসরি নিজের নামে পোর্টালে আপলোড করে দিলেন। অথচ আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থিসিস জমা রাখার ডিজিটাল সংরক্ষণশালা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এমনকি শিক্ষকদের গবেষণাপত্র বিভাগের লাইব্রেরিতেও পাওয়া দুস্কর। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালগুলোয় প্রকাশিত আর্টিকেলগুলোও পাওয়া যায় না। ফলে এক ধরনের অন্ধকারের মধ্যে থেকে যায় এসব গবেষণাপত্র। একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হওয়ার পর যদি সেটি পাঠক না-ই পড়ে, না-ই জানে, তাহলে এমন গবেষণাপত্রের আদৌ প্রয়োজন আছে?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা জালিয়াতির ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে আসে মূলত শিক্ষকদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকা অন্য শিক্ষকদের হাত ধরে। বিভাগগুলোতে শিক্ষকরা জানেন, কার কোথায় দুর্বলতা। ফলে সুযোগ পেলেই সেই দুর্বল জায়গাগুলোয় গণমাধ্যমকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, গবেষণাপত্রগুলোর মূল্যায়নের ফাঁকফোকর তাদের জানা। পদ-পদোন্নতি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হয়ে আসে। আর তার জাঁতাকলে পিষ্ট হন অনেকে; কিন্তু এসব হওয়ার কথা নয়। আমরা যদি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেভাবে তৈরি করতে পারতাম, তাহলে এসব পথ অনুসরণ করে গবেষণাপত্র প্রকাশের সাহসটুকু পেত না। গবেষণায় বাজেট বরাদ্দের অপ্রতুলতায় আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী যেমন করা সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি গবেষণার নীতি-নৈতিকতার বিষয় ক্লাস, সেমিনার আয়োজন থেকেও কার্যত বিরত থাকছে। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসুক। আলোর পথ অনুসরণ করুক। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল নামেই বিশ্ব নয়, বরং বিশ্বায়নের সব সুযোগ-সুবিধা রেখে বিশ্বদরবারে নিজেদের পরিচিত করাই হোক সবার ব্রত।

গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান

বিষয় : উচ্চশিক্ষা ড. নাদিম মাহমুদ

মন্তব্য করুন