দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা ক'কদম এগোতে পেরেছি- এমন প্রশ্ন নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে। ৯ ফেব্রুয়ারি 'ক্যাডার থেকে থানার ওসি নিয়োগের সুপারিশ' শিরোনামে সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের উপশিরোনামে রয়েছে 'মাঠ থেকে উচ্চ পর্যায় সবখানেই দুর্নীতি'। এটি দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্য। ৭ ফেব্রুয়ারি দুদকের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার পরদিন দুদক চেয়ারম্যান রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আরও বলেছেন, 'দুর্নীতি সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী।' তিনি এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, 'সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও গত ৫০ বছরেও ন্যায়পাল নিযুক্ত করা হয়নি, ...গুণগত মানসম্পন্ন আমলাতন্ত্র দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।'
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বিদ্যমান বাস্তবতা না এড়িয়ে সত্য উচ্চারণের জন্য সাধুবাদ পেতেই পারেন। অনেকেরই মনে আছে হয়তো, দুদকের এক সাবেক চেয়ারম্যান দুদককে 'নখদন্তহীন বাঘ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। দুর্নীতি দমন বা নির্মূলে সরকারের 'শূন্য সহিষ্ণুতা'র অঙ্গীকার রয়েছে। এ লক্ষ্যেই সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ইতোমধ্যে অনেকবারই ব্যক্ত করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই শক্তিশালীকরণের কাজ কতটুকু হয়েছে? পরপর পাঁচ বছর বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সে পরিস্থিতি থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটেছে বটে; কিন্তু একই সঙ্গে এ প্রশ্নও দাঁড়ায়- পরিস্থিতি বিবেচনায় তা কতটা? উত্তরটা একেবারে সহজ-সরল নয়। টিআইর প্রতিবেদনে সর্বশেষ যে তথ্য মিলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের (১২তম) গণ্ডিবদ্ধ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অঙ্গীকার সত্ত্বেও এ অবস্থা কেন? তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারকদের এত বক্তৃতা-বিবৃতি কি ফাঁকা আওয়াজ?
আমাদের সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক দু'ভাবেই দুর্নীতি হচ্ছে। স্বাস্থ্য, ভূমি, কাস্টমস, ওয়াসা, পুলিশ, ব্যাংক ইত্যাদি খাতের দুর্নীতির উৎকট চিত্র প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। আর এর সঙ্গে পি কে হালদার, জি কে শামীম, সম্রাট, গোল্ডেন মুনির থেকে শুরু করে কত চুনোপুঁটি-রাঘববোয়ালের কাতারভুক্ত হয়েছেন, এর হিসাব মেলানো ভার। সরকারি সেবাধর্মী খাতগুলোতে দুর্নীতি যেন 'ওপেন সিক্রেট'। শুধু এক বছরের দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প সম্পন্ন করা সম্ভব- এমন কথাও আমাদের সমাজে খুব চাউর। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে নিজেদের অবস্থান করে নিতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য তো আরও প্রসারিত। আমরা মর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে উন্নত বিশ্বের সারিতে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু এ তো এখনও অনেক দূরের পথ। এতটা পথ পাড়ি দিতে আমাদের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যা যা দরকার, আমরা কি সেসব নিশ্চিত করতে পেরেছি?
দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। ইকবাল মাহমুদই অতীতে জানিয়েছিলেন, 'দুর্নীতিবাজদের তালিকা হচ্ছে। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মুখ্য নয়। কমিশন কখনও কারও মুখ দেখে না, দেখে অপরাধ।' যদি তাই হয়, তাহলে আজও কেন দুর্নীতি রল্প্রেব্দ রল্প্রেব্দ? অনিয়ম-দুর্নীতি-ঘুষ ইত্যাদির অভিশাপ থেকে কেবল 'তৃতীয় বিশ্ব'ই নয়, 'প্রথম বিশ্ব'ও শতভাগ মুক্ত নয়। তবে আমাদের এখানে এ পরিস্থিতি এতটা উৎকট, এর ফের ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ নিষ্প্রয়োজন। আমাদের সমাজেই একসময় দুর্নীতিবাজ বলে কাউকে আখ্যায়িত করা গালি হিসেবে বিবেচিত হতো। আর এখন? আমাদের এক সাবেক মন্ত্রী বলেছিলেন, ঘুষ নাকি আসলে ঘুষ না; এটা নাকি 'স্পিডমানি'। তবে দেশের আইনের সংজ্ঞা মন্ত্রীর এমন মন্তব্য খারিজ করে দেয়!
দুর্নীতি সমাজ ও প্রশাসনের অবক্ষয় তো বটেই, মানবাধিকার-সুশাসনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি করে নৈরাজ্যের। দুর্নীতি হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূলে থেকে যাওয়া ব্যাধির অন্যতম একটি উপসর্গ। দুর্নীতির বীজ রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন ব্যবস্থার মূলেই থেকে যায়। তারপর এ থেকে চারা গজায় এবং পর্যায়ক্রমে গাছ হিসেবে বাড়তে থাকে এবং ক্রমে মহীরুহ বিষবৃক্ষ হিসেবে দেখা দেয়। কাজেই ওপর থেকে ভাসাভাসা ব্যবস্থা নিলে কখনোই দুর্নীতির মূলোচ্ছেদ করা যাবে না। দুর্নীতির বিষবৃক্ষ যদি ধ্বংস করতেই হয়, তাহলে একবারে বীজেই নাশ করতে হবে। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক দল, দুর্নীতিমুক্ত নেতা, দুর্নীতিমুক্ত সরকার, বলবান দুর্নীতি দমন কমিশন চাই। ন্যায়বিচার, সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুদক ও সরকারের সদিচ্ছার যদি যথাযর্থই প্রতিফলন সর্বক্ষেত্রে ঘটে, তাহলে আমাদের বারবার বলতে হবে না- দূর হ অন্ধকার। যে দুষ্ট রাজনৈতিক আর সামাজিক চক্রের হীনস্বার্থে সুড়ঙ্গের সৃষ্টি, সেই সুড়ঙ্গের পথ বন্ধ করতে না পারলে কানাগলি দিয়ে দুর্নীতির কীটরা বের হতেই থাকবে।
লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

বিষয় : দুর্নীতি অবিনশ্বর!

মন্তব্য করুন