খাদ্য মানুষের অন্যতম চাহিদা এবং মৌলিক অধিকার। বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধি করোনার করাল গ্রাসে বিপর্যস্ত মানব সমাজে খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টিমানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বাস্থ্যকর বা উন্নত খাদ্য ব্যবস্থা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে যে, নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি। তাছাড়া সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে যে, জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য। একজন মানুষের প্রয়োজনীয় বুদ্ধি ও দক্ষতা বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো যথাযথ পুষ্টি।
খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে সরকার কর্তৃক সুষ্ঠু সার ব্যবস্থাপনা, প্রতিকূল আবহাওয়া তথা খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা ও লবণাক্ততা বিবেচনায় বৈরী পরিবেশসহিষুষ্ণ জাতের শস্য উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, ভূগর্ভস্থ ও বিশেষ করে ভূ-উপরিভাগের উৎস থেকে পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে লাগসই, কার্যকর ও ফলপ্রসূ কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলবর্তী ১৪ জেলার জন্য ২০২১ সাল অবধি কৃষি উন্নয়নের জন্য ৫৮ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত মাস্টারপল্গ্যান প্রণীত হয়েছে। পার্বত্য জেলাগুলোর জন্য সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যুগান্তকারী বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি গবেষণা, কৃষি বিপণন, কৃষি সমবায় প্রভৃতি ক্ষেত্রে কার্যকর ও যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ক্রমান্বয়ে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ক্রমহ্রাসমান আবাদি জমি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং ক্রমবর্ধিষুষ্ণ লোকসংখ্যার প্রেক্ষাপটে অনূসৃত কর্মপ্রচেষ্টা আরও জোরদার করার পাশাপাশি অব্যবহূত ভূমি বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা, হাওর এলাকা বা পার্বত্য এলাকার ভূমি নিবিড় চাষাবাদের আওতায় আনা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সফল অভিযোজনের লক্ষ্যে গবেষণা ও সম্প্রসারণের কর্মব্যাপ্তি প্রসার করা, ভূগর্ভস্থ পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ভূ-উপরিস্থ পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার সম্প্রসারিত করে সেচ ব্যবস্থাপনা কার্যকর ও দক্ষ করে তোলা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আরও বিনিয়োগ করা, পর্যাপ্ত দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় টেকসই ভ্যালু চেইন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় ভর্তুকি ও ঋণ সুবিধা সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে এমনকি শহরাঞ্চলের অনেক জায়গায় একটি পুষ্টিসম্মত ও ভারসাম্য খাদ্য গ্রহণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। একদিকে যথাযথ অভিগম্যতার অনুপস্থিতি, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে আমাদের খাদ্য গ্রহণ ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ। বাংলাদেশে এখনও দানাদার খাদ্যসামগ্রী থেকে গৃহীত শক্তির উৎস সুপারিশকৃত হার থেকে অনেক বেশি। দানাদার খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত ও প্রয়োজনীয় মাত্রার দেড় গুণ। অন্যদিকে শাকসবজি ও ফল গ্রহণ করা হচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বা তার চেয়েও কম। অসমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থা বা খাদ্যের ব্যবহার স্বাস্থ্যহানির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জনগণের আয় বৃদ্ধি, জীবনশৈলীর পরিবর্তন, ভোগবাদীতে সচেতনতা এবং বিভিন্ন খাদ্যের যথেষ্ট সমাহার খাদ্যের সদ্ব্যবহারে ভূমিকা পালন করতে পারে। অপুষ্টির একটি অংশ যেমন পুষ্টিহীনতা, তেমনি আরেকটি নিয়ামক অংশ হলো অতি পুষ্টি বা স্থূলতা। গর্ভাবস্থায় শিশুর কম বৃদ্ধি, কম জন্ম-ওজন, খর্বতা, কৃশতা এবং পুষ্টির ঘাটতি- সবই পুষ্টিহীনতার অন্তর্ভুক্ত। পুষ্টিহীনতার কারণে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত শিশু পরিণত বয়সে একজন অপুষ্ট ব্যক্তি হিসেবে বড় হন। ফলে তিনি সমাজ ও জাতির উন্নতিতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে অক্ষম হন। বাংলাদেশে অপুষ্টির হার অনেক বেশি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অনুযায়ী কম ওজন শিশুর সংখ্যা ২০১৪ সালের ৩২.৬ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ২০.০ শতাংশে, খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা ২০১৪ সালের ৩৬.১ শতাংশ থেকে ২৫.০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল। অন্যদিকে জাতীয় খাদ্যনীতি ২০০৬ এবং জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০ অনুযায়ী খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সবার জন্য বিশেষত নারী ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনানুযায়ী নিয়মিত নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য জোগান ও অভিগম্যতার বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত ওজন, স্থুলতা, উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস জনস্বাস্থ্যে পুষ্টি সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফার্স্টফুড, শুকনো খাবার এবং আঁশবিহীন খাদ্যের আধিক্যই মূলত এ জন্য দায়ী বলে পুষ্টিবিদরা অভিমত দেন। উন্নত এবং পরিকল্পিত খাদ্য ব্যবস্থা এসব সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ লক্ষ্যে (ক) পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, (খ) জীবন চক্রের সকল ধাপে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা, (গ) জনগণের বিশেষত শিশু, বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়ে, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মাসহ সবার পুষ্টি অবস্থার উন্নতি সাধন, (ঘ) খাদ্যে বৈচিত্র্য আনা, পুষ্টিমান অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করা প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আটটি বিভাগে বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে খাদ্যের পুষ্টিমানসহ ভেজালের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদান করবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মানুষ করোনা মহামারিতে 'সার্টিফায়েড' ও 'নন সার্টিফায়েড' খাদ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। ভেজালবিহীন 'সার্টিফায়েড খাবার' মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে করোনাসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় সংকোচনে সাহায্য করবে। যদিও খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ; কিন্তু নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের এজেন্ডা অনুযায়ী টেকসই উন্নয়নের উচ্চমাত্রায় পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশকে নিরাপদ ও পুষ্টিসম্মত খাদ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ,
পুষ্টিমান-বহির্ভূত এবং সর্বোপরি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা যতই অগ্রসর হোক, জনগণের তাতে কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
কলাম লেখক ও সাবেক সচিব

মন্তব্য করুন